জ্বালানি সংকটে উৎপাদন কমেছে পোশাকখাতে, বাজার হারানোর শঙ্কা
কাগজ ডেস্ক
প্রকাশ: ২২ এপ্রিল ২০২৬, ০৩:০৬ পিএম
ছবি : সংগৃহীত
জ্বালানি সংকটের কারণে দেশের তৈরি পোশাক শিল্পে উৎপাদন উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে। এতে করে আন্তর্জাতিক বাজার হারানোর শঙ্কা বাড়ছে বলে জানিয়েছেন খাতসংশ্লিষ্টরা।
সাভারের আশুলিয়া এলাকার একটি পোশাক কারখানার পরিচালক সঞ্জয় কুমার বলেন, দিনে প্রায় দশ ঘণ্টা কারখানা চালু থাকলেও এর মধ্যে পাঁচ থেকে সাত ঘণ্টা বিদ্যুৎ থাকে না। ফলে বাধ্য হয়ে জেনারেটরের ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে। তিনি জানান, প্রায় এক দশক ধরে যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের বাজারে পোশাক রপ্তানি করছেন। রপ্তানি বাজার ধরে রাখতে পণ্যের মান বজায় রাখার পাশাপাশি নির্ধারিত সময়ে সরবরাহ নিশ্চিত করাও জরুরি। তাই বিদ্যুৎ না থাকলেও জেনারেটরের মাধ্যমে উৎপাদন চালিয়ে যেতে হয়।
তবে দীর্ঘ সময় জেনারেটর চালাতে গিয়ে জ্বালানি সংকটে পড়তে হচ্ছে। ডিজেল সংগ্রহের জন্য এক পাম্প থেকে আরেক পাম্পে ঘুরতে হচ্ছে, লাইনে দাঁড়িয়ে ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করতে হচ্ছে। তারপরও অনেক সময় পর্যাপ্ত ডিজেল পাওয়া যায় না। ফলে কাজ বন্ধ রাখতে হচ্ছে, উৎপাদনে ব্যাঘাত ঘটছে, বলেন আরেক গার্মেন্টস ব্যবসায়ী সাঈদ হাসান।
ব্যবসায়ীরা বলছেন, ইরান যুদ্ধসহ বৈশ্বিক পরিস্থিতির প্রভাবে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সংকট তীব্র হওয়ায় রপ্তানিমুখী তৈরি পোশাক কারখানাগুলোর উৎপাদন সক্ষমতা ২৫ থেকে ৩০ শতাংশ পর্যন্ত কমে গেছে।
বাংলাদেশ পোশাক প্রস্তুতকারক ও রপ্তানিকারক সমিতির (বিজিএমইএ) সভাপতি মাহমুদ হাসান খান বলেন, এনার্জি সংকটের কারণে সামগ্রিকভাবে উৎপাদন কমে গেছে।
যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশের তৈরি পোশাকের বৃহত্তম রপ্তানি বাজার হলেও সম্প্রতি শুল্ক বৃদ্ধি ও অন্যান্য কারণে রপ্তানি কমছে। রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) তথ্য অনুযায়ী, গত মার্চে প্রায় ২৮১ কোটি ডলারের পোশাক রপ্তানি হয়েছে, যা আগের বছরের তুলনায় প্রায় ১৯ শতাংশ কম। চলতি অর্থবছরের প্রথম নয় মাসে রপ্তানি কমেছে ৫ দশমিক ৫১ শতাংশ। জ্বালানি সংকটের কারণে উৎপাদন কমে যাওয়ায় আগামী মাসগুলোতে রপ্তানি আরো কমতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা।
