দুই বাংলাদেশির মৃত্যুদণ্ড, ভিয়েনা প্রটোকল লঙ্ঘন করেছে সৌদি আরব?
আন্তর্জাতিক ডেস্ক
প্রকাশ: ১৭ অক্টোবর ২০২৬, ০৯:২৬ পিএম
ছবি: সংগৃহীত
সৌদি আরবের মক্কা নগরীর একটি মসজিদে ‘অনৈতিক’ কাজের অভিযোগে দোষী সাব্যস্ত দুই বাংলাদেশির মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের পর দেশটির সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে এ বিষয়ে বিস্তারিত ব্যাখ্যা চেয়েছে বাংলাদেশ।
তবে প্রশ্ন উঠেছে, দুই বাংলাদেশির মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের আগে তাঁদের পরিবার বা বাংলাদেশ দূতাবাসকে কোনো তথ্য না জানিয়ে সৌদি আরব ভিয়েনা কনভেনশন লঙ্ঘন করেছে কি না। এ বিষয়ে বাংলাদেশকে ব্যাখ্যা দিতে দেশটি আইনত কতটা বাধ্য, তা নিয়েও আলোচনা চলছে। একই সঙ্গে ওই দুই বাংলাদেশির মরদেহ কী প্রক্রিয়ায় দেশে আনা হবে, কিংবা আদৌ আনা সম্ভব হবে কি না, তা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।
জেদ্দায় বাংলাদেশ কনস্যুলেটের সূত্রগুলো নিশ্চিত করেছে, ওই দুই বাংলাদেশির আটক, বিচার ও মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের বিষয়ে সৌদি কর্তৃপক্ষ বাংলাদেশ দূতাবাসকে কোনো তথ্য জানায়নি। সংবাদমাধ্যমে খবর প্রকাশের পর বাংলাদেশের পক্ষ থেকে এ বিষয়ে ব্যাখ্যা চাওয়া হলেও সৌদি আরব তা দিতে আইনগতভাবে বাধ্য কি না, তা নিয়ে মতভেদ রয়েছে।
সাবেক রাষ্ট্রদূত হুমায়ুন কবির বলেন, কোনো নাগরিক বিদেশে এমন পরিস্থিতির মুখে পড়লে তিনি নিজ দেশের কনস্যুলার সুবিধা চাইতে পারেন।
বিবিসি বাংলাকে তিনি বলেন, ‘কিন্তু এক্ষেত্রে কী হয়েছে, আমরা জানি না। বিচারটি সৌদি আরবের অভ্যন্তরীণ আইনি প্রক্রিয়ায় হওয়ায় বাংলাদেশকে জানাতে তাদের জন্য আইনি কোনো বাধ্যবাধকতা নেই। তবে বাংলাদেশ জানতে চাইলে তারা হয়তো জবাব দিতে পারে।’
অন্যদিকে, কয়েকজন বিশেষজ্ঞের মতে, দুই বাংলাদেশির পরিবার ও বাংলাদেশ দূতাবাসকে না জানিয়ে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করার মাধ্যমে সৌদি আরব ভিয়েনা কনভেনশনের বিধান লঙ্ঘন করে থাকতে পারে।
সৌদি আরব ১৯৮১ সালে কূটনৈতিক সম্পর্কবিষয়ক ভিয়েনা কনভেনশনে স্বাক্ষর করে। আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক ও কনস্যুলার সম্পর্ক পরিচালনার ক্ষেত্রে এই কনভেনশন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
আরও পড়ুন: রিয়াদগামী সব ফ্লাইট অনির্দিষ্টকালের জন্য স্থগিত করল বিমান
কনভেনশনের ৩৬ অনুচ্ছেদে বিদেশি নাগরিক আটক বা বন্দি হলে তাঁর অনুরোধে বিলম্ব না করে নিজ দেশের কনস্যুলার বিভাগ বা দূতাবাসকে অবহিত করার বিধান রয়েছে। এর মাধ্যমে আটক ব্যক্তি নিজ দেশের দূতাবাসের সঙ্গে যোগাযোগ এবং প্রয়োজনীয় কনস্যুলার সহায়তা পাওয়ার সুযোগ পান।
যুক্তরাজ্যভিত্তিক আন্তর্জাতিক আইন বিশেষজ্ঞ ড. রায়হান রশীদ বলেন, প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, দুই বাংলাদেশির মৃত্যুদণ্ড আপিল প্রক্রিয়া শেষে কার্যকর করা হয়েছে। অর্থাৎ, পুরো বিচারিক প্রক্রিয়াটি এক দিনে সম্পন্ন হয়নি।
