প্রধানমন্ত্রীর কড়া বার্তা
কাগজ ডেস্ক
প্রকাশ: ২০ অক্টোবর ২০২৬, ১১:০১ এএম
ছবি : সংগৃহীত
আড়াই সপ্তাহের ব্যবধানে সংসদ সদস্য ফেরদৌসী আহমেদ (মিষ্টি) ও প্রতিমন্ত্রী ইশরাক হোসেনকে পদ ছাড়ার নির্দেশ দিয়ে সরকার ও দলের ভেতরে কঠোর বার্তা দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। বিএনপি ও সরকারের দায়িত্বশীল ব্যক্তিদের মূল্যায়ন, এই বার্তা শুধু দুজনের জন্য নয়; মন্ত্রী, সংসদ সদস্য থেকে শুরু করে দলের নেতা-কর্মীদের সবার জন্য। ক্ষমতার প্রভাব দেখানো কিংবা দায়িত্বের সীমা অতিক্রম করে সরকার ও দলকে বিব্রত করলে পদে থাকার নিশ্চয়তা নেই—এমন বার্তাই স্পষ্ট হয়েছে সাম্প্রতিক সিদ্ধান্তে।
রাজধানীর মিরপুরে রাড্ডা স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্রে হামলা ও ভবন গুঁড়িয়ে দেওয়ার ঘটনায় ঘনিষ্ঠ ব্যক্তিদের নাম আসার পর সংসদ সদস্য পদ ছাড়তে হয় ফেরদৌসী আহমেদকে। অন্যদিকে, অস্ত্র হাতে মাদকবিরোধী অভিযানে নেমে বিতর্কের মুখে পড়েন ইশরাক হোসেন। ফেরদৌসীর ক্ষেত্রে ঘনিষ্ঠ ব্যক্তিদের কর্মকাণ্ড নিয়ে প্রশ্ন উঠেছিল, আর ইশরাক নিজেই বিতর্কের কেন্দ্রে আসেন।
গত রোববার বিকেলে সচিবালয়ে মন্ত্রিসভার বৈঠক শেষে ইশরাককে ডেকে পদত্যাগের নির্দেশ দেন প্রধানমন্ত্রী। পরদিন সোমবার জাতীয় প্রেসক্লাবে সংবাদ সম্মেলন করে প্রতিমন্ত্রীর পদ ছাড়ার ঘোষণা দেন তিনি। এর আগে ১ অক্টোবর প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশ পেয়ে স্পিকারের কাছে পদত্যাগপত্র জমা দেন ফেরদৌসী আহমেদ। পরে তাঁর সংসদীয় আসন শূন্য ঘোষণা করা হয়।
ইশরাকের পদত্যাগের পর বিষয়টি নিয়ে বিএনপির জাতীয় নির্বাহী কমিটি ও মন্ত্রিসভার একাধিক সদস্য এবং প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের গুরুত্বপূর্ণ দুটি সূত্রের সঙ্গে কথা বলেছেন এই প্রতিবেদক। তবে তাঁরা কেউ নাম প্রকাশ করে মন্তব্য করতে রাজি হননি। তাঁদের মতে, ফেরদৌসীর পর ইশরাকের বিষয়ে কঠোর সিদ্ধান্তের মূল উদ্দেশ্য হলো ক্ষমতার দাপট ঠেকানো, দায়িত্বের সীমা মেনে চলা এবং ব্যক্তির বিতর্কিত কর্মকাণ্ডের দায় সরকার ও দলের ওপর পড়তে না দেওয়া।
বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ও অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, শান্তিশৃঙ্খলা ও রাজনৈতিক শিষ্টাচারের বাইরে যাওয়ার সুযোগ কারও নেই—প্রধানমন্ত্রী বারবার সেই বার্তা দেওয়ার চেষ্টা করছেন। সাদামাটা জীবনযাপন, বিনয়ী আচরণ ও শিষ্টাচার মেনে চলার দৃষ্টান্ত প্রধানমন্ত্রী নিজেই তুলে ধরছেন। দলের প্রত্যেককে বিষয়টি বুঝতে হবে।
ক্ষমতার দাপট ঠেকানোই লক্ষ্য
সরকারের সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর মতে, ফেরদৌসী আহমেদ ও ইশরাক হোসেনের বিরুদ্ধে পদক্ষেপের অন্যতম উদ্দেশ্য হলো ব্যক্তির কর্মকাণ্ডকে কেন্দ্র করে দল ও সরকারকে ঘিরে তৈরি হওয়া বিতর্ক নিয়ন্ত্রণ করা। রাজনৈতিক অবস্থান বা পদমর্যাদার কারণে কাউকে রক্ষা করতে গিয়ে বৃহত্তর স্বার্থ ক্ষতিগ্রস্ত হোক, তা চান না প্রধানমন্ত্রী।
