টেন্ডার ছাড়া জরুরি তেল আমদানি চেষ্টার কী হলো?
কাগজ ডেস্ক
প্রকাশ: ১৬ মে ২০২৬, ০৭:০২ পিএম
ছবি : সংগৃহীত
জ্বালানি তেলের সম্ভাব্য সংকট মোকাবিলা এবং মজুত বাড়াতে সরকার সম্প্রতি প্রচলিত দরপত্র পদ্ধতির বাইরে সরাসরি ক্রয় বা ডিপিএম (ডিরেক্ট পারচেজ মেথড) পদ্ধতিতে ১২টি বিদেশি কোম্পানিকে তেল সরবরাহের অনুমোদন দেয়। তবে মে মাসের মাঝামাঝি পর্যন্ত কোনো কোম্পানিই কার্যকরভাবে তেল সরবরাহ করতে পারেনি।
বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি) সূত্রে জানা গেছে, অনুমোদন পাওয়া কোম্পানিগুলোর মধ্যে রয়েছে যুক্তরাষ্ট্র, দুবাই, নেদারল্যান্ডস, হংকং, কাজাখস্তান, মালয়েশিয়া ও জাপানভিত্তিক প্রতিষ্ঠান। এসব কোম্পানির ডিজেল, অকটেন ও ক্রুড অয়েল সরবরাহ করার কথা ছিল।
তবে এখন পর্যন্ত মাত্র দুটি কোম্পানি পারফরম্যান্স গ্যারান্টি (পিজি) জমা দিয়েছে এবং আরও একটি প্রতিষ্ঠান পিজি দেওয়ার প্রতিশ্রুতি জানিয়েছে। বাকিদের কেউ সময় চেয়েছে, কেউ সরবরাহে অস্বীকৃতি জানিয়েছে, আবার কারও মেয়াদ শেষ হয়ে গেছে।
মার্চ মাসে আন্তর্জাতিক পরিস্থিতির কারণে তেলের সরবরাহে অনিশ্চয়তা তৈরি হলে সরকার দ্রুত মজুত বাড়ানোর উদ্যোগ নেয়। জ্বালানিমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ বলেন, যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে কিছু দেশ ফোর্স মেজর ঘোষণা করায় বিকল্প উৎস থেকে তেল সংগ্রহের প্রয়োজন দেখা দেয়। আতঙ্কে অতিরিক্ত তেল কেনা ঠেকাতেই সরকার দ্রুত পদক্ষেপ নেয়।
তিনি জানান, সরকার সবাইকে সুযোগ দিয়েছে যাতে অন্তত কিছু কোম্পানি সরবরাহ নিশ্চিত করতে পারে এবং তেলের মজুত বাড়ে।
এদিকে, বিভিন্ন কোম্পানির দেওয়া দর নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। কিছু প্রতিষ্ঠান তুলনামূলক বেশি দামে ডিজেল সরবরাহের প্রস্তাব দিলেও, একটি মার্কিন কোম্পানি আন্তর্জাতিক বাজারদরের তুলনায় অস্বাভাবিক কম দামে তেল সরবরাহের প্রস্তাব দেয়। জ্বালানিমন্ত্রী দাবি করেন, সব প্রস্তাব যাচাই-বাছাই করেই অনুমোদন দেওয়া হয়েছে।
বিপিসির চেয়ারম্যান মো. রেজানুর রহমান বলেন, অনুমোদনের সময় দেওয়া দাম চূড়ান্ত নয়। প্রকৃত মূল্য নির্ধারণ হবে আন্তর্জাতিক প্ল্যাটস রেট অনুযায়ী, যেদিন তেল লোড হবে সেই সময়ের বাজারদর হিসাব করে।
তিনি জানান, মার্চে তেলের কয়েকটি কার্গো স্থগিত হওয়ায় বিকল্প সরবরাহ উৎস খুঁজতে ডিপিএম পদ্ধতি চালু করা হয়। এর মাধ্যমে সরকার মূলত নতুন সরবরাহ উৎস শনাক্ত করতে এবং সরবরাহ ব্যবস্থায় বড় ধরনের বিঘ্ন ঘটলে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়ার প্রস্তুতি রাখতে চেয়েছিল।
বর্তমানে সরকার আবারও উন্মুক্ত দরপত্রের মাধ্যমে তিন মাসের জন্য নতুন করে তেল আমদানির উদ্যোগ নিয়েছে। জুন, জুলাই ও আগস্টকে সামনে রেখে এই টেন্ডার আহ্বান করা হয়েছে। বিপিসি জানিয়েছে, এখন আর ডিপিএম পদ্ধতিতে নতুন আমদানির পরিকল্পনা নেই।
সরকার ৯০ দিনের তেল মজুত নিশ্চিত করার নির্দেশনা দেওয়ায় এই অতিরিক্ত উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলেও জানান বিপিসি চেয়ারম্যান।
ডিপিএম পদ্ধতিতে অনুমোদন পাওয়া ১২টি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে তিনটি কোম্পানি এখনো সক্রিয় প্রক্রিয়ায় রয়েছে। তবে চারটি কোম্পানি সরাসরি সরে দাঁড়িয়েছে এবং আরও কয়েকটির বিষয়ে অনিশ্চয়তা রয়েছে।
বিপিসির ভাষ্য অনুযায়ী, পরিস্থিতি ছিল জরুরি এবং সীমিত সময়ের মধ্যে যাচাই-বাছাই করেই সিদ্ধান্ত নিতে হয়েছে। তাদের দাবি, বিকল্প উৎস অনুসন্ধান না করলে বড় ধরনের সরবরাহ সংকট তৈরি হতে পারত।
এদিকে, টেন্ডার ছাড়াই কার্যাদেশ পাওয়া কিছু প্রতিষ্ঠানের সক্ষমতা ও অভিজ্ঞতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। স্থানীয় গণমাধ্যমে এমন তথ্যও এসেছে যে, কোনো কোনো প্রতিষ্ঠান প্রস্তাব দেওয়ার মাত্র এক সপ্তাহের মধ্যেই অনুমোদন পেয়েছে।
ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, জরুরি পরিস্থিতিতে সরকার সরাসরি ক্রয় করতে পারে। তবে কোন প্রতিষ্ঠানকে কী কারণে বেছে নেওয়া হলো এবং তাদের সক্ষমতা কতটা- সেটা নিশ্চিত করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
তিনি বলেন, আন্তর্জাতিক সংকটের সময় সরকার বাধ্য হয়েই বিকল্প পথে গেছে। তবে ভবিষ্যতে যেন স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত থাকে, সেই বিষয়ে আরও সতর্ক হওয়া প্রয়োজন।
