পাখির ডানায় শীতের বার্তা, অপার সৌন্দর্যে জেগেছে চলনবিল
মো. মাজেম আলী মলিন, গুরুদাসপুর (নাটোর) প্রতিনিধি
প্রকাশ: ২১ অক্টোবর ২০২৬, ০৩:২৬ পিএম
ছবি: ভোরের কাগজ
শরতের বিদায়বেলায় হেমন্তের মৃদু পরশ। ভোরের আকাশে সোনালি রোদের আভা ফুটতেই জলরাশির বুক চিরে ডানা মেলে উড়ে যায় পাখির ঝাঁক। কখনো নীল আকাশে তাদের অবাধ বিচরণ, কখনো অগভীর পানিতে ঠোঁট ডুবিয়ে খাদ্য অনুসন্ধান, আবার কখনো জলজ উদ্ভিদের পাশে নিশ্চুপ দাঁড়িয়ে থাকা—সব মিলিয়ে প্রকৃতির এক অনুপম ক্যানভাস। পাখির কলকাকলিতে মুখর হয়ে উঠেছে উত্তরাঞ্চলের বিস্তীর্ণ জলাভূমি চলনবিল। শীতের আগমনী বার্তা নিয়ে এখানে জড়ো হচ্ছে নানা প্রজাতির দেশি ও পরিযায়ী পাখি। জল, আকাশ আর সবুজের মিতালিতে চলনবিল যেন ফিরে পাচ্ছে তার হারানো প্রাণস্পন্দন।
নাটোরের গুরুদাসপুর থেকে সিংড়া , তাড়াশ ও বারুহাস হয়ে বিস্তীর্ণ বিলাঞ্চলের দিকে তাকালে চোখে পড়ে পাখিদের বিচিত্র উপস্থিতি। সাদা বক, পানকৌড়ি, শামুকখোল, বালিহাঁস, ডাহুকসহ নানা প্রজাতির পাখির ওড়াউড়িতে বিলের আকাশ হয়ে উঠেছে প্রাণবন্ত। অগভীর পানিতে মাছের সন্ধানে ডুব দিচ্ছে পানকৌড়ি, দল বেঁধে উড়ে যাচ্ছে বালিহাঁস, আর জলাভূমির কিনারে স্থির দাঁড়িয়ে থাকা বক যেন প্রকৃতির নীরব সাধক। পাখিদের এই অবাধ বিচরণ শুধু চোখ জুড়ায় না, মানুষের ব্যস্ত জীবনে এনে দেয় প্রশান্তির এক অনির্বচনীয় অনুভূতি।
মৎস্য ও শস্যভাণ্ডার হিসেবে পরিচিত চলনবিল শুধু একটি জলাভূমিই নয়; এটি উত্তরাঞ্চলের প্রকৃতি, জীববৈচিত্র্য, কৃষি, মৎস্যসম্পদ ও জনজীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ। নাটোর, সিরাজগঞ্জ ও পাবনা জেলার বিস্তীর্ণ অঞ্চলজুড়ে এর বিস্তার। বর্ষায় পানিতে টইটম্বুর বিল শুষ্ক মৌসুমে ধীরে ধীরে সংকুচিত হয়ে আসে। পানির এই স্বাভাবিক পরিবর্তনের সঙ্গে পাল্টে যায় পাখিদের বিচরণক্ষেত্রও। অগভীর জলাশয়, উন্মুক্ত চর, জলজ উদ্ভিদ এবং মাছের সহজলভ্যতা নানা প্রজাতির পাখির জন্য তৈরি করে অনুকূল পরিবেশ। শীতের আগমনে তাই চলনবিল হয়ে ওঠে পাখিদের খাদ্য সংগ্রহ, বিশ্রাম ও আশ্রয়ের গুরুত্বপূর্ণ আবাসস্থল।
সকালের আলোয় পাখিদের এই জীবনচিত্র যেন প্রকৃতির নিজস্ব ভাষায় লেখা এক কবিতা। কখনো পাখির ডানায় সূর্যের আলো ঝিলিক দেয়, কখনো তাদের সম্মিলিত কলকাকলি ভেসে আসে দূরের কোনো জলাশয় থেকে। জেলেরা নৌকা নিয়ে মাছ ধরতে যান, কৃষকেরা মাঠে নামেন, আর বিলের বুকে পাখিরা ব্যস্ত থাকে নিজেদের জীবনযাপনে। মানুষের জীবিকা ও প্রকৃতির এই সহাবস্থান চলনবিলকে দিয়েছে স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্য। এখানে প্রকৃতি কেবল দেখার বিষয় নয়, মানুষের প্রতিদিনের জীবনযাত্রারও অংশ।
