বাস্তুচ্যুত হতে পারে বাংলাদেশের ১ কোটি ৩৩ লাখ মানুষ
কাগজ ডেস্ক
প্রকাশ: ২২ অক্টোবর ২০২৬, ১০:৪৪ এএম
ছবি : সংগৃহীত
জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে আগামী ২০৫০ সালের মধ্যে বাংলাদেশে প্রায় ১ কোটি ৩৩ লাখ মানুষ অভ্যন্তরীণভাবে বাস্তুচ্যুত হতে পারেন। সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি, সুপেয় পানির সংকট ও কৃষি খাতে বিরূপ প্রভাবের কারণে এই পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে। দেশের মোট জনসংখ্যার প্রায় সাড়ে ৭ শতাংশ মানুষ এ ঝুঁকিতে রয়েছেন বলে জানিয়েছে এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি)।
এডিবির প্রকাশিত ‘এশিয়া-প্যাসিফিক ক্লাইমেট রিপোর্ট ২০২৬: কোস্টাল রিস্ক অন দ্য রাইজ—অ্যাকশনস ফর আ রেজিলিয়েন্ট ফিউচার’ শীর্ষক প্রতিবেদনে এ আশঙ্কার কথা তুলে ধরা হয়েছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়, এশিয়া ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে বিশ্বের সবচেয়ে বেশি প্লাবনঝুঁকিতে থাকা জনগোষ্ঠীর বসবাস উপকূলীয় এলাকায়। গ্রিনহাউস গ্যাসের উচ্চ নির্গমন অব্যাহত থাকলে ২১০০ সাল নাগাদ বাংলাদেশে প্রতিবছর গড়ে ১ কোটি ৭৫ লাখ মানুষ উপকূলীয় প্লাবনের শিকার হতে পারেন।
বিশ্বজুড়ে ২০৫০ সালের মধ্যে প্রতিবছর প্রায় ৩ কোটি ৩০ লাখ মানুষ উপকূলীয় বন্যায় আক্রান্ত হতে পারেন। ২১০০ সাল নাগাদ এ সংখ্যা বেড়ে দাঁড়াতে পারে ১০ কোটি ৮০ লাখে। গঙ্গা-ব্রহ্মপুত্র বদ্বীপসহ এশিয়ার ঘনবসতিপূর্ণ নদী অববাহিকাগুলোতে এ ঝুঁকি বেশি কেন্দ্রীভূত।
দরিদ্র ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠী বেশি ঝুঁকিতে
এডিবির প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, বাংলাদেশ ও মিয়ানমারের মতো উন্নয়নশীল দেশগুলোতে উপকূলীয় প্লাবনে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হন দরিদ্র ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর মানুষ। প্রাকৃতিক দুর্যোগে তাদের জীবন-জীবিকা মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়। দীর্ঘ মেয়াদে এ পরিস্থিতি দারিদ্র্য ও বঞ্চনার চক্রকে আরও গভীর করে।
দুর্যোগ মোকাবিলায় বাংলাদেশের উদ্যোগের প্রশংসা
জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকির পাশাপাশি দুর্যোগ মোকাবিলায় বাংলাদেশের নেওয়া কিছু উদ্যোগের প্রশংসাও করেছে এডিবি। প্রতিবেদনে বলা হয়, আগাম সতর্কবার্তা ও সমন্বিত প্রস্তুতি জোরদার করতে বাংলাদেশে বহুমুখী ঘূর্ণিঝড় আশ্রয়কেন্দ্র গড়ে তোলা হয়েছে। দুর্যোগের সময় উপকূলীয় মানুষের জীবন রক্ষায় এসব অবকাঠামো কার্যকর ভূমিকা রাখছে।
তবে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলায় স্থানীয় পর্যায়ে অভিযোজন পরিকল্পনা দ্রুত বাস্তবায়ন, ম্যানগ্রোভ বন সংরক্ষণ, প্রাকৃতিক প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা শক্তিশালী করা এবং জলবায়ু অর্থায়ন বাড়ানোর ওপর জোর দিয়েছে সংস্থাটি।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, প্রয়োজনীয় অভিযোজন ব্যবস্থা নেওয়া না হলে এশিয়া ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে উপকূলীয় বন্যার বার্ষিক ক্ষয়ক্ষতি ২০৫০ সালের মধ্যে প্রায় ছয় গুণ এবং ২১০০ সাল নাগাদ প্রায় ২০ গুণ বাড়তে পারে। বিপরীতে, উপকূলীয় সুরক্ষা ও অভিযোজন খাতে সময়মতো বিনিয়োগ করা গেলে বিনিয়োগের তুলনায় সর্বোচ্চ ২০ গুণ পর্যন্ত সুফল পাওয়া সম্ভব।