বিবিসি বাংলাকে তিনি বলেন, ‘এটি বাংলাদেশ দূতাবাসের জানা উচিত ছিল। ভিকটিম বা সৌদি কর্তৃপক্ষ না জানালে দূতাবাস জানবে না— এটি গ্রহণযোগ্য নয়। কারণ প্রক্রিয়াটি একদিনে হয়নি। আবার ভিয়েনা কনভেনশন অনুযায়ী, ওই দুজনকে বারবার নোটিফাই করার কথা যে তাঁরা কনস্যুলার সুবিধা নেবেন কি না। তাঁরা না নিতে চাইলে সৌদি কর্তৃপক্ষের দায় নেই।’
ঘটনা সম্পর্কে এখন পর্যন্ত যা জানা গেছে
সৌদি প্রেস এজেন্সি (এসপিএ) দেশটির স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বরাত দিয়ে গত বুধবার দুই বাংলাদেশির মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের খবর প্রকাশ করে। ওই খবরে বলা হয়, মক্কার একটি মসজিদে অনৈতিক ও অশালীন কাজে লিপ্ত হওয়ার অভিযোগে দেশটির নিরাপত্তা বাহিনী তাঁদের আটক করেছিল।
খবরটি প্রকাশের পর বৃহস্পতিবার জেদ্দায় বাংলাদেশ কনস্যুলেট সৌদি পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে চিঠি দিয়ে ঘটনার বিস্তারিত জানতে চায়।
বাংলাদেশ কনস্যুলেটের সূত্রগুলো বলছে, দুই বাংলাদেশিকে আটক, তাঁদের বিচার এবং মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের বিষয়ে সৌদি কর্তৃপক্ষ বাংলাদেশ দূতাবাসকে কোনো তথ্য জানায়নি। এমনকি ওই দুজন বাংলাদেশের নাগরিক কি না, তা-ও দূতাবাসের মাধ্যমে যাচাই করা হয়নি বলে সূত্রগুলো জানিয়েছে।
আরও পড়ুন: ‘সৌদি আরবে দুই বাংলাদেশির মৃত্যুদণ্ড আমাদের জন্য বড় শিক্ষা’
ব্র্যাকের অভিবাসন বিভাগের প্রধান শরীফুল হাসানের মতে, পুরো প্রক্রিয়ায় সৌদি আরব ভিয়েনা কনভেনশনের বিধান লঙ্ঘন করেছে।
১৯৬১ সালে জাতিসংঘের উদ্যোগে বিভিন্ন দেশের অংশগ্রহণে কূটনৈতিক সম্পর্কবিষয়ক যে চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়, সেটি ‘ভিয়েনা কনভেনশন অন ডিপ্লোম্যাটিক রিলেশনস’ নামে পরিচিত। বিভিন্ন দেশে বিদেশি কূটনৈতিক মিশন ও প্রতিনিধিদের কার্যক্রম পরিচালনার ক্ষেত্রে এই কনভেনশন একটি গুরুত্বপূর্ণ আইনি কাঠামো।
বিশ্বের ১৮০টিরও বেশি দেশ এই কনভেনশনে অংশ নেওয়ায় এটি আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক সম্পর্কের অন্যতম মৌলিক ভিত্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। তবে বিদেশি নাগরিকদের আটক ও কনস্যুলার সহায়তার বিষয়টি মূলত ১৯৬৩ সালের ‘ভিয়েনা কনভেনশন অন কনস্যুলার রিলেশনস’-এর আওতাভুক্ত।

এই কনভেনশনের ৩৬ অনুচ্ছেদে বিদেশি নাগরিকদের আটক বা গ্রেপ্তারের পর নিজ দেশের কনস্যুলার কর্মকর্তাদের সঙ্গে যোগাযোগ এবং প্রয়োজনীয় সহায়তা পাওয়ার অধিকার নিশ্চিত করা হয়েছে। এর আওতায় কনস্যুলার কর্মকর্তারা আটক ব্যক্তির সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে, যোগাযোগ করতে এবং তাঁর সম্মতিতে আইনি প্রতিনিধিত্বের ব্যবস্থা করতে সহায়তা করতে পারেন।
