×

বিশ্ববাণিজ্য

বাংলাদেশের সামনে ভারতের প্রতিযোগিতা

Icon

কাগজ ডেস্ক

প্রকাশ: ২২ অক্টোবর ২০২৬, ১০:২২ এএম

বাংলাদেশের সামনে ভারতের প্রতিযোগিতা

ছবি : সংগৃহীত

ইউরোপের পোশাক বাজারে আগামী জানুয়ারি থেকে নতুন প্রতিযোগিতার মুখে পড়তে যাচ্ছে বাংলাদেশ। এতদিন শুল্কমুক্ত সুবিধার কারণে ইউরোপের বাজারে বাংলাদেশের তৈরি পোশাকের অবস্থান শক্তিশালী ছিল। তবে ভারত-ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) মুক্তবাণিজ্য চুক্তি কার্যকর হলে একই সুবিধায় ইউরোপে পণ্য রপ্তানির সুযোগ পাবে ভারতও। এরই মধ্যে ইউরোপের বাজারে নিজেদের পোশাক রপ্তানি দ্বিগুণ করার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে দেশটি।

অর্থনীতি বিশ্লেষকদের মতে, ইউরোপের বাজারে নিজেদের অবস্থান ধরে রাখাই হবে বাংলাদেশের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ। বিশেষ করে পণ্য উৎপাদন ও ক্রেতার কাছে পৌঁছানোর সময়সীমা বা ‘লিড টাইম’ বাংলাদেশের প্রতিযোগিতার সক্ষমতাকে প্রভাবিত করতে পারে। কাঁচামাল আমদানির ওপর নির্ভরশীলতার কারণে এ ক্ষেত্রে ভারতের তুলনায় পিছিয়ে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।

ইউরোপের বাজারে বাংলাদেশের অবস্থান

ইউরোপের বাজারে পণ্য রপ্তানিতে ২৭ শতাংশ অংশ নিয়ে শীর্ষে রয়েছে চীন। শুল্কমুক্ত সুবিধা ছাড়াই উচ্চমূল্যের সিনথেটিক পণ্য সরবরাহের মাধ্যমে বাজারটিতে নিজেদের অবস্থান ধরে রেখেছে দেশটি। দ্বিতীয় অবস্থানে থাকা বাংলাদেশের বাজার অংশ সাড়ে ২২ শতাংশ। সাধারণ পোশাকের বাজারে বাংলাদেশ এখনো ইউরোপের সবচেয়ে বড় সরবরাহকারী।

তালিকায় তৃতীয় স্থানে রয়েছে তুরস্ক, যাদের বাজার অংশ সাড়ে ১০ শতাংশ। প্রায় ৫ শতাংশ অংশ নিয়ে চতুর্থ অবস্থানে আছে ভারত। অর্থাৎ, ইউরোপের বাজারে মোট পণ্য রপ্তানির হিসাবে বাংলাদেশের অবস্থান ভারতের চেয়ে উল্লেখযোগ্যভাবে এগিয়ে।

তবে আগামী জানুয়ারি থেকে ভারত-ইইউ মুক্তবাণিজ্য চুক্তি কার্যকর হলে প্রতিযোগিতার পরিস্থিতি বদলে যেতে পারে। চুক্তির আওতায় ভারতীয় পণ্য শূন্য শুল্কে ইউরোপের বাজারে প্রবেশের সুযোগ পাবে। এতে বাংলাদেশের বিদ্যমান বাজার অংশ ও রপ্তানি প্রবৃদ্ধি ধরে রাখা নিয়ে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।

গত বছর শুল্কমুক্ত সুবিধায় বাংলাদেশ ইউরোপের বাজারে ২ লাখ ৬৮ হাজার ৭৫০ কোটি টাকার পণ্য রপ্তানি করেছে। নতুন পরিস্থিতিতে এই রপ্তানির পরিমাণ ও বাজার অংশ ধরে রাখা বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠতে পারে।

উৎপাদন খরচ ও সময় নিয়ে উদ্বেগ

চট্টগ্রামভিত্তিক পোশাকশিল্পের অন্যতম শীর্ষ প্রতিষ্ঠান এশিয়ান গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক এম এ সালাম মনে করেন, শুল্কের ক্ষেত্রে সমতা তৈরি হলে বাংলাদেশের রপ্তানি কমার আশঙ্কা রয়েছে। তবে ক্ষতির পরিমাণ নির্ভর করবে সরকারের নীতিসহায়তা এবং পোশাকশিল্পের প্রস্তুতির ওপর।