বন্যায় আর্থিক ক্ষতি বাড়ার আশঙ্কা
এশিয়া ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের ৩০টি উপকূলীয় অর্থনীতির ওপর পরিচালিত সমীক্ষার তথ্য তুলে ধরে এডিবি জানিয়েছে, বর্তমানে এ অঞ্চলে প্লাবনজনিত বার্ষিক ক্ষতির পরিমাণ প্রায় ২৭ বিলিয়ন ডলার। পর্যাপ্ত সুরক্ষামূলক ব্যবস্থা না নিলে ২০৫০ সালের মধ্যে এ ক্ষতি বেড়ে ১৭২ বিলিয়ন থেকে ১৯৯ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছাতে পারে। ২১০০ সাল নাগাদ তা দাঁড়াতে পারে ৫২০ বিলিয়ন থেকে ৭৩৯ বিলিয়ন ডলারে।
বর্তমান পর্যায়ে বন্যাজনিত ক্ষয়ক্ষতি সীমিত রাখতে প্রতিবছর উপকূলীয় সুরক্ষায় প্রায় ৯ বিলিয়ন থেকে ১৯ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগের প্রয়োজন হতে পারে। এ বিনিয়োগের ফলে প্রতিবছর ১৭৮ বিলিয়ন থেকে ৩৬০ বিলিয়ন ডলারের ক্ষতি এড়ানো সম্ভব বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
এডিবির ক্লাইমেট চেঞ্জ অ্যান্ড সাসটেইনেবল ডেভেলপমেন্ট ডিপার্টমেন্টের মহাপরিচালক ইয়েভগেনি জুকোভ বলেন, এশিয়া ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের অগ্রগতিতে উপকূলীয় এলাকাগুলোর গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। কিন্তু সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি ও তীব্র প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে এসব এলাকার ভূখণ্ড ক্রমেই হারিয়ে যাচ্ছে।
তিনি বলেন, মানুষ ও তাদের জীবনযাত্রার নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ধরে রাখতে দীর্ঘমেয়াদি, অভিযোজনযোগ্য ও ঝুঁকি কমাতে সহায়ক সমাধান গ্রহণের এখনই সময়।
উপকূলীয় এলাকায় বিপুল জনগোষ্ঠীর বসবাস
এডিবির সদস্য দেশগুলোতে উপকূলের ১০ কিলোমিটারের মধ্যে বসবাস করেন ৪০ কোটিরও বেশি মানুষ, যা প্রতি ১০ জনে একজনেরও বেশি। এসব এলাকা শুধু বিপুল জনগোষ্ঠীর আবাসস্থল নয়; গুরুত্বপূর্ণ সমুদ্রবন্দর, বাণিজ্যিক কেন্দ্র, পর্যটন এলাকা ও বিশ্ব ঐতিহ্যেরও ভিত্তি।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, উপকূলীয় বন্যায় বড় অর্থনীতির দেশগুলোও ব্যাপক আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়তে পারে। তবে ক্ষুদ্র দ্বীপরাষ্ট্রগুলোর জন্য পরিস্থিতি আরও গুরুতর হতে পারে। উচ্চ কার্বন নিঃসরণের পরিস্থিতি অব্যাহত থাকলে ২১০০ সাল নাগাদ এসব রাষ্ট্রে বার্ষিক বন্যাজনিত ক্ষতির পরিমাণ মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) ৩০ থেকে ৬০ শতাংশে পৌঁছাতে পারে।
বড় শহর ও বন্দরেও বাড়ছে ঝুঁকি
ব্যাংকক, জাকার্তা, কলকাতা ও মুম্বাইয়ের মতো বড় শহরগুলোও উপকূলীয় বন্যার উচ্চ ঝুঁকিতে রয়েছে। ঐতিহাসিক তথ্য বিশ্লেষণ অনুযায়ী, এসব শহরে যে ধরনের ভয়াবহ উপকূলীয় বন্যা আগে ১০০ বছরে একবার ঘটত, শতাব্দীর শেষ নাগাদ তা প্রতিবছর ঘটার আশঙ্কা রয়েছে।
এ ছাড়া উপকূলীয় বন্যার কারণে এ অঞ্চলের বন্দরগুলোতে বাণিজ্যিক কার্যক্রম ব্যাহত হওয়ার ঝুঁকিও বাড়ছে। এতে প্রতিবছর প্রায় ৪০ বিলিয়ন থেকে ৪৫ বিলিয়ন ডলারের সম্পদ বা বাণিজ্য ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে।
এ পরিস্থিতি মোকাবিলায় স্বল্পমেয়াদি ও দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়ন লক্ষ্যের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে উপকূলীয় অভিযোজন পরিকল্পনা গ্রহণ ও বাস্তবায়নের আহ্বান জানিয়েছে এডিবি।
