×

জাতীয়

মালয়েশিয়া-চীনে প্রধানমন্ত্রীর প্রথম বিদেশ সফরে কী হতে যাচ্ছে

Icon

কাগজ ডেস্ক

প্রকাশ: ১৮ জুন ২০২৬, ১১:২৬ এএম

মালয়েশিয়া-চীনে প্রধানমন্ত্রীর প্রথম বিদেশ সফরে কী হতে যাচ্ছে

ছবি : সংগৃহীত

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের প্রথম বিদেশ সফরকে ঘিরে দেশজুড়ে কূটনৈতিক ও রাজনৈতিক মহলে ব্যাপক আলোচনা শুরু হয়েছে। গত ফেব্রুয়ারির নির্বাচনের মাধ্যমে সরকার গঠনের পর এটিই হতে যাচ্ছে তার প্রথম সরকারি বিদেশ সফর। সফরের গন্তব্য হিসেবে মালয়েশিয়া ও চীনকে বেছে নেওয়ায় বিষয়টি আরও গুরুত্ব পেয়েছে।

সরকারি সূত্রগুলো জানিয়েছে, প্রধানমন্ত্রী ২১ ও ২২ জুন মালয়েশিয়া সফর করবেন। এরপর ২৩ জুন কুয়ালালামপুর থেকে চীনের রাজধানী বেইজিংয়ের উদ্দেশে রওনা হবেন এবং ২৬ জুন দেশে ফিরবেন।

সফরের প্রস্তুতির অংশ হিসেবে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রসচিব আসাদ আলম সিয়াম সম্প্রতি বেইজিং সফর করে চীনের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠক করেছেন। সফরের কর্মসূচি, সম্ভাব্য চুক্তি ও সহযোগিতার বিভিন্ন বিষয় চূড়ান্ত করতেই এই কূটনৈতিক তৎপরতা চলছে বলে জানা গেছে।

বিশ্লেষকদের মতে, প্রধানমন্ত্রীর প্রথম বিদেশ সফরের গন্তব্য নির্বাচন শুধু কূটনৈতিক রীতির বিষয় নয়, বরং এটি সরকারের পররাষ্ট্রনীতির অগ্রাধিকার সম্পর্কেও গুরুত্বপূর্ণ বার্তা বহন করে। বিশেষ করে ভারত ও চীনকে পাশ কাটিয়ে প্রথমে মালয়েশিয়াকে বেছে নেওয়ার সিদ্ধান্তকে অনেকেই কৌশলগত পদক্ষেপ হিসেবে দেখছেন।

মালয়েশিয়া সফরে শ্রমবাজারই প্রধান অগ্রাধিকার

সরকারি কর্মকর্তাদের মতে, মালয়েশিয়া সফরে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব পাবে বাংলাদেশি শ্রমিকদের কর্মসংস্থানের বিষয়টি। দীর্ঘদিন ধরে বিভিন্ন প্রশাসনিক জটিলতা, নিয়োগ প্রক্রিয়ায় অনিয়ম এবং সিন্ডিকেটের অভিযোগের কারণে বাংলাদেশ থেকে মালয়েশিয়ায় জনশক্তি রপ্তানি কার্যত স্থবির হয়ে রয়েছে।

বর্তমানে বিপুলসংখ্যক বাংলাদেশি কর্মী মালয়েশিয়ায় অবস্থান করলেও অনেকেই বিভিন্ন ধরনের কাগজপত্র-সংক্রান্ত সমস্যায় ভুগছেন। ফলে সফরের সময় দেশটিতে অবস্থানরত বাংলাদেশিদের বৈধতা নিশ্চিত করা এবং নতুন করে শ্রমবাজার উন্মুক্ত করার বিষয়ে আলোচনা হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।

সরকার আশা করছে, প্রধানমন্ত্রীর সফরের মাধ্যমে দীর্ঘদিনের অচলাবস্থা কাটিয়ে বাংলাদেশি কর্মীদের জন্য নতুন সুযোগ সৃষ্টি হবে। এতে একদিকে যেমন কর্মসংস্থান বাড়বে, অন্যদিকে বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনও বৃদ্ধি পাবে।

শ্রমবাজারের পাশাপাশি শিক্ষা খাতেও সহযোগিতা বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। বাংলাদেশি শিক্ষার্থীদের জন্য মালয়েশিয়ার উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে সুযোগ বৃদ্ধির লক্ষ্যে দুই দেশের মধ্যে সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরের সম্ভাবনার কথা জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।

