×

মতামত

মে দিবসে শ্রম, শোষণ ও বৈশ্বিক অর্থনীতির পুনর্চিন্তার জরুরি আহ্বান

Icon

রাসেল আহমদ

প্রকাশ: ০১ মে ২০২৬, ০৫:৫১ পিএম

মে দিবসে শ্রম, শোষণ ও বৈশ্বিক অর্থনীতির পুনর্চিন্তার জরুরি আহ্বান

মতামত: মে দিবসে শ্রম, শোষণ ও বৈশ্বিক অর্থনীতির পুনর্চিন্তার জরুরি আহ্বান

বিশ্ব শ্রমিক আন্দোলনের ইতিহাসে ১ মে কেবল একটি স্মরণদিবস নয়, এটি মানবসভ্যতার অর্থনৈতিক ও সামাজিক বিবর্তনের এক গভীর রাজনৈতিক দলিল। এই দিনটি শ্রমিক শ্রেণীর দীর্ঘ সংগ্রাম, ত্যাগ এবং অধিকার প্রতিষ্ঠার ঐতিহাসিক প্রতীক হিসেবে বিশ্বজুড়ে স্বীকৃত। আধুনিক শিল্পসভ্যতার ভিত্তি যে শ্রমের উপর দাঁড়িয়ে আছে, সেই শ্রমিকদের ন্যায্য অধিকার প্রতিষ্ঠার সংগ্রামই মে দিবসের মূল অনুপ্রেরণা।

উনবিংশ শতাব্দীর শিল্পবিপ্লব পরবর্তী সময়ে পুঁজিবাদী উৎপাদন কাঠামোর বিস্তারের সঙ্গে সঙ্গে শ্রমিক শোষণের মাত্রা ভয়াবহ রূপ ধারণ করে। দৈনিক ১২ থেকে ১৬ ঘণ্টা শ্রম, অনিরাপদ কর্মপরিবেশ এবং ন্যূনতম সামাজিক সুরক্ষার অনুপস্থিতি শ্রমজীবী মানুষের জীবনকে এক অনিশ্চিত বাস্তবতায় ঠেলে দেয়। সেই প্রেক্ষাপটে শ্রমিক আন্দোলনের অন্যতম মৌলিক দাবি ছিল ৮ ঘণ্টা শ্রমদিবস- ‘৮ ঘণ্টা কাজ, ৮ ঘণ্টা বিশ্রাম এবং ৮ ঘণ্টা ব্যক্তিগত জীবন ও সংগঠনের জন্য সময়’।

এই দাবিকে কেন্দ্র করে বিশ্বব্যাপী শ্রমিক আন্দোলন সংগঠিত হয়, যার চূড়ান্ত বিস্ফোরণ ঘটে ১৮৮৬ সালে যুক্তরাষ্ট্রের শিকাগো শহরে। হে মার্কেটসহ বিভিন্ন শ্রমিক বিক্ষোভে পুলিশের সহিংস দমন, শ্রমিক হতাহতের ঘটনা এবং শ্রমিক নেতাদের গ্রেপ্তার ও ফাঁসির রায় শ্রমিক আন্দোলনের ইতিহাসে এক গভীর ট্র্যাজেডি হিসেবে চিহ্নিত। তবে এই ত্যাগই শ্রমিক অধিকার আন্দোলনকে আন্তর্জাতিক মাত্রায় নিয়ে যায় এবং পরবর্তীতে ১ মে আন্তর্জাতিক শ্রমিক সংহতি দিবস হিসেবে প্রতিষ্ঠা পায়।

আজ দেড় শতাব্দী পরেও প্রশ্নটি প্রাসঙ্গিক- এই ঐতিহাসিক সংগ্রামের অর্জন কতটা বাস্তবায়িত হয়েছে?

