ইমরান খানের ঘাঁটি অবরুদ্ধ করেছে পাকিস্তান, উল্টো হতে পারে ফল
আন্তর্জাতিক ডেস্ক
প্রকাশ: ১৪ অক্টোবর ২০২৬, ০৩:০৫ পিএম
ইমরান খানের মুক্তির দাবিতে হাজার হাজার সমর্থক খাইবার পাখতুনখোয়া প্রদেশজুড়ে কয়েকদিন ধরে সমাবেশ করছে। ছবি: সংগৃহীত
স্কুল বন্ধ, ইন্টারনেট পরিষেবা সীমিত, শিপিং কনটেইনার দিয়ে সড়ক অবরোধ। শহরে মোতায়েন করা হয়েছে সেনাবাহিনী। পাকিস্তানের সাবেক প্রধানমন্ত্রী ইমরান খানের দল পাকিস্তান তেহরিক-ই-ইনসাফের (পিটিআই) শক্ত ঘাঁটি খাইবার পাখতুনখোয়ায় এখন এমনই পরিস্থিতি। সেখানে জরুরি অবস্থা জারির পাশাপাশি স্থগিত করা হয়েছে প্রাদেশিক সরকারের কার্যক্রম।
ইমরান খানের সমর্থক ও পাকিস্তান রাষ্ট্রের মধ্যে চলমান দ্বন্দ্বে এটি নতুন করে উত্তেজনা বাড়িয়েছে। পর্যবেক্ষকদের আশঙ্কা, পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের পরিবর্তে সরকারের এ পদক্ষেপ রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা আরও বাড়িয়ে দিতে পারে।
পাকিস্তানের কেন্দ্রীয় সরকারের দাবি, প্রদেশের জনগণকে সন্ত্রাসবাদের হুমকি থেকে রক্ষা করতেই সংবিধানসম্মতভাবে জরুরি অবস্থা জারি করা হয়েছে। তবে বিরোধীদের অভিযোগ, এর পেছনে রাজনৈতিক উদ্দেশ্য রয়েছে।
গত রোববার কেন্দ্রীয় তথ্যমন্ত্রী আতাউল্লাহ তারার সাংবাদিকদের বলেন, খাইবার পাখতুনখোয়ায় পিটিআই সরকার সন্ত্রাসীদের সঙ্গে আঁতাত করে চলছিল। তবে এ অভিযোগের পক্ষে তিনি বিস্তারিত কোনো তথ্য বা প্রমাণ দেননি। শিগগিরই প্রমাণ হাজির করার প্রতিশ্রুতি দিলেও দুই দিন পর পর্যন্ত এ বিষয়ে নতুন কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি।
এর মধ্যে পেশোয়ারসহ প্রদেশের বেশির ভাগ এলাকায় স্কুল খুলে দেওয়া হয়েছে এবং ইন্টারনেট পরিষেবাও সচল করা হয়েছে। পুলিশ কাউকে আটক করার বিষয়টি নিশ্চিত না করলেও বিক্ষোভ দমনে অভিযান চলছে বলে স্পষ্ট ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে। এ পরিস্থিতিতে পিটিআইয়ের অধিকাংশ নেতা আত্মগোপনে রয়েছেন।
মঙ্গলবার প্রাদেশিক মুখ্যমন্ত্রী সোহেল আফ্রিদির নিজ শহর খাইবার জেলার বারা শহরে পিটিআইয়ের কয়েক ডজন সমর্থক বিক্ষোভ করেন। সেখানে কাঁদানে গ্যাস ছোড়ার খবরও পাওয়া গেছে।
জরুরি অবস্থা জারির নেপথ্যে কী
গত রোববার জরুরি অবস্থা জারির ঘোষণার সময়কে কাকতালীয় বলে মনে করছেন না অনেক পর্যবেক্ষক। এর আগের এক সপ্তাহ ধরে ইমরান খানের মুক্তির দাবিতে খাইবার পাখতুনখোয়ায় মিছিল, সমাবেশ ও পদযাত্রা করেছেন তাঁর হাজারো সমর্থক। প্রদেশটিতে ১৩ বছর ধরে ক্ষমতায় রয়েছে পিটিআই।
লন্ডনভিত্তিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান চ্যাথাম হাউসের সহযোগী ফেলো ফারজানা শেখ মনে করেন, সরকারের ব্যাখ্যায় অসংগতি রয়েছে। তাঁর ভাষায়, এ পদক্ষেপের পক্ষে যে যুক্তি দেওয়া হচ্ছে, তা বেশ কপটতাপূর্ণ শোনাচ্ছে।
সাংবাদিক ও রাজনৈতিক ভাষ্যকার আরিফা নূরও জরুরি অবস্থা জারির সঙ্গে সন্ত্রাসবাদের সরাসরি যোগসূত্র দেখতে পাচ্ছেন না। তাঁর মতে, সাম্প্রতিক লং মার্চই এ সিদ্ধান্তের একমাত্র কারণ কি না, তা নিয়েও সংশয় রয়েছে। তাঁর ধারণা, লং মার্চ হয়তো সরকারের জন্য শেষ ধাক্কা হিসেবে কাজ করেছে। আবার এমনও হতে পারে, বিরোধী দলের হাতে কোনো প্রাদেশিক সরকার থাকুক—কেন্দ্রীয় সরকার তা মেনে নিতে চাইছে না।
এই পদযাত্রার নেতৃত্ব দিয়েছিলেন মুখ্যমন্ত্রী সোহেল আফ্রিদি। তবে বর্তমানে তাঁর অবস্থান নিয়ে অনিশ্চয়তা রয়েছে। পিটিআইয়ের দাবি, তাঁকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। অন্যদিকে, সরকারের বক্তব্য, তিনি সুরক্ষামূলক হেফাজতে রয়েছেন।
