×

শেষের পাতা

কী ছিল জামায়াত নিষিদ্ধে ট্রাইব্যুনালের রায়ে

Icon

এস এম মিজান

প্রকাশ: ৩১ জুলাই ২০২৪, ১২:০০ এএম

প্রিন্ট সংস্করণ

কী ছিল জামায়াত নিষিদ্ধে ট্রাইব্যুনালের রায়ে

ছবি: সংগৃহীত

জামায়াতে ইসলামীর সাবেক আমির (বর্তমানে প্রয়াত) গোলাম আযমের মানবতাবিরোধী অপরাধ মামলার রায়ের পর্যবেক্ষণে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল তার দলকে ‘সন্ত্রাসী সংগঠন’ হিসেবে উল্লেখ করে। পাশাপাশি গোলাম আযমকে যুদ্ধাপরাধীদের ‘মাস্টারমাইন্ড’ হিসেবেও উল্লেখ করা হয়। একইভাবে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের বিভিন্ন রায়ে একাত্তরে যুদ্ধাপরাধের ঘটনায় দল হিসেবে জামায়াতের সরাসরি সম্পৃক্ততার বিষয়টি উঠে আসে। গোলাম আযমের বিরুদ্ধে ঐতিহাসিক রায়ে রাজনৈতিক দল হিসেবে জামায়াতের বিচারের পথ উন্মুক্ত হয়।

এরপর বিভিন্ন মহল থেকে বিচারের দাবি জোরালো হয়। কিন্তু দীর্ঘ ১১ বছরেও এ-সংক্রান্ত আইন সংশোধন না হওয়ায় ঝুলে ছিল আনুষ্ঠানিক বিচারপ্রক্রিয়া। অবশেষে দীর্ঘ প্রতিক্ষার অবসান ঘটিয়ে সরকারের নির্বাহী সিদ্ধান্তে আজ বুধবার ঐতিহাসিকভাবে জামায়াত-শিবির নিষিদ্ধে প্রজ্ঞাপন জারি হচ্ছে। গতকাল মঙ্গলবার গণমাধ্যমকে বিষয়টি জানিয়েছেন আইনমন্ত্রী আনিসুলক হক।

জানা যায়, মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচারে গঠিত আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের বিভিন্ন রায়ে একাত্তরে যুদ্ধাপরাধের ঘটনায় দল হিসেবে জামায়াতের সরাসরি সম্পৃক্ততার বিষয়টি উঠে আসে। এর মধ্যে অন্তত দুটি রায়ে জামায়াতকে ‘ক্রিমিনাল’ দল হিসেবেও চিহ্নিত করা হয়। পরবর্তীতে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের রায়ের পর্যবেক্ষণ বিবেচনায় নিয়ে ২০১৩ সালের ১ আগস্ট উচ্চ আদালত এক রায়ে জামায়াতের নিবন্ধন বাতিল করে।

পরে ২০১৮ সালের ৮ ডিসেম্বর দলটির নিবন্ধন বাতিল করে প্রজ্ঞাপন জারি করে সরকার। হাইকোর্টের ওই রায়ের বিরুদ্ধে লিভ টু আপিল জামায়াত আপিল করলে ২০২৩ সালের ১৯ নভেম্বর সর্বোচ্চ আদালত হাইকোর্টের দেয়া রায় বহাল রাখে। ফলে দলটি নির্বাচনে অংশ নেয়ার অধিকার হারায়। তবে তাদের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে কোনো নিষেধাজ্ঞা ছিল না।

সবশেষ দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগেও রাজনীতির মাঠে তাদের সক্রিয় দেখা গেছে। এ অবস্থায় স্বাধীনতার ৫৩ বছরেও মানবতাবিরোধী সংগঠন হিসেবে জামায়াত, আলবদর, আলশামসের বিচার না হওয়ায় বিভিন্ন সময় হতাশা প্রকাশ করেছেন শহীদ পরিবার ও বিশিষ্টজনরা। তারা বলেছেন, বিচারের মাধ্যমে জামায়াত নিষিদ্ধ করার উদ্যোগ আরো আগে বাস্তবায়ন হলে মৌলবাদ, জঙ্গিবাদ ও ধর্মভিত্তিক রাজনীতির যে আস্ফালন এখন চলছে, তা দেখতে হতো না।

