×

প্রথম পাতা

নির্বাচনী সংস্কার

আনুপাতিক হারে আসন বণ্টনের দাবিতে ষড়যন্ত্র দেখছে বিএনপি

Icon

রুমানা জামান

প্রকাশ: ১৯ অক্টোবর ২০২৪, ১২:০০ এএম

প্রিন্ট সংস্করণ

আনুপাতিক হারে আসন  বণ্টনের দাবিতে ষড়যন্ত্র দেখছে বিএনপি

দেশে বিদ্যমান নির্বাচন ব্যবস্থা সংস্কারের উদ্যোগ নিয়েছে ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকার। এ লক্ষ্যে গঠিত কমিশন এরই মধ্যে কাজও শুরু করেছে। এই প্রেক্ষাপটে নির্বাচন পদ্ধতি পরিবর্তন নিয়ে শুরু হয়েছে নানামুখী আলোচনা। রাজনৈতিক দলগুলোর একটি অংশ চলমান পদ্ধতিতে জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পরিবর্তে সংখ্যানুপাতিক প্রতিনিধিত্ব পদ্ধতিতে নির্বাচনের পক্ষে আওয়াজ তুলেছে।

তবে দেশের অন্যতম প্রধান দল বিএনপি এই পদ্ধতির ঘোর বিরোধী। তারা বর্তমান পদ্ধতিতে নির্বাচনের পক্ষে। দলটি মনে করে, নির্বাচনী ব্যবস্থা সংস্কারের নামে ভোটের আনুপাতিক হারে আসন বণ্টনের যে দাবি তোলা হচ্ছে; তা নিছকই ষড়যন্ত্র। ভারতের সঙ্গে সমন্বয় করে আওয়ামী লীগকে এ দেশের রাজনীতিতে পুনর্বাসন করতে ‘দেশি কিছু দালাল’ এই ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠিত করতে চাইছে।

সংখ্যানুপাতিক বা আনুপাতিক প্রতিনিধিত্ব পদ্ধতিতে নির্বাচন হলো- আসনভিত্তিক কোনো প্রার্থী থাকবে না। ভোটাররা দলীয় প্রতীকে ভোট দেবেন। একটি দল যত শতাংশ ভোট পাবে, সে অনুপাতে সংসদের আসন বণ্টন হবে। বিএনপির নেতাদের ভাষ্য- সংখ্যানুপাত পদ্ধতিতে নির্বাচন বাংলাদেশের জন্য একটা মারাত্মক ক্ষতিকর ধারণা।

কারণ, এই পদ্ধতিতে দলের ভেতর প্রধান নেতার ক্ষমতা আরো বাড়বে। চরম অস্থিতিশীল সরকার তৈরি হবে। পাশাপাশি নির্বাচনে এই পদ্ধতি প্রয়োগের ফলে রাজনৈতিক দলের সঙ্গে জনগণের দূরত্ব বাড়বে এবং পুরো পার্লামেন্ট থাকবে সুশীলদের দখলে। আওয়ামীদের পুনর্বাসন হবে বামপন্থি দল হিসেবে।

দলটির হাইকমান্ডের শঙ্কা, নির্বাচনী সংস্কারের নামে ভোটের আনুপাতিক হারে আসন বণ্টনের দাবির পেছনে ভিনদেশি এজেন্ডা রয়েছে। অতীতেও ভিনদেশি এজেন্ডার কারণে দেশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। তাছাড়া আওয়ামী লীগকে রাজনৈতিকভাবে প্রতিষ্ঠিত করার জন্য এ দাবি অন্য কারো প্রকল্প হতে পারে। আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনে দলটি যাতে অংশ নিতে পারে এবং আনুপাতিক ভোটের মাধ্যমে সংসদে আসন পেতে পারে, সে ছক এঁকেই কেউ কেউ কাজ করছেন।

সংখ্যানুপাত পদ্ধতিতে নির্বাচন চান কিনা? এমন প্রশ্নের জবাবে বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর ভোরের কাগজকে স্পষ্ট করে বলেন, আমরা এটাকে কোনোভাবেই সমর্থন করব না। কারণ, বাংলাদেশে এই পদ্ধতির চর্চা নেই। এটা এই দেশে কাজে দেবে না। এটা নিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষার প্রয়োজন রয়েছে। সুতরাং এটি এবারের নির্বাচনে প্রয়োগের প্রশ্নই ওঠে না।