মন্ত্রিসভার একজন সদস্য নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, ক্ষমতায় থাকার সুযোগ নিয়ে কেউ যাতে দাম্ভিকতা দেখাতে না পারেন, সে জন্য কঠোর অবস্থান নিচ্ছেন প্রধানমন্ত্রী। মন্ত্রী, সংসদ সদস্য কিংবা দলের নেতা-কর্মী—কারও কর্মকাণ্ডে সরকার ও দলের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হলে তার দায় নিতে চান না তিনি। ব্যক্তিকে রক্ষা করতে গিয়ে দলের বৃহত্তর স্বার্থ ক্ষতিগ্রস্ত হতে দেওয়া হবে না—এমন বার্তাও রয়েছে এসব সিদ্ধান্তে।
ইশরাকের ঘটনায় দায়িত্বের সীমা নিয়ে প্রশ্ন
ইশরাকের ঘটনায় দায়িত্বের সীমা অতিক্রমের প্রশ্নটি বিশেষভাবে সামনে এসেছে। গত শনিবার গেন্ডারিয়ায় তাঁর অস্ত্র হাতে অভিযানে নামার ভিডিও ছড়িয়ে পড়ার পর সমালোচনা শুরু হয়। নিজের বিবৃতিতে ইশরাক দাবি করেন, সম্ভাব্য হামলা থেকে আত্মরক্ষার জন্য তিনি অস্ত্র উঁচিয়ে ধরেছিলেন এবং আইনের ব্যত্যয় ঘটাননি।
অন্যদিকে, সরকারের সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বক্তব্য, মাদক নিয়ন্ত্রণে দায়িত্বপ্রাপ্ত সংস্থা ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে সক্রিয় করার পরিবর্তে একজন প্রতিমন্ত্রীর এভাবে অভিযানে নামা সরকারকে বিব্রত করেছে। ফলে ইশরাক নিজের কর্মকাণ্ডের পক্ষে যে ব্যাখ্যা দিয়েছেন, তার পাশাপাশি প্রতিমন্ত্রী হিসেবে তাঁর দায়িত্ব ও আচরণের মধ্যে সামঞ্জস্য ছিল কি না, সেই প্রশ্নও গুরুত্ব পেয়েছে।
মন্ত্রিসভার একজন সদস্য বলেন, যার যে কাজ, তাকে সেটিই করতে হবে এবং আইন ভঙ্গ করা যাবে না। তাঁর মতে, কোনো উদ্যোগের উদ্দেশ্য ভালো হলেই দায়িত্বের সীমা অতিক্রম করার সুযোগ তৈরি হয় না। সরকার পরিচালনায় দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তিদের নিজেদের আচরণ সম্পর্কেও সতর্ক থাকতে হবে।
আরেকজন মন্ত্রী বলেন, প্রধানমন্ত্রী সবকিছু নিয়মের মধ্যে রাখতে চান। দায়িত্ব পালনের নামে অতিরিক্ত কিছু করা তিনি পছন্দ করেন না।
প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের একজন কর্মকর্তার ভাষ্য, সবাইকে ‘সিরাতুল মুস্তাকিমের পথে’ চলার বার্তা দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী। যিনি এই বার্তা বুঝবেন না বা সে অনুযায়ী চলবেন না, তিনি বিপদে পড়বেন।
রাড্ডার ঘটনায় ফেরদৌসী আহমেদ নিজের সম্পৃক্ততার অভিযোগ অস্বীকার করেছিলেন। ইশরাকও তাঁর কর্মকাণ্ডের পক্ষে ব্যাখ্যা দিয়েছেন। তবে দুজনকেই পদ ছাড়ার নির্দেশ দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী। সরকার ও দলের উচ্চপর্যায়ের সূত্রগুলো তাঁর এই কঠোর অবস্থানকে অন্য মন্ত্রী, সংসদ সদস্য ও নেতা-কর্মীদের জন্য সতর্কবার্তা হিসেবে দেখছে।
সূত্র : প্রথম আলো