ড. রায়হান রশীদ বলেন, বাংলাদেশ ও সৌদি আরব উভয় দেশই ভিয়েনা কনভেনশনে স্বাক্ষরকারী। ফলে বিদেশি নাগরিকদের আটক এবং কনস্যুলার সুবিধা নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে প্রযোজ্য বিধান মেনে চলার বাধ্যবাধকতা রয়েছে।
তিনি বলেন, ‘আটক হওয়া ব্যক্তিদের কনস্যুলার সুবিধা নেওয়ার পর নোটিফাই করতে হবে এবং এটি করা হয়েছে কি না, তার প্রমাণ থাকতে হবে সৌদি আরবের কাছে।’
শরীফুল হাসান বলেন, ভিয়েনা কনভেনশনের বিধান অনুযায়ী বিদেশি নাগরিকদের কনস্যুলার সহায়তা পাওয়ার সুযোগ রয়েছে। অথচ এ ক্ষেত্রে বাংলাদেশ দূতাবাসকে কোনো তথ্য জানানো হয়নি বলে অভিযোগ উঠেছে।
তিনি প্রশ্ন তোলেন, ‘কিন্তু এক্ষেত্রে কিছুই হয়নি। সৌদি আরব বাংলাদেশি নাগরিকদের সঙ্গে আগেও এমন করেছে। আমার প্রশ্ন হলো, এই দুজন যদি আমেরিকার নাগরিক হতো, তাহলে কি সৌদি আরব এটা করতে পারতো?’
অন্যদিকে, সাবেক রাষ্ট্রদূত হুমায়ুন কবিরের বক্তব্য, কোনো দেশে বিদেশি নাগরিক অপরাধে জড়ালে সেই দেশের অভ্যন্তরীণ আইনি প্রক্রিয়ায় বিচার পরিচালনায় বাধা নেই। তাঁর মতে, এ ধরনের ঘটনায় সংশ্লিষ্ট দেশের দূতাবাসকে জানানো সব ক্ষেত্রে আইনগত বাধ্যবাধকতা নয়।
বিবিসি বাংলাকে তিনি বলেন, অনেক সময় কোনো দেশের কর্তৃপক্ষ বিদেশি নাগরিক আটক হলে তাঁর দূতাবাসকে অবহিত করে। আবার কোনো দেশ তার নাগরিকের আটকের বিষয়ে জানতে চাইলে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ তথ্য দিয়ে থাকে। তবে এ ক্ষেত্রে আইনি বাধ্যবাধকতা রয়েছে কি না, তা নির্ভর করে প্রযোজ্য বিধান ও পরিস্থিতির ওপর।
মরদেহ দেশে আসবে কবে?
ঢাকায় পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও জেদ্দায় বাংলাদেশ মিশনের কূটনৈতিক সূত্রগুলো বলছে, মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হওয়া দুই বাংলাদেশির বিষয়ে সৌদি কর্তৃপক্ষ এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো তথ্য জানায়নি।
ফলে তাঁদের মরদেহ কোথায় রয়েছে, তা-ও নিশ্চিত হওয়া যায়নি। কবে নাগাদ মরদেহ বাংলাদেশ কর্তৃপক্ষের কাছে হস্তান্তর করা হবে, সে বিষয়েও কোনো তথ্য নেই।
সৌদি কর্তৃপক্ষ বাংলাদেশকে আনুষ্ঠানিকভাবে না জানানোয় দুই বাংলাদেশির পরিবারের সঙ্গেও দূতাবাসের পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিক যোগাযোগ করা সম্ভব হচ্ছে না বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানিয়েছে।
সাধারণত পরিবারের পক্ষ থেকে আবেদন করা হলে দূতাবাস প্রয়োজনীয় প্রক্রিয়া অনুসরণ করে মরদেহ দেশে ফিরিয়ে আনতে সহায়তা করে থাকে।
শরীফুল হাসান বলেন, ‘কিন্তু এ ক্ষেত্রে পরিবার, দূতাবাস—কারও সঙ্গেই তো সৌদি কর্তৃপক্ষ যোগাযোগ করেনি। এমনকি ওই দুজন আদৌ আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ পেয়েছেন কি না, তা-ও নিশ্চিত নয়। তাঁরা বিদেশি নাগরিক হিসেবে কনস্যুলার সুবিধার আওতায় দূতাবাসের মাধ্যমে আইনি সহায়তা পাওয়ার অধিকারী ছিলেন। কিন্তু সৌদি আরব এক্ষেত্রে সবাইকে অন্ধকারে রেখেছে।’
সূত্র: বিবিসি বাংলা।