অন্যদিকে, জামায়াতে ইসলামী, জাতীয় পার্টিসহ কয়েকটি ইসলামিক ও বাম দল এবং দেশের সুশীল-বুদ্ধিজীবীদের বড় একটি অংশ আগামী ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন সংখ্যাগরিষ্ঠ পদ্ধতির পরিবর্তে আনুপাতিক পদ্ধতিতে করার জোর দাবি তুলেছে। এই অংশ মনে করছে, আনুপাতিক হারে নির্বাচন করলে দেশে আর স্বৈরশাসকের ভূমিকায় কেউ দাঁড়াতে পারবে না। সংসদে সব দলের অংশগ্রহণের মাধ্যমে দেশের কল্যাণ ও ছাত্র-জনতার অধিকার প্রতিষ্ঠা হবে। দেশের বুদ্ধিজীবী অংশও একই সুরে তাল মিলিয়ে বলছেন, বাংলাদেশে আসনভিত্তিক নির্বাচন হয়। যিনি সর্বোচ্চ ভোট পান, তিনিই এমপি হন; অন্যরা কিছুই হন না।

এ ক্ষেত্রে যিনি আসনভিত্তিক দ্বিতীয়-তৃতীয় হবেন, তার দলেরও অংশগ্রহণ থাকবে সংসদীয় কাঠামোতে। এতে আনুপাতিক প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত হবে। প্রতিটি দল যত ভোট পাবে, তার ভিত্তিতে সংসদে প্রতিনিধিত্ব করবে। দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে হাবিবুল আউয়াল কমিশনের ডাকা সংলাপেও জাতীয় পার্টিসহ কয়েকটি দল আনুপাতিক পদ্ধতিতে নির্বাচনের প্রস্তাব দিয়েছিল।

রাজধানীতে একটি সেমিনারে গত ১২ অক্টোবর কথা বলেন বিএনপি, সিপিবি, জামায়াতে ইসলামী, জাতীয় পার্টি, এবি পার্টি, গণসংহতি আন্দোলন ও গণঅধিকার পরিষদের প্রতিনিধিরা। এর মধ্যে বিএনপি ছাড়া অন্য দলগুলো আনুপাতিক পদ্ধতির পক্ষে নিজেদের মত দেয়। গত ৯ অক্টোবর হোটেল ওয়েস্টিনে রাষ্ট্র সংস্কার প্রস্তাবনায় জামায়াতে ইসলামীর নায়েবে আমির সৈয়দ আবদুল্লাহ মো. তাহের বলেন, জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আনুপাতিক

প্রতিনিধিত্বমূলক ব্যবস্থা চালু করতে হবে। ইভিএম ভোটিং সিস্টেম বাতিলের প্রস্তাবও দেন তিনি। ওই দাবির পর থেকে বিভিন্ন অঙ্গন থেকে আনুপাতিক হারে ভোটের পক্ষে দাবি উঠতে থাকে।

তবে সংখ্যানুপাত পদ্ধতিতে নির্বাচন দেশের নির্বাচন ব্যবস্থার ওপর হুমকি দাবি করে বিএনপির নেতারা এ বিষয়ে নানা ধরনের যুক্তি দেখিয়েছেন। নেতারা বলছেন, সংখ্যানুপাতিক নির্বাচনের জন্য যারা আওয়াজ তুলছেন, তারা হয়তো বুঝতেই পারছেন না- এই পদ্ধতিতে তাদের আমছালা সবই যাবে। এই ব্যবস্থায় একটি দলকে মোট ভোটের ৫ শতাংশ ভোট পেতে হবে, নাইলে আপনি কিছুই পাবেন না। বাংলাদেশে সিপিবি সম্ভবত এখন পর্যন্ত কোনো নির্বাচনে ১ শতাংশ মোট ভোট পায়নি। জামায়াতে ইসলামীর ভোট বাংলাদেশে ঐতিহাসিকভাবে ৫-১০ শতাংশ; তবে এবার হয়তো বাড়বে। মোট কথা হলো- যে দল মোট ভোটের ৫ শতাংশ পাবে না তার প্রতিনিধিত্ব থাকবে না।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে বিএনপির এক সিনিয়র নেতা সংখ্যানুপাত পদ্ধতিতে নির্বাচন ব্যবস্থা চালু করার যুক্তি খণ্ডন করে বলেন, অনেকেই মনে করছেন, এ পদ্ধতিতে ছোট দলের গুরুত্ব বাড়বে, আসলে তার ‘এগজ্যাক্ট অপোজিট’ হবে। জোনায়েদ সাকী, নুরু- অর্থাৎ ছোট দলের মাঝারি নেতারা পার্মানেন্টলি ফাতনা হয়ে যাবেন এবং একা একা নির্বাচন করে যে জিতবেন সেই সম্ভাবনাও চিরতরে হারাবেন।

