×

জাতীয়

খাদ্য সংকটে বড় ঝুঁকিতে বাংলাদেশ

Icon

কাগজ ডেস্ক

প্রকাশ: ১৬ মে ২০২৬, ০৯:৫৫ এএম

খাদ্য সংকটে বড় ঝুঁকিতে বাংলাদেশ

ছবি : সংগৃহীত

বিশ্বজুড়ে খাদ্য সংকটের পরিস্থিতি ক্রমেই আরো উদ্বেগজনক হয়ে উঠছে। যুদ্ধ, জলবায়ু পরিবর্তন, মূল্যস্ফীতি, দারিদ্র্য ও বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অস্থিরতার কারণে কোটি কোটি মানুষ খাদ্য নিরাপত্তাহীনতার ঝুঁকিতে পড়েছে। এই সংকটের সবচেয়ে বড় চাপ বহন করছে মাত্র ১০টি দেশ, যার তালিকায় এবার বাংলাদেশের নামও উঠে এসেছে।

জাতিসংঘ সমর্থিত ‘গ্লোবাল রিপোর্ট অন ফুড ক্রাইসিস ২০২৫’-এ বলা হয়েছে, তীব্র খাদ্য নিরাপত্তাহীনতায় থাকা মানুষের দুই-তৃতীয়াংশ আফগানিস্তান, বাংলাদেশ, গণতান্ত্রিক কঙ্গো প্রজাতন্ত্র, মিয়ানমার, নাইজেরিয়া, পাকিস্তান, দক্ষিণ সুদান, সুদান, সিরিয়া ও ইয়েমেনে বসবাস করছে। প্রতিবেদনে আরো উল্লেখ করা হয়েছে, ২০২৫ সালে বিশ্বে প্রায় ২৬ কোটি ৬০ লাখ মানুষ তীব্র খাদ্য সংকটে ছিল, যা ২০১৬ সালের তুলনায় প্রায় দ্বিগুণ।

বাংলাদেশের ক্ষেত্রে প্রতিবেদনে কিছু উন্নতির ইঙ্গিত থাকলেও ভবিষ্যৎ নিয়ে সতর্কবার্তাও দেওয়া হয়েছে। প্রশ্ন উঠেছে, দেশটি কি সত্যিই খাদ্য সংকট থেকে বের হওয়ার প্রস্তুতি নিতে পেরেছে, নাকি সংকটের গভীরতা এখনো যথাযথভাবে বোঝা হয়নি।

বাংলাদেশে খাদ্য সংকট এখন শুধু খাদ্যের প্রাপ্যতার বিষয় নয়, বরং ক্রয়ক্ষমতা, পুষ্টি, জলবায়ু ঝুঁকি ও বৈষম্যের সম্মিলিত সংকট। প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৫ সালের মাঝামাঝি সময়ে দেশে প্রায় ১ কোটি ৫৬ লাখ মানুষ ‘সংকটজনক পর্যায় ৩’ এর খাদ্য নিরাপত্তাহীনতায় ছিল। আরো প্রায় ৪০ লাখ মানুষ ছিল ‘জরুরি পর্যায় ৪’-এ। ফলে বিপুল জনগোষ্ঠী নিয়মিত পর্যাপ্ত ও পুষ্টিকর খাদ্য সংগ্রহে সমস্যায় পড়ছে।

২০২৪ সালের তুলনায় কিছুটা উন্নতি দেখা গেলেও তা ভঙ্গুর ও অস্থায়ী বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। খাদ্য মূল্যস্ফীতি কিছুটা কমা, বড় দুর্যোগ না হওয়া এবং রেমিট্যান্স প্রবাহ বৃদ্ধিকে এর কারণ হিসেবে দেখানো হয়েছে। তবে বাস্তবতায় নিম্ন ও নিম্ন-মধ্যবিত্ত পরিবারের বড় অংশ এখনো খাদ্য ব্যয়ের চাপে রয়েছে। নিত্যপণ্যের উচ্চমূল্যের কারণে অনেক পরিবার খাদ্যাভ্যাস পরিবর্তন করছে, কেউ ঋণ নিচ্ছে, কেউ স্বাস্থ্য ব্যয় কমিয়ে খাদ্য খরচ সামলাচ্ছে।

কৃষি খাতে জলবায়ু পরিবর্তন বড় ঝুঁকি তৈরি করছে। হাওর অঞ্চলে আগাম বন্যা ও অতিবৃষ্টিতে ব্যাপক ফসলহানি হয়েছে। সুনামগঞ্জ, কিশোরগঞ্জ, নেত্রকোনা, হবিগঞ্জ ও মৌলভীবাজারে বোরো ধান পানির নিচে চলে গেছে।