গত কয়েক বছর ধরেই বিদ্যুৎখাত নানা সংকটে রয়েছে। করোনা মহামারির পর ডলার সংকটের কারণে তেল, গ্যাস ও কয়লা আমদানি কমে যাওয়ায় অনেক বিদ্যুৎকেন্দ্র বন্ধ হয়ে গেছে। বকেয়া পরিশোধ না হওয়ায় বেসরকারি বিদ্যুৎ সরবরাহও কমেছে। এর মধ্যে ইরান যুদ্ধের প্রভাবে পরিস্থিতি আরো জটিল হয়েছে।
মাহমুদ হাসান বলেন, আগে দিনে এক-দুই ঘণ্টা লোডশেডিং হতো, এখন সেটা দ্বিগুণেরও বেশি। বিদ্যুৎ না থাকায় জেনারেটর ব্যবহার বাড়ায় উৎপাদন খরচও দ্বিগুণ হয়েছে। আগে বিদ্যুৎ-ডিজেল মিলিয়ে মাসে ১৫-১৬ লাখ টাকা খরচ হতো, এখন তা প্রায় ৩০ লাখ টাকায় দাঁড়িয়েছে।
আরো পড়ুন : ধান-চালের সরকারি দাম নির্ধারণ
তবে রপ্তানি প্রক্রিয়াকরণ অঞ্চল (ইপিজেড)-এর কারখানাগুলো তুলনামূলকভাবে কম সমস্যায় রয়েছে। গাজীপুর বা আশুলিয়ার তুলনায় ইপিজেডে পরিস্থিতি ভালো, বলেন ডেনিম এক্সপার্ট লিমিটেডের অতিরিক্ত ব্যবস্থাপনা পরিচালক মহিউদ্দিন রুবেল।
বাংলাদেশে প্রায় আড়াই হাজার রপ্তানিমুখী পোশাক কারখানার বেশিরভাগই ইপিজেডের বাইরে হওয়ায় তারা এই সুবিধা পাচ্ছে না। এর মধ্যে ডিজেলের দাম লিটারপ্রতি ১৫ টাকা বাড়ায় উৎপাদন খরচ আরো বেড়েছে। জ্বালানি খরচের পাশাপাশি কাঁচামাল ও পরিবহন ব্যয়ও বেড়েছে। তুলার দাম প্রতি কেজিতে প্রায় ৬০ সেন্ট বেড়েছে, পলিস্টার ও নাইলনের মতো পণ্যও দামে বৃদ্ধি পেয়েছে।
জ্বালানি তেলের দাম বাড়ায় পরিবহন ব্যয়ও বেড়েছে। ফলে অনেক সময় নির্ধারিত সময়ে পণ্য পাঠানো সম্ভব হচ্ছে না। এতে ক্রেতারা অসন্তুষ্ট হচ্ছেন এবং দ্রুত সরবরাহের জন্য বিমানপথে পাঠানোর চাপ দিচ্ছেন। তবে বাড়তি খরচ বহন করতে রাজি নন অনেক বিদেশি ক্রেতা। অর্ডার নেওয়ার পর খরচ বেড়েছে বলে তারা বাড়তি দাম দিতে চান না।
ব্যবসায়ীরা বলছেন, এতে তাদের লাভ কমে যাচ্ছে, এমনকি শ্রমিকদের বেতন দেওয়াও কঠিন হয়ে পড়ছে। এভাবে চললে কারখানা চালু রাখা কঠিন হয়ে যাবে বলে জানান ব্যবসায়ীরা। নতুন অর্ডার কমে যাওয়ায় আগামী এক থেকে দেড় মাসের মধ্যে পরিস্থিতির আরো অবনতি হতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন তারা। এতে ঈদের সময় অনেক কারখানা শ্রমিকদের বেতন দিতে সমস্যায় পড়তে পারে।
বর্তমানে পোশাক রপ্তানিতে বিশ্বে বাংলাদেশের অবস্থান দ্বিতীয় হলেও বাজারে প্রতিযোগিতা বাড়ছে। ফলে উৎপাদন খরচ বাড়লে ক্রেতারা বিকল্প বাজারে চলে যেতে পারেন বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। সময়মতো পণ্য সরবরাহ করতে না পারলে এবং খরচ বেশি হলে ক্রেতারা অন্য দেশে চলে যাবে।