জানা যায়, ২০১৩ সালের ১৫ জুলাই একাত্তরে ভূমিকার জন্য জামায়াতে ইসলামীকে ‘ক্রিমিনাল দল’ আখ্যায়িত করে দেশের কোনো সংস্থার শীর্ষ পদে স্বাধীনতা বিরোধীদের থাকা উচিত নয় বলে মত দিয়েছিলেন যুদ্ধাপরাধের বিচারে গঠিত আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল। মুক্তিযুদ্ধকালে জামায়াতের আমির গোলাম আযমের বিরুদ্ধে যুদ্ধাপরাধের মামলার রায়ের পর্যবেক্ষণে এ মত দিয়েছে বিচারপতি এ টি এম ফজলে কবীরের নেতৃত্বাধীন ট্রাইব্যুনাল।

গোলাম আযমের আগে জামায়াত নেতা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদী, আব্দুল কাদের মোল্লা ও এ এইচ এম কামরুজ্জামান ও মাওলানা আব্দুস সোবহানের মামলার রায়েও একাত্তরে মানবতাবিরোধী অপরাধে জামায়াতের সংশ্লিষ্টতার বিষয়টি উঠে আসে। যুদ্ধকালীন বাংলাদেশে মানবতাবিরোধী অপরাধ সংঘটনের পরিকল্পনা, উসকানি ও সহযোগিতার দায়ে জামায়াতের গোলাম আযমকে টানা ৯০ বছর অথবা আমৃত্যু কারাদণ্ড দিয়ে রায়ের পর্যবেক্ষণে বলা হয়, একাত্তরে পাকিস্তানি বাহিনীর সহযোগী হয়ে বাঙালি হত্যাকাণ্ডে রাজাকার, আল বদর, আল শামসের মতো যেসব বাহিনী জড়িত ছিল, সেসব বাহিনীর ওপর গোলাম আযমের নিয়ন্ত্রণ প্রমাণিত হয়েছে ট্রাইব্যুনালে।

ট্রাইব্যুনাল বলেছে, সাধারণ জ্ঞান ও দালিলিক প্রমাণাদি থেকে এটা স্পষ্ট যে, জামায়াত ও এর অধীনস্ত সংগঠনের প্রায় সবাই সক্রিয়ভাবে বাংলাদেশের বিরোধিতা করেছেন। গোলাম আযমের নেতৃত্বে জামায়াতে ইসলামী একটি ক্রিমিনাল দল হিসেবে উদ্দেশ্যমূলকভাবে কাজ করেছে, বিশেষ করে বাংলাদেশের স্বাধীনতাযুদ্ধকালে। ১৯৪৭ সালে পাকিস্তানের স্বাধীনতার সময় গোলাম আযমের ‘গুরু’ আবুল আলা মওদুদী তার বিরোধিতা করেছিলেন। ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের স্বাধীনতার সময় সে ধরনের ভূমিকাই ছিল গোলাম আযমের।

জামায়াত দুই সময়েই সাধারণ মানুষের মন বুঝতে ব্যর্থ হয়েছিল মন্তব্য করে ট্রাইব্যুনাল দলটির দূরদৃষ্টির অভাবের পেছনে উগ্র মৌলবাদী চেতনাকেই চিহ্নিত করেছে। রায়ের পর্যবেক্ষণে বলা হয়, স্বাধীনতার ৪২ বছর পরও স্বাধীনতাবিরোধী কিছু মানুষ জামায়াতের হাল ধরে আছেন। যার ফলে জামায়াতের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট নতুন প্রজন্ম স্বাধীনতাবিরোধী চেতনা ও সা¤প্রদায়িক অনুভূতির মানসিকতায় বেড়ে উঠছে, যা দেশের জন্য বড় ধরনের উদ্বেগের বিষয়। ট্রাইব্যুনাল বলেছে, একাত্তরের স্বাধীনতা বিরোধীরা শহীদদের প্রতি সম্মান দেখিয়ে কিংবা অনুশোচনা প্রকাশ করে মুক্তিযুদ্ধের প্রতি দৃষ্টিভঙ্গি বদলেছেন বলে কোনো প্রমাণ জাতির সামনে নেই। রায়ে বলা হয়, একটি গণতান্ত্রিক ও অসাম্প্রদায়িক দেশ গড়তে সরকারের নির্বাহী বিভাগ, সরকারি বেসরকারি সংগঠনসহ সামাজিক ও রাজনৈতিক দলের কর্ণধার হিসেবে এ ধরনের স্বাধীনতা বিরোধীরা থাকা উচিত নয়। এ ধরনের গুরুত্বপূর্ণ পদে স্বাধীনতা বিরোধীরা যাতে না আসতে পারে, সেজন্য সরকার প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে পারে বলে রায়ে উল্লেখ করা হয়।

