নতুন সমীকরণে সুবিধাজনক অবস্থানে ইরান, উদ্বিগ্ন প্রতিদ্বন্দ্বীরা
কাগজ ডেস্ক
প্রকাশ: ১৯ জুন ২০২৬, ০৮:৩৫ এএম
ছবি : সংগৃহীত
যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে সাম্প্রতিক সমঝোতা মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিচ্ছে। ১৯৭৯ সালের ইসলামি বিপ্লবের পর এই প্রথম কোনো মার্কিন ও ইরানি প্রেসিডেন্ট আনুষ্ঠানিক চুক্তিতে পৌঁছালেন। সমর্থকদের কাছে এটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ কূটনৈতিক সাফল্য হিসেবে বিবেচিত হলেও ইসরাইল ও উপসাগরীয় দেশগুলোর মধ্যে উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে।
বুধবার (১৭ জুন) মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান একটি অন্তর্বর্তীকালীন চুক্তিতে স্বাক্ষর করেন। ফ্রান্সের ভার্সাইয়ে অনুষ্ঠিত জি-৭ সম্মেলনের ফাঁকে সম্পন্ন হওয়া এই চুক্তির মাধ্যমে তিন মাস ধরে চলা সংঘাতের অবসান ঘটে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, ১৪ দফার সমঝোতার আওতায় যুদ্ধবিরতির মেয়াদ আরও ৬০ দিনের জন্য বাড়ানো হয়েছে, যার মধ্যে লেবাননও অন্তর্ভুক্ত। এই সময়ের মধ্যে স্থায়ী সমাধানের লক্ষ্যে আলোচনা চলবে এবং ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচিসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে সংলাপ অব্যাহত থাকবে।
লেবাননের রাজনৈতিক বিশ্লেষক সারকিস নাওমের মতে, ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যে এই সমঝোতা উভয় পক্ষের জন্যই তাৎপর্যপূর্ণ এবং এর সফল হওয়ার সম্ভাবনা যথেষ্ট। তিনি মনে করেন, নিষেধাজ্ঞার চাপের কারণে ইরানের পক্ষে দীর্ঘ সময় অর্থনৈতিক সংকট বহন করা কঠিন, অন্যদিকে ট্রাম্প প্রশাসনও নতুন কোনো যুদ্ধের পথে যেতে আগ্রহী নয়।
ইসরাইলের জন্য ধাক্কা
ইসরাইলের জাতীয় নিরাপত্তা গবেষণা প্রতিষ্ঠানের জ্যেষ্ঠ গবেষক ড্যানি সিট্রিনোভিচ এই চুক্তিকে কৌশলগতভাবে নেতিবাচক হিসেবে দেখছেন। তার ভাষ্যে, যে উদ্যোগের মাধ্যমে ইরানের শাসনব্যবস্থাকে দুর্বল করার লক্ষ্য ছিল, সেটি শেষ পর্যন্ত দেশটির অবস্থানকে আরও বৈধতা দিয়েছে।
তার মতে, ইসরাইলের প্রধান উদ্বেগগুলোর কোনোটি চুক্তিতে স্পষ্টভাবে প্রতিফলিত হয়নি। ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি, আঞ্চলিক মিত্রগোষ্ঠীগুলোর কার্যক্রম কিংবা পারমাণবিক স্থাপনা অপসারণের বিষয়ে নির্দিষ্ট কোনো কাঠামো নির্ধারণ করা হয়নি। ফলে ইরান নতুন কৌশলগত সুযোগ পেয়েছে এবং ইসরাইল তুলনামূলকভাবে আরও বিচ্ছিন্ন অবস্থানে পড়েছে বলে তিনি মনে করেন।
তুলনামূলকভাবে শক্ত অবস্থানে ইরান
বিশ্লেষকদের মতে, চুক্তি কার্যকর থাকলে ইরান যুদ্ধ-পরবর্তী পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার পাশাপাশি ধাপে ধাপে নিষেধাজ্ঞা শিথিলের সুবিধা পেতে পারে। এর ফলে তেল রপ্তানি বৃদ্ধি, অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধার এবং পুনর্গঠনের জন্য নতুন অর্থায়নের সুযোগ তৈরি হতে পারে। একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে দেশটির রাজনৈতিক ব্যবস্থাও অধিক স্বীকৃতি লাভ করবে।