চীন সফরে বিনিয়োগ ও অবকাঠামো সহযোগিতার গুরুত্ব

মালয়েশিয়া সফর শেষে প্রধানমন্ত্রী চার দিনের সফরে চীন যাবেন। এই সফরকে ঘিরে সবচেয়ে বেশি আগ্রহ দেখা যাচ্ছে রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক অঙ্গনে।

সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানিয়েছে, সফরকালে বাণিজ্য, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, প্রতিরক্ষা, প্রযুক্তি ও অবকাঠামোসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে প্রায় ১৫টি সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হতে পারে।

বিশেষ গুরুত্ব পেতে পারে দ্বিতীয় পদ্মা সেতু নির্মাণ, তিস্তা মহাপরিকল্পনা, যমুনা নদীতে নতুন সেতু নির্মাণ এবং বাংলাদেশে চীনা অর্থনৈতিক অঞ্চল প্রতিষ্ঠার মতো বৃহৎ প্রকল্পগুলো।

সম্প্রতি চীনের ঋণ সহায়তায় প্রায় চার হাজার কোটি টাকার একটি অর্থনৈতিক অঞ্চল প্রকল্প অনুমোদন পেয়েছে। ফলে চীনা বিনিয়োগ বাড়ানোর বিষয়ে নতুন অগ্রগতির প্রত্যাশা করা হচ্ছে।

এ ছাড়া বৈদ্যুতিক গাড়ি উৎপাদন, প্রযুক্তি স্থানান্তর, কৃষি আধুনিকায়ন, নবায়নযোগ্য জ্বালানি, শিল্পায়ন ও উৎপাদন খাতে সহযোগিতা বাড়ানোর প্রস্তাবও আলোচনায় আসতে পারে।

সরকারি সূত্রগুলো আরও জানায়, চীনা মুদ্রায় বন্ড চালুর সম্ভাবনা, দুই দেশের মধ্যে মুদ্রা বিনিময় ব্যবস্থা, মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি (এফটিএ), বাংলাদেশে চীনা ব্যাংক স্থাপন এবং বিদ্যমান বিনিয়োগ চুক্তির আধুনিকায়নের বিষয়েও আলোচনা হতে পারে।

বেইজিংয়ে বিনিয়োগ সম্মেলনের পরিকল্পনা

প্রধানমন্ত্রীর সফরকে কেন্দ্র করে বেইজিংয়ে একটি বিনিয়োগ সম্মেলন আয়োজনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। সেখানে চীনের বিভিন্ন শিল্পগোষ্ঠী ও বিনিয়োগকারীদের সামনে বাংলাদেশের বিনিয়োগ সম্ভাবনা তুলে ধরা হবে।

বিশেষ করে উৎপাদনশিল্প, তথ্যপ্রযুক্তি, নবায়নযোগ্য জ্বালানি, পরিবহন অবকাঠামো এবং অর্থনৈতিক অঞ্চলে বিনিয়োগ আকর্ষণের চেষ্টা করবে বাংলাদেশ।

অর্থনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, বৈশ্বিক সরবরাহ ব্যবস্থা পুনর্বিন্যাসের এই সময়ে চীনা কোম্পানিগুলোকে বাংলাদেশে উৎপাদনমুখী বিনিয়োগে উৎসাহিত করা গেলে দেশের রপ্তানি ও কর্মসংস্থানে ইতিবাচক প্রভাব পড়বে।

কেন প্রথম সফরে মালয়েশিয়া?

বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতিতে ভারত ও চীন দীর্ঘদিন ধরেই গুরুত্বপূর্ণ দুই অংশীদার। তবে নতুন সরকারের প্রধানের প্রথম বিদেশ সফরের গন্তব্য হিসেবে মালয়েশিয়াকে বেছে নেওয়া কূটনৈতিক মহলে বিশেষ আলোচনা তৈরি করেছে।

পর্যবেক্ষকদের মতে, এটি একদিকে যেমন অর্থনৈতিক বাস্তবতাকে গুরুত্ব দেওয়ার প্রতিফলন, অন্যদিকে আঞ্চলিক শক্তিগুলোর মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখার প্রচেষ্টাও।

মালয়েশিয়া দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার একটি গুরুত্বপূর্ণ অর্থনীতি এবং বাংলাদেশের অন্যতম প্রধান শ্রমবাজার। একই সঙ্গে দেশটি আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক রাজনীতিতে তুলনামূলকভাবে ভারসাম্যপূর্ণ অবস্থান বজায় রাখে।

বিশ্লেষকদের মতে, প্রথম সফরের জন্য মালয়েশিয়াকে বেছে নেওয়ার মাধ্যমে সরকার একটি নিরপেক্ষ কূটনৈতিক বার্তা দিতে চেয়েছে। এর ফলে ভারত-চীন প্রতিদ্বন্দ্বিতার আলোচনায় না গিয়ে অর্থনৈতিক ও শ্রমবাজারভিত্তিক বাস্তব ইস্যুগুলোকে সামনে আনা সম্ভব হয়েছে।

