দ্য ইনডিপেনডেন্টের প্রতিবেদন
ইরান যুদ্ধের প্রভাবে তেল-শূন্য হওয়ার ঝুঁকিতে বাংলাদেশ
কাগজ ডেস্ক
প্রকাশ: ০২ এপ্রিল ২০২৬, ০২:০০ পিএম
ছবি : সংগৃহীত
ইতোমধ্যে ৩৩ দিনে গড়িয়েছে ইরানের বিরুদ্ধে ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের চলমান যুদ্ধ। এর প্রভাবে মধ্যপ্রাচ্যে নতুন করে গভীর অস্থিরতা সৃষ্টি করেছে। বৃহস্পতিবার (২ এপ্রিল) পর্যন্ত দীর্ঘায়িত এই সংঘাত বিশ্বব্যাপী জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থায় বড় ধরনের ধাক্কা দিয়েছে। তেলের দাম বেড়ে যাওয়ায় বৈশ্বিক অর্থনীতিতে চাপ বাড়ছে, আর এই পরিস্থিতি মোকাবিলায় বিভিন্ন দেশ জরুরি পদক্ষেপ নিতে শুরু করেছে।
এই সংকটের প্রভাব থেকে বাদ যায়নি বাংলাদেশও। দ্য ইনডিপেনডেন্টের এক প্রতিবেদনে আশঙ্কা প্রকাশ করা হয়েছে, ইরান যুদ্ধের কারণে জ্বালানি সরবরাহ ব্যাহত হলে বাংলাদেশ তীব্র তেল সংকটের মুখে পড়তে পারে।
বুধবার (১ এপ্রিল) প্রকাশিত প্রতিবেদনে এ তথ্য উঠে আসে। প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে যুদ্ধ শুরুর পর হরমুজ প্রণালি বন্ধ হওয়ার আশঙ্কায় আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম দ্রুত বেড়েছে। এশিয়ার প্রায় ৯০ শতাংশ অপরিশোধিত তেল এই গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ দিয়ে পরিবাহিত হয়।
যুদ্ধের কারণে মধ্যপ্রাচ্য থেকে তেল সরবরাহ ব্যাহত হওয়ায় আমদানিনির্ভর বাংলাদেশের জ্বালানি পরিস্থিতি ক্রমেই চাপের মুখে পড়ছে।
এ বিষয়ে ইনস্টিটিউট ফর এনার্জি ইকোনমিক্স এন্ড ফিনান্সিয়াল এনালাইসিসের প্রধান জ্বালানি বিশ্লেষক শফিকুল আলম বলেন, আমদানিকৃত জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর উচ্চ নির্ভরশীলতার কারণে বাংলাদেশ এশিয়ার সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত দেশগুলোর একটি হতে পারে।
ইতোমধ্যে জ্বালানি সংকটের প্রভাবে মোটরসাইকেল ও অন্যান্য যানবাহনের চালকদের সীমিত জ্বালানি পেতে দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করতে হচ্ছে। অনেক ফিলিং স্টেশন সরবরাহ শেষ হয়ে যাওয়ায় বন্ধও করে দেওয়া হয়েছে।
রাজধানীর বাইরের এলাকাগুলোতে পরিস্থিতি আরো নাজুক। সেখানে অল্প পরিমাণ জ্বালানি প্লাস্টিকের বোতলে বেশি দামে অনানুষ্ঠানিকভাবে বিক্রি হচ্ছে।
জ্বালানি ফুরিয়ে যাওয়ার আশঙ্কায় মানুষের মধ্যে উদ্বেগ বাড়ছে। এর ফলে দৈনন্দিন জীবনযাত্রায় চাপ তৈরি হয়েছে এবং রাজধানীর ব্যস্ত সড়কগুলোতেও যানবাহনের সংখ্যা কমে এসেছে।
সরকারি তথ্য অনুযায়ী, দেশের পূর্বাঞ্চলের একমাত্র শোধনাগার ইস্টার্ন রিফাইনারি লিমিটেডে অপরিশোধিত তেলের মজুত খুবই সীমিত, যা দিয়ে মাত্র দুই সপ্তাহের চাহিদা পূরণ সম্ভব। একইভাবে ডিজেল ও অকটেনের মজুতও দ্রুত কমে আসছে। মার্চের শুরুতে ডিজেলের মজুত ছিল মাত্র ৯ দিনের চাহিদা মেটানোর মতো।
এই পরিস্থিতিতে সরকার বিকল্প উৎস থেকে জ্বালানি আমদানির চেষ্টা করছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সিঙ্গাপুর, মালয়েশিয়া, নাইজেরিয়া এবং আজারবাইজানসহ বিভিন্ন দেশের সঙ্গে যোগাযোগ করা হচ্ছে। পাশাপাশি রাশিয়া থেকে ডিজেল আমদানির জন্য যুক্তরাষ্ট্রের কাছে নিষেধাজ্ঞা শিথিলের অনুরোধও জানানো হয়েছে।
তবে সরকারের দাবি, দেশে কোনো জ্বালানি সংকট নেই। যদিও বাস্তব পরিস্থিতি ভিন্ন চিত্র তুলে ধরছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। বৃহস্পতিবার (২ এপ্রিল) সচিবালয়ে আয়োজিত এক বিশেষ সংবাদ সম্মেলনের মাধ্যমে সরকারের জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগ দেশবাসীকে আশ্বস্ত করে জানিয়েছে, চলতি এপ্রিল মাসে বাংলাদেশে জ্বালানি তেলের কোনো ধরনের ঘাটতি বা সংকট তৈরি হবে না।
বিভাগের যুগ্ম সচিব মনির হোসেন চৌধুরী বলেন, এপ্রিল মাসজুড়ে বাংলাদেশ জ্বালানি নিরাপত্তার ক্ষেত্রে একটি স্থিতিশীল অবস্থানে রয়েছে। সরকারের পক্ষ থেকে নেওয়া নানামুখী পদক্ষেপের ফলে তেলের সরবরাহ স্বাভাবিক থাকবে এবং জনগণকে আতঙ্কিত না হওয়ার জন্য তিনি অনুরোধ জানান।
আরো পড়ুন : এপ্রিলে দেশে কোনো জ্বালানি সংকট হবে না
যুগ্ম সচিব তার বক্তব্যে উল্লেখ করেন, ইরান সম্প্রতি হরমুজ প্রণালি দিয়ে বাংলাদেশের যে ছয়টি জাহাজ ছেড়ে দেওয়ার অনুমতি দিয়েছে, তার মধ্যে একটি গুরুত্বপূর্ণ অপরিশোধিত তেলের জাহাজ রয়েছে। এই জাহাজটি দেশে পৌঁছে গেলে এবং তেল খালাস করা হলে চট্টগ্রামের রাষ্ট্রায়ত্ত ইস্টার্ন রিফাইনারিতে অপরিশোধিত তেলের কোনো সংকট থাকবে না।
তিনি আরো বলেন, বর্তমান সরকার জনগণের স্বার্থকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিচ্ছে এবং সেই চিন্তা থেকেই আন্তর্জাতিক বাজারের অস্থিরতা সত্ত্বেও দেশে জ্বালানি তেলের দাম বাড়ানো হয়নি। তবে সাধারণ নাগরিকদের মধ্যে অযথা তেল মজুত করার প্রবণতা দেখা দিলে কৃত্রিম সংকট তৈরি হতে পারে, তাই তিনি সবাইকে এ ধরনের কাজ থেকে বিরত থাকার আহ্বান জানান।