প্রসঙ্গত, গত সোমবার প্রধানমন্ত্রীর সরকারি বাসভবন গণভবনে কেন্দ্রীয় ১৪ দলের বৈঠকে জামায়াত-শিবিরকে নিষিদ্ধ করার সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। বৈঠকে সভাপতিত্ব করেন আওয়ামী লীগ সভাপতি ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। পরে বৈঠকের সিদ্ধান্ত সাংবাদিকদের জানান আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের। এর পরিপ্রেক্ষিতে গতকাল মঙ্গলবার আইনমন্ত্রী আনিসুল হক সাংবাদিকদের জানান, জামায়াত-শিবিরকে নিষিদ্ধ করতে বুধবারের (আজ) মধ্যে নির্বাহী আদেশ জারি করা হতে পারে।

একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধে সরাসরি বাংলাদেশের স্বাধীনতা বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছিল জামায়াতে ইসলামী। আর শিবিরের আগের নাম ছিল পাকিস্তান ছাত্রসংঘ। মুক্তিযুদ্ধে বাংলাদেশের বিজয়ের পূর্বলগ্নে বুদ্ধিজীবীদের বেছে বেছে হত্যার জন্য এই সংগঠনটির নেতাকর্মীদের সরাসরি দায়ী করা হয়। মুক্তিযুদ্ধে যুদ্ধাপরাধের অভিযোগে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের মামলায় দলটির সাবেক বেশ কয়েকজন শীর্ষ নেতার সাজা হয়েছে। অনেকের মৃত্যুদণ্ডও কার্যকর হয়েছে। পাকিস্তানকে প্রত্যক্ষ সহযোগিতার কারণে মুক্তিযুদ্ধ-পরবর্তী সময়ে জামায়াতে ইসলামীকে স্বাধীন বাংলাদেশে নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয়।

তবে পঁচাত্তরে সপরিবারে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে হত্যা পরবর্তী সময়ে রাজনৈতিক নানা পট পরিবর্তনের পর দেশের রাজনীতিতে আবারো সক্রিয় হয় জামায়াত। ২০০১ সালে বিএনপি নেতৃত্বাধীন চারদলীয় জোট সরকার গঠন করলে দলটির কয়েকজন নেতা মন্ত্রিসভায়ও স্থান পান। যা নিয়ে সেই সময় ব্যাপক সমালোচনা হয়েছিল।

সরকারি চাকরিতে কোটা সংস্কারের দাবিতে শিক্ষার্থীদের আন্দোলনে যে পর্যায়ে ব্যাপক সহিংসতা ছড়িয়ে পড়ে এর জন্য সরকার জামায়াত-শিবিরকেই দায়ী করছে। এ সহিংসতায় দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে অনেক হতাহত হন। সরকারি হিসাবে নিহতের সংখ্যা ১৫০ আর আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীদের দাবি, দেশজুড়ে সহিংসতায় নিহত হয়েছেন ২৬৬ জন। সরকারের দাবি, শিক্ষার্থীদের শান্তিপূর্ণ আন্দোলনে বিএনপি ও জামায়াত-শিবিরের নেতাকর্মীরা ছদ্মবেশে প্রবেশ করে সহিংসতা উসকে দেয়। ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগ করা হয় রাষ্ট্রীয় সম্প্রচার মাধ্যম বিটিভি, বনানীর সেতুভবন, মহাখালীর দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ভবন, মেট্রোরেল স্টেশনসহ বিভিন্ন সরকারি স্থাপনায়।

সাবস্ক্রাইব ও অনুসরণ করুন

সেনাবাহিনীর ৭ ইউনিটকে জাতীয় পতাকা দিলেন প্রধানমন্ত্রী

সেনাবাহিনীর ৭ ইউনিটকে জাতীয় পতাকা দিলেন প্রধানমন্ত্রী

ফ্রান্সজুড়ে সংঘর্ষ-লুটপাট-অগ্নিসংযোগ চলছে, সহস্রাধিক গ্রেপ্তার

ফ্রান্সজুড়ে সংঘর্ষ-লুটপাট-অগ্নিসংযোগ চলছে, সহস্রাধিক গ্রেপ্তার

পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ে ইন্টার্নশিপের সুযোগ

পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ে ইন্টার্নশিপের সুযোগ

ভারতে মন্দিরের কাছে ট্রাকচাপায় ১২ ভক্ত নিহত

ভারতে মন্দিরের কাছে ট্রাকচাপায় ১২ ভক্ত নিহত

সব খবর

সম্পাদক : শ্যামল দত্ত

প্রকাশক : সাবের হোসেন চৌধুরী

অনুসরণ করুন

BK Family App