তিনি বলেন, প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে পোশাকশিল্পে শ্রমিকদের দক্ষতা বাড়ানোর পাশাপাশি প্রযুক্তিনির্ভর উৎপাদনে গুরুত্ব দিতে হবে। তাঁর মতে, কম মজুরির শ্রমের ওপর নির্ভর করে দীর্ঘ মেয়াদে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকা কঠিন হবে।

এম এ সালাম ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গে মুক্তবাণিজ্য চুক্তির আলোচনা দ্রুত শুরুর পরামর্শ দিয়েছেন। একই সঙ্গে স্বল্পোন্নত দেশের (এলডিসি) তালিকা থেকে বাংলাদেশের উত্তরণ তিন বছর পিছিয়ে দেওয়ার বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া এবং এ সময়ের জন্য বাস্তবসম্মত কর্মপরিকল্পনা তৈরির ওপর জোর দিয়েছেন তিনি।

সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, বাংলাদেশের পোশাকশিল্পের বড় দুর্বলতা হচ্ছে দীর্ঘ লিড টাইম। দেশে ব্যবহৃত ওভেন কাপড় ও সিনথেটিক ফাইবারের প্রায় ৭০ শতাংশ কাঁচামাল চীন বা ভারত থেকে আমদানি করতে হয়। ফলে অর্ডার পাওয়ার পর পোশাক তৈরি করে ইউরোপের ক্রেতার কাছে পৌঁছাতে গড়ে ৬০ থেকে ৮০ দিন সময় লাগে।

অন্যদিকে, তুলা থেকে সুতা ও কাপড় তৈরি পর্যন্ত সমন্বিত উৎপাদনব্যবস্থা থাকায় ভারত তুলনামূলক কম সময়ে পণ্য সরবরাহ করতে পারে। সংশ্লিষ্টদের হিসাবে, দেশটি ৩০ থেকে ৪০ দিনের মধ্যে ইউরোপের ক্রেতার কাছে পণ্য পৌঁছে দিতে সক্ষম। ফলে একই শুল্কসুবিধা পেলে দ্রুত সরবরাহের ক্ষেত্রে ভারত বাড়তি সুবিধা পেতে পারে।

পরিবহনব্যবস্থায়ও পিছিয়ে বাংলাদেশ

পণ্য পরিবহনের ক্ষেত্রেও বাংলাদেশের কিছু সীমাবদ্ধতা রয়েছে। চট্টগ্রাম বন্দর থেকে বাংলাদেশের পোশাকবাহী জাহাজ সাধারণত সিঙ্গাপুর বা কলম্বো বন্দরে যায়। সেখান থেকে বড় জাহাজে পণ্য ইউরোপে পাঠানো হয়। এতে পরিবহনে অতিরিক্ত সময় লাগে।

অন্যদিকে, ভারতের বন্দর ও সরবরাহব্যবস্থার সুবিধা কাজে লাগিয়ে দেশটি তুলনামূলক কম সময়ে ইউরোপে পণ্য পাঠাতে পারে। ফলে লজিস্টিকস বা সরবরাহ ব্যয়ের পাশাপাশি সময়ের ব্যবধানও বাংলাদেশের প্রতিযোগিতার সক্ষমতায় প্রভাব ফেলতে পারে।

এ ছাড়া দেশে গ্যাস ও বিদ্যুতের উচ্চমূল্য, অনিয়মিত সরবরাহ, আমলাতান্ত্রিক জটিলতা এবং সম্প্রতি পোশাকশিল্পে সুতা আমদানির ক্ষেত্রে বন্ড সুবিধা প্রত্যাহারের বিষয়টিও উদ্বেগ বাড়িয়েছে। সংশ্লিষ্টদের মতে, এসব কারণে উৎপাদন ও সরবরাহ ব্যয় বাড়লে ইউরোপের বাজারে বাংলাদেশের পণ্যের প্রতিযোগিতামূলক সক্ষমতা কমতে পারে।