আরো পড়ুন : নিত্যপণ্যে কর ছাড়, বিলাসপণ্যে বাড়তি করের পরিকল্পনা

হবিগঞ্জে প্রায় ১১ হাজার ৫০০ হেক্টর জমির ধান ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, সুনামগঞ্জে ক্ষতির পরিমাণ ২০০ কোটি টাকার বেশি। বৃহত্তর সিলেট অঞ্চলে প্রায় ৪০ হাজার হেক্টর জমি ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এ ধরনের বন্যা এখন আর বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। ২০২২ ও ২০২৪ সালের ভয়াবহ বন্যার পর জলবায়ু দুর্যোগ এখন স্থায়ী বাস্তবতায় পরিণত হয়েছে।

এমন পরিস্থিতিতে খাদ্যে ভর্তুকি কমানোর পরিকল্পনা নিয়েও উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। অর্থ মন্ত্রণালয়ের পরিকল্পনা অনুযায়ী, ২০২৬-২৭ অর্থবছরে খাদ্য ভর্তুকি ৯ হাজার ৬০০ কোটি টাকায় নামিয়ে আনার কথা ভাবা হচ্ছে।

চলতি অর্থবছরে যেখানে বরাদ্দ বাড়িয়ে ১০ হাজার ২১৪ কোটি টাকা করা হয়েছিল, সেখানে আবার কমানোর পরিকল্পনা করা হচ্ছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, এতে টিসিবি, ওএমএস ও খাদ্যবান্ধব কর্মসূচিতে চাপ বাড়তে পারে। অন্যদিকে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও সারে বড় অঙ্কের ভর্তুকি অব্যাহত থাকছে। ফলে প্রশ্ন উঠছে, খাদ্য নিরাপত্তা যখন ঝুঁকিতে, তখন খাদ্য সহায়তা কমানো কতটা যৌক্তিক।

সরকার প্রায় ৩ কোটি ৬৩ লাখ মানুষকে সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির আওতায় আনার পরিকল্পনা করেছে। এ খাতে ব্যয় ধরা হয়েছে প্রায় ৩৫ হাজার ৭০৮ কোটি টাকা।তবে অর্থনীতিবিদদের মতে, বরাদ্দ বাড়ালেই সমাধান হবে না। লক্ষ্যভিত্তিক ও স্বচ্ছ বাস্তবায়ন না হলে প্রকৃত দরিদ্ররা অনেক সময় সুবিধার বাইরে থেকে যায়।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক ড. সেলিম রায়হান মনে করেন, বাংলাদেশের খাদ্য নিরাপত্তাহীনতা মূলত একটি কাঠামোগত সমস্যা। তিনি বলেন, আয় বৈষম্য, অনিশ্চিত কর্মসংস্থান, জলবায়ু ঝুঁকি ও দুর্বল সামাজিক সুরক্ষার কারণে খাদ্য সংকট দীর্ঘস্থায়ী হচ্ছে। খাদ্য মূল্যস্ফীতি মানুষের জীবনযাত্রা বদলে দিচ্ছে এবং অনেকেই কম পুষ্টিকর খাবারের দিকে ঝুঁকছে। রেমিট্যান্স কিছুটা স্বস্তি দিলেও এটি স্থায়ী সমাধান নয়, কারণ সব পরিবার এই সুবিধা পায় না।

বাংলাদেশ কিছু পদক্ষেপ নিলেও তা যথেষ্ট নয় বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। জলবায়ু সহনশীল কৃষি, আধুনিক খাদ্য সরবরাহ ব্যবস্থা, লক্ষ্যভিত্তিক সহায়তা এবং পুষ্টিনিরাপত্তাকে অগ্রাধিকার দেওয়ার প্রয়োজন রয়েছে। সব মিলিয়ে খাদ্য সংকট এখন শুধু কৃষি বা বাজারের বিষয় নয়, এটি জাতীয় নিরাপত্তা ও সামাজিক স্থিতিশীলতার প্রশ্ন। প্রস্তুতি যত দেরি হবে, ভবিষ্যতের ঝুঁকি ততই বাড়বে।

সাবস্ক্রাইব ও অনুসরণ করুন

২২ বছর পর চাঁদপুরের পথে প্রধানমন্ত্রী, অংশ নেবেন একাধিক কর্মসূচিতে

২২ বছর পর চাঁদপুরের পথে প্রধানমন্ত্রী, অংশ নেবেন একাধিক কর্মসূচিতে

স্বামীর মরদেহ টুকরো ‍টুকরো করে ফ্রিজে রাখতে গিয়ে ধরা

স্বামীর মরদেহ টুকরো ‍টুকরো করে ফ্রিজে রাখতে গিয়ে ধরা

সাবেক মন্ত্রী মিজানুর রহমান সিনহা আর নেই

সাবেক মন্ত্রী মিজানুর রহমান সিনহা আর নেই

খাদ্য সংকটে বড় ঝুঁকিতে বাংলাদেশ

খাদ্য সংকটে বড় ঝুঁকিতে বাংলাদেশ

সব খবর

সম্পাদক : শ্যামল দত্ত

প্রকাশক : সাবের হোসেন চৌধুরী

অনুসরণ করুন

BK Family App