তবে এই সৌন্দর্যের আড়ালে রয়েছে উদ্বেগের গল্প। পাখিরা যখন দূরদেশ থেকে নিরাপদ আশ্রয়ের সন্ধানে আসে, তখন কিছু অসাধু শিকারি তাদের জন্য মৃত্যুফাঁদ পেতে রাখে। কোথাও জাল, কোথাও ফাঁদ, আবার কোথাও অবৈধভাবে পাখি শিকারের চেষ্টা—এসব কর্মকাণ্ড পরিযায়ী ও দেশি পাখির নিরাপত্তাকে হুমকির মুখে ঠেলে দেয়। যে পাখিরা জলাভূমির সৌন্দর্য বাড়ায়, ক্ষতিকর পোকামাকড় নিয়ন্ত্রণে ভূমিকা রাখে এবং পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় অবদান রাখে, তাদের নির্বিচারে হত্যা করা মানে প্রকৃতির নিজস্ব ব্যবস্থাকেই দুর্বল করে দেওয়া।
চলনবিল জীববৈচিত্র্য রক্ষা কমিটির সভাপতি ও বিল হালতী ত্রিমোহনী কলেজের সহকারী অধ্যাপক আখতারুজ্জামান দীর্ঘদিন ধরে পাখি ও জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণে কাজ করছেন। তাঁর দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ২০১২ সাল থেকে কমিটির সদস্যরা বিলের দুর্গম এলাকায় গিয়ে পাখি শিকারের বিরুদ্ধে সচেতনতা তৈরি, শিকারিদের অপতৎপরতা সম্পর্কে প্রশাসনকে অবহিত করা এবং জীববৈচিত্র্য রক্ষায় বিভিন্ন কর্মসূচি পালন করে আসছেন। তাঁদের এই উদ্যোগ প্রমাণ করে, প্রকৃতি রক্ষার দায়িত্ব শুধু প্রশাসনের নয়; সচেতন মানুষের সম্মিলিত প্রচেষ্টাও পারে একটি বিস্তীর্ণ জলাভূমিকে পাখিদের নিরাপদ আশ্রয়ে পরিণত করতে।
গুরুদাসপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ফাহমিদা আফরোজ বলেন, “পাখি সংরক্ষণে প্রশাসনিক অভিযান অব্যাহত রয়েছে। পাখি শিকারের দায়ে কয়েকজনকে জেল-জরিমানাও করা হয়েছে। পাখিদের নিরাপদ বিচরণক্ষেত্র নিশ্চিত করতে নিয়মিত নজরদারি, আইন প্রয়োগ ও জনসচেতনতা বৃদ্ধির পাশাপাশি স্থানীয়দের সক্রিয় অংশগ্রহণ জরুরি।”
স্থানীয় সংসদ সদস্য আলহাজ্ব আব্দুল আজিজ বলেন, চলনবিলকে পর্যটনশিল্প হিসেবে গড়ে তোলার লক্ষ্যে কাজ করা হচ্ছে। পরিকল্পিত প্রকৃতিনির্ভর পর্যটন স্থানীয় কর্মসংস্থান বাড়ানোর পাশাপাশি বিলের সৌন্দর্য ও জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণে ভূমিকা রাখবে। তবে পর্যটন উন্নয়নে বিলের স্বাভাবিক পরিবেশ ও পাখির আবাসস্থল রক্ষা করতে হবে।
রোজী মোজাম্মেল মহিলা অনার্স কলেজের জীববিজ্ঞান বিভাগের সহকারী অধ্যাপক নাজমুন নাহার বলেন, “চলনবিলের জীববৈচিত্র্য রক্ষায় পাখি শিকার বন্ধ, জলাভূমি সংরক্ষণ ও পরিবেশবান্ধব পর্যটন নিশ্চিত করতে হবে। এ কাজে স্থানীয় মানুষ, শিক্ষার্থী ও পরিবেশকর্মীদের সম্মিলিতভাবে এগিয়ে আসা জরুরি।”
চলনবিলের শীতের সকাল শুধু পাখির কলকাকলি নয়, প্রকৃতির এক অপার মুগ্ধতা। এই সৌন্দর্য বেঁচে থাকুক যুগের পর যুগ, পাখিরা ফিরুক নির্ভয়ে, আর জল-প্রকৃতি ও মানুষের বন্ধন হোক আরও নিবিড়। পাখির ডানায় ভর করে চলনবিলে বারবার ফিরে আসুক জীবনের গান, প্রকৃতির চিরন্তন মায়া।
