প্রধানমন্ত্রীর রাজশাহী সফরে ফেসবুকে ‘হুমকি’, বাবা-ছেলে ডিবি হেফাজতে
কাগজ ডেস্ক
প্রকাশ: ২২ অক্টোবর ২০২৬, ০৫:৫৯ পিএম
ছবি: সংগৃহীত
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের রাজশাহী সফর নিয়ে একটি ছবি ফেসবুকে পোস্ট করা হয়েছিল। ছবিটি দেখে মন্তব্য করেন রাজশাহীর এক কলেজছাত্র। লেখেন, ‘ইস! একটা বড় সুযোগ ছিল, শুধু একটা স্নাইপারের অভাব ছিল।’ তার হুমকিমূলক এই মন্তব্যটি ঘিরে শুরু হয় আলোচনা।
পরদিন বুধবার অভিযান চালিয়ে ওই তরুণকে আটক করে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। পরে তার বাবাকেও হেফাজতে নেওয়া হয়। বর্তমানে বাবা-ছেলে দুজনই ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) হেফাজতে রয়েছেন।
আটক তরুণের নাম আবু বকর সিদ্দিক (২২)। তিনি রাজশাহী নগরের চন্দ্রিমা থানার কেচুয়াতৈল এলাকার বাসিন্দা। তার বাবা আয়নাল হক পেশায় কৃষক। আবু বকর রাজশাহী নিউ গর্ভমেন্ট ডিগ্রি কলেজের ইতিহাস বিভাগের প্রথম বর্ষের শিক্ষার্থী।
এসব তথ্য জানিয়েছেন এসআরবি-৫-এর অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল ফয়সাল ইশতিয়াক। তিনি বললেন, ‘আমরা দুজনকেই ডিবির কাছে হস্তান্তর করেছি। এ বিষয়ে বিস্তারিত তারা (ডিবি) পরে জানাবে।’
আরও পড়ুন: এবার হেফাজতের উদ্যোগে নতুন প্ল্যাটফর্ম, থাকছে জামায়াত জোটের ২ দল
স্থানীয়রা জানান, পড়াশোনার পাশাপাশি ভ্যানে সবজি পরিবহনের কাজ করেন আবু বকর। নিয়মিত পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ আদায় করেন। এলাকায় ভালো ছেলে হিসেবে তার পরিচিতি রয়েছে। বাইকারদের একটি দলের সঙ্গেও তার যোগাযোগ রয়েছে। দলটির সদস্যদের সঙ্গে মোটরসাইকেলে দূর-দূরান্তে ঘুরতে যান তিনি। আবু বকরের মা আসমাউল হুসনা দাবি করেন, তার ছেলে নিরীহ, পরিশ্রমী ও মেধাবী। তাকে এ ঘটনায় ফাঁসিয়ে দেওয়া হচ্ছে বলে অভিযোগ করেন তিনি।
স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, বুধবার দুপুর ২টার দিকে রাজশাহী মহানগর পুলিশের সাইবার ক্রাইম ইউনিট ও চন্দ্রিমা থানা পুলিশের একটি দল আবু বকরের বাড়িতে যায়। তবে তাকে সেখানে পাওয়া যায়নি। পরিবারের সদস্যরা তার অবস্থান সম্পর্কে কিছু জানাতে চাননি। পরে বিকাল ৪টার দিকে এসআরবি-৫-এর একটি দল সাদা পোশাকে ওই বাড়িতে অভিযান চালায়। আবু বকরকে না পেয়ে তার বাবা আয়নালকে আটক করে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। একপর্যায়ে আয়নাল জানান, তার ছেলে জেলার পবা উপজেলার হাটরামচন্দ্রপুর ঘোলহারিয়া গ্রামে মামার বাড়িতে আত্মগোপন করে আছেন।