এতদিন শুল্কসুবিধার কারণে বাংলাদেশের পোশাক ইউরোপের বাজারে তুলনামূলক সুবিধাজনক অবস্থানে ছিল। কিন্তু ভারত একই ধরনের সুবিধা পেলে পণ্য সরবরাহে সময় ও ব্যয়ের পার্থক্য আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।

ভারতের রপ্তানি দ্বিগুণ করার লক্ষ্য

মুক্তবাণিজ্য চুক্তি কার্যকরের পর ২০২৭ সালে ইউরোপের বাজারে ৮ বিলিয়ন ডলারের পণ্য রপ্তানির লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে ভারত। এ লক্ষ্য অর্জিত হলে ইউরোপের বাজারে দেশটির অংশ ৫ শতাংশ থেকে বেড়ে ১২ শতাংশে পৌঁছাতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

বাংলাদেশ, কম্বোডিয়া, পাকিস্তান, ভিয়েতনাম ও তুরস্কের মতো দেশগুলো ইউরোপের বাজারে শুল্কসুবিধা পেয়ে থাকে। ভারত একই সুবিধা পেলে এসব দেশের সঙ্গে সরাসরি প্রতিযোগিতা বাড়বে। বিশ্লেষকদের মতে, উৎপাদন ও সরবরাহব্যবস্থার সীমাবদ্ধতার কারণে বাংলাদেশ এ প্রতিযোগিতায় বাড়তি চাপে পড়তে পারে।

গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) গবেষণা পরিচালক খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম মনে করেন, জানুয়ারি থেকে বাংলাদেশকে একাধিক দিক থেকে চাপ সামলাতে হতে পারে। যুক্তরাষ্ট্রে উচ্চ শুল্কের কারণে চীনের পণ্য ইউরোপের বাজারে আরও প্রতিযোগিতামূলক হয়ে উঠতে পারে। পাশাপাশি ভিয়েতনামের শুল্কসুবিধা এবং ভারতের নতুন করে একই সুবিধা পাওয়ার বিষয়টি বাংলাদেশের জন্য প্রতিযোগিতা বাড়াবে।

তাঁর মতে, এ পরিস্থিতিতে মূল্য প্রতিযোগিতায় বাংলাদেশের ওপর চাপ তৈরি হবে। চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্যচুক্তির আলোচনা এগিয়ে নেওয়ার পাশাপাশি বিকল্প বাজারের সঙ্গেও এ ধরনের চুক্তির উদ্যোগ নিতে হবে। একই সঙ্গে রপ্তানি পণ্যে বৈচিত্র্য আনা এবং এলডিসি উত্তরণ পর্যন্ত ঝুঁকি নিরূপণ ও বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের মধ্যে সমন্বয়ের জন্য বিশেষায়িত কারিগরি দল গঠনের পরামর্শ দিয়েছেন তিনি।

২০২৯ সালের পর রপ্তানি কমার আশঙ্কা

বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থা (ডব্লিউটিও) ও জাতিসংঘের বাণিজ্য ও উন্নয়নবিষয়ক সংস্থা আঙ্কটাডের যৌথ গবেষণার বরাত দিয়ে বলা হচ্ছে, ২০২৯ সালের পর ইউরোপে কোনো বাণিজ্যসুবিধা না থাকলে বাংলাদেশের পোশাক রপ্তানি ২০ থেকে ৩০ শতাংশ পর্যন্ত কমে যেতে পারে। এতে বছরে প্রায় ৫ থেকে ৭ বিলিয়ন ডলারের আর্থিক ক্ষতির আশঙ্কা রয়েছে।

বিশেষ করে ওভেন পোশাকের ক্ষেত্রে ঝুঁকি বেশি বলে মনে করা হচ্ছে। শার্ট, নারীদের সুতির পোশাক এবং মিশ্র কাপড়ের জ্যাকেটের অর্ডার ভারতীয় উৎপাদকদের কাছে চলে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। পাশাপাশি ভ্যালু-অ্যাডেড ফ্যাশন ও আধুনিক স্পোর্টসওয়্যার খাতেও বাংলাদেশের প্রতিযোগিতা বাড়তে পারে।