ভারত-চীন ভারসাম্যের প্রশ্ন

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের একটি অংশ মনে করেন, নতুন সরকার একদিকে চীনের সঙ্গে অর্থনৈতিক সম্পর্ক আরও জোরদার করতে চায়, অন্যদিকে প্রতিবেশী ভারতকেও উপেক্ষা করতে চায় না।

তাদের মতে, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে চীন বাংলাদেশের রাজনৈতিক দল, ব্যবসায়ী মহল, শিক্ষাবিদ এবং বিভিন্ন পেশাজীবী গোষ্ঠীর সঙ্গে যোগাযোগ বাড়িয়েছে। একই সময়ে ভারতও নতুন সরকারের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়নের আগ্রহ প্রকাশ করেছে।

এই বাস্তবতায় মালয়েশিয়া সফরের পর চীন সফরকে অনেকেই ভারসাম্যপূর্ণ কূটনৈতিক কৌশলের অংশ হিসেবে দেখছেন।

কী অর্জন প্রত্যাশা করছে বাংলাদেশ?

সরকারি কর্মকর্তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, সফর দুটির মাধ্যমে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ লক্ষ্য অর্জনের আশা করা হচ্ছে। এর মধ্যে রয়েছে-

মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার পুনরায় চালুর পথ তৈরি।

মালয়েশিয়ায় অবস্থানরত বাংলাদেশিদের বিভিন্ন জটিলতার সমাধান।

চীনা বিনিয়োগ বৃদ্ধি ও নতুন শিল্প স্থাপন।

বড় অবকাঠামো প্রকল্পে অর্থায়ন ও প্রযুক্তিগত সহযোগিতা নিশ্চিত করা।

কৃষি, শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও প্রযুক্তি খাতে সহযোগিতা সম্প্রসারণ।

দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য বৃদ্ধির নতুন সুযোগ সৃষ্টি।

আঞ্চলিক কূটনীতিতে বাংলাদেশের ভারসাম্যপূর্ণ অবস্থানকে আরও শক্তিশালী করা।

সামনে কী দেখছে ঢাকা?

কূটনৈতিক ও অর্থনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, সফর দুটির সাফল্য শেষ পর্যন্ত নির্ভর করবে বাস্তব ফলাফলের ওপর। বিশেষ করে শ্রমবাজার পুনরায় চালু হওয়া, নতুন বিনিয়োগের প্রতিশ্রুতি, অবকাঠামো প্রকল্পে অগ্রগতি এবং স্বাক্ষরিত চুক্তিগুলোর বাস্তবায়ন কত দ্রুত হয়, সেটিই হবে মূল মূল্যায়নের বিষয়।

তবে সামগ্রিকভাবে মালয়েশিয়া ও চীন সফরকে নতুন সরকারের পররাষ্ট্রনীতি ও অর্থনৈতিক কূটনীতির প্রথম বড় পরীক্ষা হিসেবে দেখা হচ্ছে। এই সফরের মাধ্যমে বাংলাদেশ একদিকে অর্থনৈতিক সহযোগিতা বাড়ানোর চেষ্টা করবে, অন্যদিকে আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ভারসাম্যপূর্ণ কূটনৈতিক অবস্থানের বার্তাও তুলে ধরবে।

সাবস্ক্রাইব ও অনুসরণ করুন

গণমাধ্যমের স্বাধীনতা নিশ্চিতে সরকার কাজ করে যাচ্ছে

তথ্যমন্ত্রী গণমাধ্যমের স্বাধীনতা নিশ্চিতে সরকার কাজ করে যাচ্ছে

গাজীপুরে পোশাক কারখানায় পানি পান করে অসুস্থ ২ শতাধিক শ্রমিক

গাজীপুরে পোশাক কারখানায় পানি পান করে অসুস্থ ২ শতাধিক শ্রমিক

আগামী দিনে ফল হবে বাংলাদেশের শক্তিশালী রফতানি পণ্য

কৃষিমন্ত্রী আগামী দিনে ফল হবে বাংলাদেশের শক্তিশালী রফতানি পণ্য

এসি চালানোর আদর্শ তাপমাত্রা কত?

এসি চালানোর আদর্শ তাপমাত্রা কত?

সব খবর

সম্পাদক : শ্যামল দত্ত

প্রকাশক : সাবের হোসেন চৌধুরী

অনুসরণ করুন

BK Family App