সিলেটের মাঠে সোনালি স্বপ্ন, আমনে ৪ লাখ টন ধান উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা
নজরুল ইসলাম, সিলেট প্রতিনিধি
প্রকাশ: ২১ অক্টোবর ২০২৬, ০৩:১৪ পিএম
ফাইল ছবি
সিলেটের বিস্তীর্ণ ফসলের মাঠজুড়ে এখন সবুজের বুকে উঁকি দিচ্ছে সোনালি ধানের শীষ। গোয়াইনঘাট, জৈন্তাপুর, কোম্পানীগঞ্জসহ জেলার বিভিন্ন উপজেলার মাঠে মাঠে পাকতে শুরু করেছে আগাম জাতের আমন ধান। বাতাসে দোল খাওয়া ধানের শীষে দুলছে কৃষকের সোনালি স্বপ্ন। অনুকূল আবহাওয়া ও রোগবালাইয়ের তুলনামূলক কম আক্রমণে এবার ভালো ফলনের আশা করছেন কৃষকরা। কোথাও কোথাও শুরু হয়েছে ধান কাটা। আর কিছুদিনের মধ্যেই গ্রামবাংলার চিরচেনা ধান কাটা ও মাড়াইয়ের উৎসবে মুখর হয়ে উঠবে কৃষকের উঠান।
চলতি মৌসুমে সিলেট জেলায় ১ লাখ ৪৬ হাজার হেক্টর জমিতে আমন ধান আবাদের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে কৃষি বিভাগ। এ থেকে ৪ লাখ ২৪ হাজার ৩৪২ মেট্রিক টন ধান উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা রয়েছে। আবহাওয়া অনুকূলে থাকলে এবং বড় ধরনের কোনো প্রাকৃতিক দুর্যোগ না হলে নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রা অর্জন সম্ভব হবে বলে আশা করছে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের সিলেট জেলার উপপরিচালক মো. শামসুজ্জামান বলেন, চলতি মৌসুমে আমন ধান আবাদের লক্ষ্যমাত্রা ১ লাখ ৪৬ হাজার হেক্টর জমি এবং উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ৪ লাখ ২৪ হাজার ৩৪২ মেট্রিক টন। সবকিছু ঠিক থাকলে ইনশাআল্লাহ নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রা পূরণ হবে বলে তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন।
কৃষি বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, এবার সিলেটের বিভিন্ন এলাকায় ব্রি ধান-৭১, ব্রি ধান-৭৫, ব্রি ধান-৫৬, বিনা ধান-৭ ও বিনা ধান-১৭সহ বিভিন্ন স্বল্পমেয়াদি ও আধুনিক জাতের ধান আবাদ করেছেন কৃষকরা। এসব জাতের ধান প্রচলিত অনেক জাতের তুলনায় প্রায় ২০ থেকে ২৫ দিন আগে পরিপক্ব হয়। ফলে আগাম ধান ঘরে তোলার পাশাপাশি একই জমিতে শীতকালীন ফসল চাষের সুযোগ তৈরি হচ্ছে।
স্থানীয় কৃষকদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, আগাম জাতের আমন ধান চাষে একদিকে পরিবারের খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিত হচ্ছে, অন্যদিকে বাড়তি আয়ের সম্ভাবনাও তৈরি হচ্ছে। আশ্বিন-কার্তিক মাসে অনেক কৃষক পরিবারকে খাদ্যসংকটের মুখে পড়তে হয়। এ সময়ে নতুন ধান ঘরে তুলতে পারলে সেই সংকট মোকাবিলা সহজ হয়। পাশাপাশি ধান কাটার পর জমি পতিত না রেখে সরিষা, আলু ও শীতকালীন সবজিসহ বিভিন্ন রবিশস্য আবাদ করা যায়। এতে একই জমিতে বছরে একাধিক ফসল উৎপাদন করে আর্থিকভাবে লাভবান হওয়ার সুযোগ বাড়ছে।
গোয়াইনঘাট উপজেলার রুস্তমপুর, লেঙ্গুড়া, তোয়াকুল ও নন্দীরগাঁও ইউনিয়নের বিভিন্ন মাঠ ঘুরে দেখা গেছে, ধানগাছের শীষে সোনালি আভা ফুটে উঠেছে। কোথাও ধান পাকতে শুরু করেছে, কোথাও চলছে ধান কাটার প্রস্তুতি। জমির আইল পরিষ্কার করা থেকে শুরু করে ফসল ঘরে তোলার নানা কাজে ব্যস্ত সময় পার করছেন কৃষকরা। জৈন্তাপুর ও কোম্পানীগঞ্জসহ জেলার অন্যান্য এলাকার ফসলের মাঠেও দেখা যাচ্ছে একই চিত্র।
গোয়াইনঘাট উপজেলার নন্দীরগাঁও ইউনিয়নের কৃষক রুহুল আমিন বলেন, “গত বছরও আগাম জাতের ধানে ভালো ফলন পেয়েছিলাম। এবারও ধানের শীষ বেশ পুষ্ট হয়েছে। ধান কাটা শুরু করেছি। দ্রুত ধান ঘরে তুলে একই জমিতে সরিষা বোনার প্রস্তুতি নিচ্ছি। এতে জমি ফেলে রাখতে হবে না, পাশাপাশি বাড়তি আয়ের সুযোগও তৈরি হবে।”
কৃষি বিভাগের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, আধুনিক কৃষিপ্রযুক্তির প্রসার, উন্নত জাতের বীজের ব্যবহার এবং কৃষকদের মধ্যে সচেতনতা বাড়ায় স্বল্পমেয়াদি ধানের আবাদে আগ্রহ বাড়ছে। আগাম ধান ঘরে তোলা সম্ভব হওয়ায় পরবর্তী মৌসুমের ফসলও সময়মতো আবাদ করা যায়। এতে জমির উৎপাদনশীলতা বাড়ার পাশাপাশি ফসলের নিবিড়তা বৃদ্ধির সুযোগ তৈরি হচ্ছে।
কৃষি বিভাগের আশা, রোগবালাইয়ের তুলনামূলক কম আক্রমণ এবং সময়মতো সার ও সেচ ব্যবস্থাপনার কারণে চলতি মৌসুমে ভালো ফলন পাওয়া যাবে। তবে চূড়ান্ত উৎপাদনের চিত্র জানা যাবে ধান কাটা ও মাড়াই শেষে।
সিলেটের কৃষিপ্রধান জনপদে মাঠে মাঠে ছড়িয়ে পড়া সোনালি আভা এখন কৃষকের ঘরে নতুন ফসল তোলার বার্তা দিচ্ছে। আগাম আমন ধান ঘরে তোলার পর একই জমিতে শীতকালীন ফসল আবাদ করতে পারলে কৃষকের আয় বাড়বে, কমবে জমি পতিত থাকার সময়ও। তাই মাঠের সোনালি ধান ঘরে তোলার অপেক্ষায় দিন গুনছেন সিলেটের কৃষক পরিবারগুলো।