অন্যদিকে সমালোচকদের দাবি, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের ঘোষিত লক্ষ্য—ইরানের ধর্মীয় শাসনব্যবস্থার পরিবর্তন, পারমাণবিক কর্মসূচির অবসান এবং আঞ্চলিক প্রভাব সীমিত করা—কোনোটিই পূর্ণমাত্রায় অর্জিত হয়নি।
চুক্তির ফলে লেবাননেও ইরানের প্রভাব বাড়তে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। তেহরান-সমর্থিত হিজবুল্লাহর অবস্থান আরও দৃঢ় হওয়ার সম্ভাবনার কথা উল্লেখ করছেন পর্যবেক্ষকরা। তবে লেবাননের প্রেসিডেন্ট জোসেফ আউন সম্প্রতি বলেছেন, যুদ্ধবিরতি বা দক্ষিণ লেবানন থেকে ইসরাইলি বাহিনী প্রত্যাহারের মতো বিষয়ে ইরান লেবাননের প্রতিনিধি হিসেবে আলোচনা করতে পারে না।
অন্যদিকে হিজবুল্লাহ-ঘনিষ্ঠ সূত্রগুলোর দাবি, যুক্তরাষ্ট্র-ইরান সংলাপের কারণে লেবাননের কৌশলগত অবস্থান আরও শক্তিশালী হয়েছে। তাদের মতে, উভয় পক্ষ নিজেদের মিত্রদের ওপর প্রভাব ব্যবহার করে সমঝোতার পরিবেশ তৈরি করতে সক্ষম হবে।
উপসাগরীয় দেশগুলোর উদ্বেগ
চুক্তিকে ঘিরে সবচেয়ে বেশি উদ্বেগ দেখা যাচ্ছে উপসাগরীয় দেশগুলোর মধ্যে। তাদের আশঙ্কা, এই সমঝোতা অঞ্চলে ইরানের প্রভাব আরও বাড়িয়ে দিতে পারে এবং বিদ্যমান নিরাপত্তা কাঠামো নিয়ে নতুন প্রশ্ন তৈরি করতে পারে।
কিছু উপসাগরীয় সূত্রের মতে, এর ফলে যুক্তরাষ্ট্রের নিরাপত্তা নিশ্চয়তার ওপর আস্থা কমে যেতে পারে এবং ভবিষ্যতে ইরানের সঙ্গে সরাসরি সমঝোতার প্রবণতা বাড়তে পারে।
তবে ওয়াশিংটনের মধ্যপ্রাচ্য ইনস্টিটিউটের জ্যেষ্ঠ গবেষক অ্যালেক্স ভাতানকার মতে, দীর্ঘদিনের চাপ প্রয়োগের নীতি কাঙ্ক্ষিত ফল না দেওয়ার পর এই ধরনের সমঝোতাই সবচেয়ে বাস্তবসম্মত পথ। তিনি মনে করেন, বৃহত্তর আঞ্চলিক যুদ্ধ শুরু হলে উপসাগরীয় অঞ্চল দীর্ঘ সময়ের জন্য অস্থিতিশীল হয়ে পড়তে পারত।
সামনে বড় পরীক্ষা
বিশ্লেষকদের মতে, এই সমঝোতার প্রকৃত সফলতা নির্ভর করবে এর বাস্তবায়ন, পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে ভবিষ্যৎ আলোচনা এবং আঞ্চলিক প্রতিক্রিয়ার ওপর।
তাদের মতে, পুরো প্রক্রিয়ায় সবচেয়ে বড় অনিশ্চয়তার জায়গা ইসরাইলের অবস্থান। যদিও ট্রাম্পের সমর্থনে এগিয়ে চলা এই কূটনৈতিক উদ্যোগ পুরোপুরি ব্যর্থ হওয়ার সম্ভাবনা কম, তবুও বিশেষ করে লেবানন ইস্যুতে নতুন উত্তেজনা সৃষ্টি হওয়ার ঝুঁকি রয়ে গেছে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক ইরানি কর্মকর্তা দাবি করেন, সাম্প্রতিক সংঘাতের পর ইসরাইল আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক দুই ক্ষেত্রেই তুলনামূলকভাবে আরও বিচ্ছিন্ন হয়েছে। তার মতে, ইরান আলোচনায় অংশ নিয়েও নিজের কৌশলগত লক্ষ্য অর্জন করেছে এবং হিজবুল্লাহসহ মিত্রদের অবস্থান থেকে সরে আসেনি।