তবে পোশাক রপ্তানিতে দীর্ঘ অভিজ্ঞতা ও উৎপাদন সক্ষমতার কারণে বাংলাদেশের কিছু সুবিধাও রয়েছে। প্রতিদিন বিপুল পরিমাণ সাধারণ টি-শার্ট ও বেসিক ওভেন পোশাক উৎপাদনের জন্য দেশে বড় অবকাঠামো এবং দক্ষ ব্যবস্থাপনা গড়ে উঠেছে। পরিবেশবান্ধব পোশাক কারখানার ক্ষেত্রেও বাংলাদেশের উল্লেখযোগ্য অবস্থান রয়েছে। বিশ্বের শীর্ষ ১০০ পরিবেশবান্ধব বা লিড-সার্টিফায়েড কারখানার অর্ধেকের বেশি বাংলাদেশে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে উল্লেখ করা হয়েছে।

শ্রম ব্যয়ের ক্ষেত্রেও বাংলাদেশ কিছুটা সুবিধায় রয়েছে। পোশাকশ্রমিকদের মাসিক মজুরি ভারতে বাংলাদেশের তুলনায় প্রায় ২০ থেকে ৪০ ডলার বেশি বলে সংশ্লিষ্টদের দাবি। তবে শুধু কম মজুরির ওপর নির্ভর করে দীর্ঘ মেয়াদে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকা সম্ভব হবে না বলে মনে করছেন শিল্পসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা।

তাঁদের মতে, ইউরোপের বাজারে বাংলাদেশের রপ্তানি হঠাৎ করেই ধসে পড়বে—এমন নয়। তবে প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি না থাকলে ধীরে ধীরে বাজার অংশ কমে যাওয়ার ঝুঁকি রয়েছে।

প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে চার পদক্ষেপ

ইউরোপের বাজারে নিজেদের অবস্থান ধরে রাখতে পোশাকশিল্পসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা চারটি বিষয়ে গুরুত্ব দেওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন।

প্রথমত, উৎপাদন ও সরবরাহের সময় কমিয়ে লিড টাইম ৩০ থেকে ৪০ দিনের মধ্যে নিয়ে আসতে হবে। দ্বিতীয়ত, চট্টগ্রাম বন্দর ও কাস্টমসের জটিলতা কমিয়ে পণ্য পরিবহনের সময় ও লজিস্টিকস ব্যয় হ্রাস করতে হবে।

তৃতীয়ত, উন্নত প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়িয়ে উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি করতে হবে, যাতে কম খরচে দ্রুত ও মানসম্মত পণ্য তৈরি করা যায়। চতুর্থত, সাধারণ সুতির টি-শার্টের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে স্পোর্টসওয়্যার, টেকনিক্যাল টেক্সটাইল এবং উচ্চমূল্যের ভ্যালু-অ্যাডেড পোশাক উৎপাদনে গুরুত্ব দিতে হবে।

বিশ্লেষকদের মতে, শুল্কসুবিধার পাশাপাশি দ্রুত সরবরাহ, উৎপাদনশীলতা, পণ্যের বৈচিত্র্য ও নীতিসহায়তা নিশ্চিত করতে পারলেই ইউরোপের বাজারে বাংলাদেশের অবস্থান ধরে রাখা সহজ হবে।

সাবস্ক্রাইব ও অনুসরণ করুন

বাস্তুচ্যুত হতে পারে বাংলাদেশের ১ কোটি ৩৩ লাখ মানুষ

বাস্তুচ্যুত হতে পারে বাংলাদেশের ১ কোটি ৩৩ লাখ মানুষ

ডিআইজির ভাড়া দেওয়া বাড়িতে মাসে ২২টি ডিজে পার্টি হতো

ডিআইজির ভাড়া দেওয়া বাড়িতে মাসে ২২টি ডিজে পার্টি হতো

মিমির বিয়ের জল্পনায় মজেছে টালিপাড়া

মিমির বিয়ের জল্পনায় মজেছে টালিপাড়া

সাইবার সিকিউরিটিসহ অন্যান্য আইন সংশোধনের চেষ্টা করছি

তথ্যমন্ত্রী সাইবার সিকিউরিটিসহ অন্যান্য আইন সংশোধনের চেষ্টা করছি

সব খবর

সম্পাদক : শ্যামল দত্ত

প্রকাশক : সাবের হোসেন চৌধুরী

অনুসরণ করুন

BK Family App