পরে এসআরবি সদস্যরা আয়নালকে সঙ্গে নিয়ে ওই বাড়িতে যান। সেখান থেকে আবু বকরকে আটক করা হয়। অভিযানে বাবা-ছেলেকে হেফাজতে নেওয়ার পাশাপাশি পরিবারের ব্যবহৃত একটি মোবাইল ফোন জব্দ করা হয়। পরে তাদের ডিবির কাছে হস্তান্তর করা হয়।
এদিকে, বৃহস্পতিবার সকালে আবু বকরের বাড়িতে তল্লাশি চালায় চন্দ্রিমা থানা পুলিশ। থানার ওসি মনিরুল ইসলামের নেতৃত্বে প্রায় এক ঘণ্টা তল্লাশি চালানো হয়। তবে জব্দ করার মতো কোনো আলামত পাওয়া যায়নি। শুধু একটি পেনড্রাইভের মোড়ক জব্দ করা হয়েছে। আবু বকরের ব্যবহৃত একটি ল্যাপটপ উদ্ধারের চেষ্টা করে পুলিশ। তবে পরিবারের সদস্যরা দাবি করেছেন, আবু বকর ল্যাপটপ ব্যবহার করতেন না।
আবু বকরের রাজনৈতিক পরিচয় নিয়েও নানা বক্তব্য পাওয়া গেছে। রাজশাহী নিউ গর্ভমেন্ট ডিগ্রি কলেজের ইতিহাস বিভাগের সহকারী অধ্যাপক শরিফুল ইসলাম বললেন, ‘আবু বকর কলেজের নিয়মিত শিক্ষার্থী। তিনি প্রথম বর্ষের চূড়ান্ত পরীক্ষা দিয়েছেন। তবে ফল প্রকাশিত হয়নি।’ কলেজে তার মধ্যে খারাপ কিছু দেখেননি বলে জানান এই শিক্ষক।
শরিফুল ইসলাম জানান, ফেসবুকে মন্তব্যের বিষয়টি জানার পর তিনি কয়েকজন শিক্ষার্থীর সঙ্গে কথা বলেছেন। তাদের কাছ থেকে তিনি জানতে পেরেছেন, আবু বকরের বাবা আগে আওয়ামী লীগের সমর্থক ছিলেন। ৫ আগস্টের পর জামায়াতের লোকজনের সঙ্গে মিশছেন বলে তারা জানিয়েছেন। আবু বকর পারিবারিক সূত্রে ছাত্রলীগ করতেন বলেও তিনি শুনেছেন। তবে কলেজে তার কোনো রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড দেখেননি বলে জানান শিক্ষক।
রাজশাহী নিউ গর্ভমেন্ট ডিগ্রি কলেজ ছাত্রদলের সভাপতি মাহমুদ হাসান লিমন বলেছেন, ‘আমি প্রশাসনের লোকজনের কাছে শুনলাম যে আবু বকর আগে ছাত্রলীগ করত। এখন নাকি ছাত্রশিবির করছে। কিন্তু কলেজে আমি কোনো কিছু দেখিনি। তাকে আমরা সেভাবে চিনতামও না।’
তবে আবু বকর ছাত্রশিবিরের সঙ্গে যুক্ত নন বলে দাবি করেছেন সংগঠনটির রাজশাহী মহানগরের সভাপতি ইমরান নাজির। তিনি বললেন, ‘এখন কিছু হলেই শিবিরের ওপর দায় চাপিয়ে দেওয়ার একটা অপচেষ্টা চলছে। কিন্তু আবু বকর সিদ্দিক আমাদের জনশক্তি না।’
চন্দ্রিমা থানার ওসি মনিরুল ইসলাম জানান, আবু বকর আগে কখনো গ্রেপ্তার হয়েছিলেন কি না, সে বিষয়ে কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি। তার নামে কোনো মামলা আছে কি না, সে তথ্যও পাওয়া যায়নি। তার রাজনৈতিক সম্পৃক্ততা সম্পর্কেও পুলিশের কাছে কোনো তথ্য নেই বলে জানান তিনি।