আধুনিক বৈশ্বিক অর্থনীতি বাহ্যত শ্রমিক অধিকারের বহু কাঠামো তৈরি করেছে। আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা (ILO) কনভেনশন, বিভিন্ন দেশের শ্রম আইন এবং সামাজিক নিরাপত্তা নীতিমালা শ্রমিক কল্যাণের আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি প্রদান করেছে। কিন্তু বাস্তবতা বলছে, শ্রমিকের জীবনমান, মজুরি কাঠামো এবং কর্মপরিবেশ এখনো বৈশ্বিক অর্থনৈতিক প্রতিযোগিতার চাপে গভীরভাবে প্রভাবিত।

বিশ্বায়নের বর্তমান পর্যায়ে উৎপাদন ব্যবস্থা এক জটিল সরবরাহ শৃঙ্খলের (global supply chain) মধ্যে আবদ্ধ। এখানে খরচ কমানো, দ্রুত উৎপাদন এবং বাজার প্রতিযোগিতা বজায় রাখার চাপ অনেক সময় শ্রমিকের মজুরি ও কর্মপরিবেশের ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করে। উন্নয়নশীল অর্থনীতিগুলোতে এই চাপ আরও তীব্র, কারণ তারা বৈদেশিক অর্ডার এবং রপ্তানি নির্ভরতার মধ্যে ভারসাম্য রক্ষার চেষ্টা করে।

বাংলাদেশের তৈরি পোশাক শিল্প এই বৈশ্বিক কাঠামোর একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। দেশের রপ্তানি আয়ের প্রধান উৎস এই খাত, যেখানে কয়েক মিলিয়ন শ্রমিক সরাসরি কর্মরত। এই শিল্প দেশের অর্থনীতির অন্যতম চালিকাশক্তি হলেও শ্রমিকদের জীবনমান এবং আয় কাঠামো নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে বিতর্ক ও আলোচনা চলে আসছে।

বর্তমান বাজার বাস্তবতায় জীবনযাত্রার ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। খাদ্য, বাসস্থান, স্বাস্থ্যসেবা এবং শিক্ষার ব্যয় বৃদ্ধির কারণে নিম্ন আয়ের শ্রমিক পরিবারের ওপর চাপ বেড়েছে। অথচ মজুরি কাঠামো অনেক ক্ষেত্রে সেই হারে সমন্বয় হয়নি। ফলে শ্রমিকদের প্রকৃত আয় ক্ষমতা কমে যাচ্ছে, যা তাদের জীবনযাত্রাকে আরও কঠিন করে তুলছে।

অন্যদিকে বৈশ্বিক বাজারে প্রতিযোগিতা, অর্ডার পরিবর্তন এবং উৎপাদন সময়সীমার চাপ (lead time pressure) অনেক কারখানাকে দ্রুত উৎপাদন প্রক্রিয়ার দিকে ঠেলে দিচ্ছে। এর ফলে শ্রমঘনত্ব বৃদ্ধি পাচ্ছে, যদিও আনুষ্ঠানিক কর্মঘণ্টা একই থাকছে। এই বাস্তবতা অনেক সময় শ্রমিকের শারীরিক ও মানসিক চাপ বাড়িয়ে দেয়।

শ্রমিক আন্দোলনের মূল দর্শন ছিল ন্যায্যতা ও মর্যাদা। কিন্তু আধুনিক শ্রমবাজারে সেই ন্যায্যতার প্রশ্নটি কেবল মজুরির মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; বরং এটি উৎপাদন কাঠামো, বৈশ্বিক মূল্যচেইন এবং রাষ্ট্রীয় নীতির সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত।

বাংলাদেশসহ অনেক উন্নয়নশীল দেশে শ্রম আইন বিদ্যমান থাকলেও তার বাস্তব প্রয়োগে সীমাবদ্ধতা দেখা যায়। ট্রেড ইউনিয়ন অধিকার, শ্রমিক প্রতিনিধিত্ব এবং অভিযোগ নিষ্পত্তি ব্যবস্থার কার্যকারিতা অনেক ক্ষেত্রে প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে ওঠে। যদিও এর পেছনে প্রশাসনিক সীমাবদ্ধতা, শিল্পখাতের প্রতিযোগিতামূলক চাপ এবং অর্থনৈতিক বাস্তবতা কাজ করে, তবুও শ্রমিকের কণ্ঠস্বর যথাযথভাবে প্রতিফলিত না হলে শ্রমবাজারে ভারসাম্যহীনতা তৈরি হয়।

এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো- শ্রমিক অধিকার এবং অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি পরস্পরবিরোধী নয়। বরং দীর্ঘমেয়াদে টেকসই উন্নয়নের জন্য এই দুইয়ের মধ্যে সমন্বয় অপরিহার্য। যে কোনো শিল্প খাতে উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি কেবল প্রযুক্তি বা বিনিয়োগের ওপর নির্ভর করে না; বরং শ্রমিকের দক্ষতা, মানসিক স্থিতি এবং জীবনমানের ওপরও নির্ভরশীল।

বিশ্ব অর্থনীতির বর্তমান অনিশ্চয়তা- জ্বালানি মূল্য ওঠানামা, ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা, বাণিজ্য নীতি পরিবর্তন এবং সরবরাহ ব্যবস্থার অস্থিরতা- উৎপাদন খাতে নতুন চাপ সৃষ্টি করছে। এই চাপের প্রথম প্রভাব সাধারণত শ্রমবাজারে পড়ে, যেখানে কর্মসংস্থান হ্রাস, মজুরি স্থবিরতা এবং চাকরি অনিশ্চয়তা দেখা দেয়।

বিশেষ করে জ্বালানি ও কাঁচামালের মূল্যবৃদ্ধি শিল্প উৎপাদন খরচ বাড়িয়ে দেয়, যা অনেক সময় প্রতিযোগিতামূলক বাজারে টিকে থাকার জন্য শ্রমিকের উপর পরোক্ষ চাপ সৃষ্টি করে। যদিও পুঁজিবাজার ও বড় শিল্পগোষ্ঠী এই পরিবর্তনের সঙ্গে খাপ খাইয়ে নেওয়ার সক্ষমতা রাখে, নিম্ন আয়ের শ্রমিকরা সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে পড়ে।

এই বাস্তবতায় শ্রমনীতি পুনর্বিবেচনা অত্যন্ত জরুরি। কেবল মজুরি নির্ধারণ নয়, বরং একটি সামগ্রিক সামাজিক সুরক্ষা কাঠামো গড়ে তোলা প্রয়োজন, যেখানে শ্রমিকের স্বাস্থ্য, নিরাপত্তা, প্রশিক্ষণ এবং অবসরকালীন সুবিধা অন্তর্ভুক্ত থাকবে।

একই সঙ্গে শ্রমিক সংগঠনগুলোর স্বাধীনতা ও কার্যকারিতা নিশ্চিত করা একটি গণতান্ত্রিক শ্রমবাজারের মৌলিক শর্ত। সংগঠিত শ্রমিক শক্তি কেবল দাবি আদায়ের মাধ্যম নয়, এটি উৎপাদন ব্যবস্থার একটি স্থিতিশীল উপাদান হিসেবেও কাজ করে।

বর্তমান পরিস্থিতিতে একটি গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জ হলো শ্রমিক ও মালিকপক্ষের মধ্যে আস্থার ঘাটতি। এই আস্থার সংকট কমাতে হলে স্বচ্ছতা, নিয়মিত সংলাপ এবং ন্যায্যতা ভিত্তিক নীতি প্রয়োজন। শ্রমবাজারে যেকোনো সংকট দীর্ঘমেয়াদে শিল্পখাতের স্থিতিশীলতাকেও প্রভাবিত করে।

আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা বলছে, যেখানে শ্রমিকের ন্যায্য অংশীদারিত্ব নিশ্চিত করা হয়েছে, সেখানে শিল্পখাত আরও স্থিতিশীল ও প্রতিযোগিতামূলক হয়েছে। স্ক্যান্ডিনেভিয়ান দেশগুলোর শ্রমনীতি, জার্মানির সহ-নির্ধারণ ব্যবস্থা বা কিছু পূর্ব এশীয় দেশের শ্রম সংস্কার- সব ক্ষেত্রেই শ্রমিকের অংশগ্রহণ উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধিতে সহায়ক হয়েছে।

বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে এই অভিজ্ঞতা গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা প্রদান করে। এখানে রপ্তানি নির্ভর শিল্পখাতে শ্রমিকের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হলেও তাদের নীতিনির্ধারণে অংশগ্রহণ সীমিত। এই সীমাবদ্ধতা দূর করা গেলে শিল্পখাতে দীর্ঘমেয়াদে স্থিতিশীলতা আরও বৃদ্ধি পেতে পারে।

মে দিবস তাই কেবল ইতিহাসের স্মরণ নয়, এটি বর্তমান বাস্তবতার পুনর্মূল্যায়ন এবং ভবিষ্যৎ নীতিনির্ধারণের একটি সুযোগ। এই দিনটি আমাদের মনে করিয়ে দেয়- অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি তখনই অর্থবহ, যখন তা শ্রমজীবী মানুষের জীবনে বাস্তব উন্নয়ন ঘটায়।

আজকের বৈশ্বিক বাস্তবতায় শ্রমশোষণ আর কেবল দৃশ্যমান শারীরিক পরিশ্রমের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়, এটি অনেক সময় কাঠামোগত, অর্থনৈতিক এবং নীতিগত প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে প্রকাশ পায়। তাই শ্রম অধিকার রক্ষা এখন আরও জটিল এবং বহুমাত্রিক বিষয়।

অর্থনৈতিক উন্নয়নকে যদি টেকসই করতে হয়, তবে শ্রমিকের মর্যাদা, নিরাপত্তা এবং ন্যায্য অংশীদারিত্বকে উন্নয়ন নীতির কেন্দ্রবিন্দুতে রাখতে হবে। কেবল উৎপাদন বৃদ্ধি বা রপ্তানি আয় নয়, বরং মানবিক উন্নয়ন সূচকও সমানভাবে বিবেচনায় নিতে হবে।

শেষ পর্যন্ত বলা যায়, মে দিবস আমাদের অতীতের সংগ্রামের স্মৃতি হলেও এটি ভবিষ্যতের জন্য একটি নীতিগত আহ্বান। এই আহ্বান হলো- শ্রমকে সম্মান করা, শ্রমিককে সুরক্ষা দেওয়া এবং উন্নয়নকে অন্তর্ভুক্তিমূলক করা।

শ্রমিকের ঘামই আধুনিক অর্থনীতির ভিত্তি। সেই ভিত্তি দুর্বল হলে কোনো অর্থনৈতিক কাঠামোই দীর্ঘস্থায়ী হতে পারে না। তাই মে দিবসের প্রকৃত শিক্ষা হলো- শোষণ নয়, ন্যায্যতার ওপর ভিত্তি করেই ভবিষ্যৎ অর্থনীতি গড়ে তুলতে হবে।

এই দৃষ্টিকোণ থেকে মে দিবস আজও সমানভাবে প্রাসঙ্গিক, কারণ শ্রমিকের অধিকার প্রতিষ্ঠার সংগ্রাম এখনো শেষ হয়নি- বরং তা নতুন রূপে, নতুন প্রেক্ষাপটে অব্যাহত রয়েছে।

লেখক : সাংবাদিক ও কলামিস্ট

সাবস্ক্রাইব ও অনুসরণ করুন

অস্ট্রেলিয়া থেকে পিএইচডি ডিগ্রি অর্জন করলেন বেরোবি শিক্ষক আনোয়ার

অস্ট্রেলিয়া থেকে পিএইচডি ডিগ্রি অর্জন করলেন বেরোবি শিক্ষক আনোয়ার

নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ট্রাকে আগুন

নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ট্রাকে আগুন

বিপুল পরিমাণ শুটারগান ও সরঞ্জাম উদ্ধার

বিপুল পরিমাণ শুটারগান ও সরঞ্জাম উদ্ধার

মোটরসাইকেলে ট্রলির ধাক্কা, প্রাণ গেল স্বামী-স্ত্রীর

মোটরসাইকেলে ট্রলির ধাক্কা, প্রাণ গেল স্বামী-স্ত্রীর

সব খবর

সম্পাদক : শ্যামল দত্ত

প্রকাশক : সাবের হোসেন চৌধুরী

অনুসরণ করুন

BK Family App