কারণ, যেহেতু একা একা নির্বাচনের (স্বতন্ত্র) কোনো রাস্তা নেই এই সিস্টেমে। এবং নির্বাচনে জয়ের পর পার্টি প্রধান তার দলে যাদের মনোনয়ন দেবেন- তারাই পার্লামেন্টে যাবেন। তার মানে একজন প্রার্থী অনেক বছর ধরে তার নির্বাচনী এলাকায় গিয়ে গ্রামের আপামর জনসাধারণের পাশে থেকে তাদের সহায়তা করেছিলেন একটাই স্বপ্ন নিয়ে- তিনি পার্লামেন্টে যাবেন। কিন্তু এর কোনো মূল্য থাকবে না। জনগণ পার্টিকে ভোট দিবে, ওই প্রার্থীকে নয়।

বছরের পর বছর ধরে জনপ্রতিনিধি হতে আশায় থাকা একজন রাজনৈতিক নেতাকে হয়তো পার্লামেন্টে পাঠাবে পার্টি প্রধান- জনগণ নয়। এমনকি পার্টি প্রধান পার্লামেন্টে পাঠাতে পারেন- পিএইচডি, প্রফেসর, সেলিব্রিটি আর ব্যবসায়ীদের; যারা কোনোদিন রাজনীতির ধারে কাছে ছিলেন না। সুতরাং যারাই এ পদ্ধতিতে নির্বাচন চান, তাদের একটু বুঝেশুনে চাওয়া উচিত।

জানতে চাইলে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, নির্বাচন একটি সংস্কৃতিরও বিষয়। দেশে প্রথম থেকে ওয়েস্ট-মিনস্টার পদ্ধতি অনুসরণ করা হচ্ছে। তারা এই পদ্ধতিতেই থাকার পক্ষে। যদি এই পদ্ধতির পরিবর্তন করতে হয়, তাহলে সেখানে জনগণের সম্মতি প্রয়োজন হবে। সামনের নির্বাচনে এটি পরিবর্তনের সুযোগ নেই। তিনি বলেন, যেসব সংস্কারের বিষয়ে ঐকমত্য হবে, সেগুলো বাস্তবায়ন করতে হবে। যে বিষয়গুলোয় ঐকমত্য হবে না বা ভিন্নমত থাকবে সেগুলো এখন সংস্কারের সুযোগ নেই।

এদিকে জনপরিসরে নতুন নির্বাচন পদ্ধতি চালু করার বিষয়ে পক্ষে-বিপক্ষে নানামুখী আলোচনা শুরু হলেও অন্তর্বর্তী সরকার এখনো এ বিষয়ে তাদের চিন্তার কথা জানায়নি। সংবিধান সংস্কার কমিশন এবং নির্বাচন ব্যবস্থা সংস্কার কমিশন সবে কাজ শুরু করেছে। তাদের প্রস্তাবে বিষয়টি আসবে কিনা, তা এখনো পরিষ্কার নয়।

আনুপাতিক হারে নির্বাচনের নামে জটিলতা তৈরি না করতে অন্তর্বর্তী সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবীর রিজভী আহমেদ। তিনি বলেন, আনুপাতিক হারে নির্বাচনের নামে জটিলতা তৈরি করা মানে কোনো বিশেষ মহল এবং স্বাধীনতাবিরোধীদের মদত দেয়া। তাছাড়া আনুপাতিক হারে নির্বাচনের জন্য আমাদের সমাজ এখনো প্রস্তুত নয়। এ পদ্ধতি জটিলতা তৈরি করবে। নেপালে এটা চালু করেছিল, এলোমেলো হয়ে গেছে।

টাইমলাইন: অন্তর্বর্তীকালীন সরকার

আরো পড়ুন

সাবস্ক্রাইব ও অনুসরণ করুন

তরুণ প্রজন্মকে মাদক থেকে দূরে রাখতে খেলাধুলার বিকল্প নেই: রাষ্ট্রপতি

তরুণ প্রজন্মকে মাদক থেকে দূরে রাখতে খেলাধুলার বিকল্প নেই: রাষ্ট্রপতি

‘রুমিন ফারহানা আপারা মৌসুমি রাজনীতি করেন’

‘রুমিন ফারহানা আপারা মৌসুমি রাজনীতি করেন’

কক্সবাজারের হোটেলে আবারও আগুন, রক্ষা পেলেন ৩ শতাধিক পর্যটক

কক্সবাজারের হোটেলে আবারও আগুন, রক্ষা পেলেন ৩ শতাধিক পর্যটক

নতুন কর্মসূচি ঘোষণা, দুই মন্ত্রীর পদত্যাগ চাইলেন নাহিদ ইসলাম

নতুন কর্মসূচি ঘোষণা, দুই মন্ত্রীর পদত্যাগ চাইলেন নাহিদ ইসলাম

সব খবর

সম্পাদক : শ্যামল দত্ত

প্রকাশক : সাবের হোসেন চৌধুরী

অনুসরণ করুন

BK Family App