ইমরান খানের পরিবার ও সমর্থকদের ওপর চাপ
লং মার্চ শুরুর আগেই পিটিআইয়ের নেতাকর্মী ও সমর্থকদের বিরুদ্ধে দমন-পীড়ন শুরু হয়েছিল। গত সেপ্টেম্বর মাসে ইমরান খানের তিন বোনকে সমর্থকদের সংগঠিত করাসহ বিভিন্ন অভিযোগে গ্রেপ্তার করা হয়। এরপর থেকে তাঁরা আটক রয়েছেন।
গত এক বছরে পরিবারের সদস্য ও আইনজীবীদের সঙ্গে ইমরান খানের সাক্ষাতের সুযোগ ছিল সীমিত। গত আগস্টে তাঁর দুই বোন কারাগারে গিয়ে তাঁর সঙ্গে দেখা করেছিলেন। তাঁদের একজন কারাগারেই ইমরানের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। অন্যজন তাঁর সঙ্গে দেখা করেন সুপ্রিম কোর্ট তাঁর স্বাস্থ্য নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশের পর তাঁকে হাসপাতালে স্বাস্থ্য পরীক্ষার জন্য নেওয়া হলে।
আরও পড়ুন: সৌদির রাষ্ট্রীয় তেল কোম্পানিতে হুথিদের বড় হামলা
পরীক্ষা শেষে ইমরান খানকে আবার কারাগারে পাঠানো হয়। ২০২৩ সালের আগস্ট থেকে তিনি বন্দি রয়েছেন।
পাকিস্তানের শক্তিশালী সামরিক বাহিনীর সঙ্গে মতবিরোধের জেরে ইমরান খান ক্ষমতা হারিয়েছেন বলে ব্যাপকভাবে মনে করা হয়। দুর্নীতির একাধিক মামলায় দোষী সাব্যস্ত হয়েছেন তিনি। তবে এসব মামলাকে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলে দাবি করে আসছেন সাবেক এই প্রধানমন্ত্রী।
কেন কঠোর অবস্থানে সরকার
পিটিআই ইতিমধ্যে রাজনৈতিকভাবে দুর্বল হয়ে পড়লেও সরকার কেন এমন কঠোর পদক্ষেপ নিল, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
আটলান্টিক কাউন্সিলের দক্ষিণ এশিয়াবিষয়ক জ্যেষ্ঠ ফেলো মাইকেল কুগেলম্যানের মতে, ইমরান খানের স্বাস্থ্য নিয়ে উদ্বেগ বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে সাম্প্রতিক মাসগুলোতে পিটিআইয়ের তৃণমূল পর্যায়ের নেতাকর্মী ও সমর্থকদের মধ্যে অস্থিরতাও বেড়েছে।
তিনি মনে করেন, পিটিআইকে কঠোর বার্তা দেওয়া এবং সরকারের ওপর চাপ সৃষ্টি করার সক্ষমতা সীমিত করতেই এমন পদক্ষেপ নেওয়া হয়ে থাকতে পারে।

সরকার অবশ্য জরুরি অবস্থা জারির পেছনে রাজনৈতিক উদ্দেশ্য থাকার অভিযোগ অস্বীকার করেছে। তথ্যমন্ত্রী তারার বলেছেন, এ সিদ্ধান্তের কোনো রাজনৈতিক এজেন্ডা বা উদ্দেশ্য ছিল না। পিটিআই চাইলে তাদের পদযাত্রা ও মিছিল চালিয়ে যেতে পারত বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে দুই পক্ষের মধ্যে আলোচনা হয়েছিল উল্লেখ করে তারার দাবি করেন, এটি আলোচনার মাধ্যমে সমাধান খোঁজার চেষ্টারই ইঙ্গিত।
তবে বিরোধী পক্ষ ও পর্যবেক্ষকদের একটি অংশ মনে করছে, ইমরান খান ও তাঁর দলকে আরও কোণঠাসা করার প্রচেষ্টা হিসেবেই এ পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে।
আরিফা নূরের মতে, পাকিস্তান সরকারের কাছে ভিন্নমত প্রকাশের সুযোগ ক্রমেই সংকুচিত হচ্ছে। তাঁর ভাষ্য, সরকার সংঘাতের পরিস্থিতি আলোচনার মাধ্যমে সমাধান করতে আগ্রহী নয়।
ইসলামাবাদভিত্তিক লেখক ও প্রতিরক্ষা বিশ্লেষক জাহিদ হুসেনের মতে, দেশটির ক্ষমতার ভারসাম্য এখন পুরোপুরি সামরিক প্রতিষ্ঠানের দিকে ঝুঁকে গেছে।
ফারজানা শেখ মনে করেন, যুক্তরাষ্ট্রের হোয়াইট হাউসের সঙ্গে ভালো সম্পর্ক এবং যুক্তরাষ্ট্র-ইরান শান্তি আলোচনায় পাকিস্তানের ভূমিকার কারণে সামরিক বাহিনী আন্তর্জাতিক অঙ্গনে নিজেদের অবস্থান নিয়ে আত্মবিশ্বাসী হয়ে উঠেছে। তাঁর মতে, এই পরিস্থিতিকে নিজেদের পক্ষে কাজে লাগানোর সুযোগ হিসেবে দেখছে তারা।
সন্ত্রাসবাদ ও আঞ্চলিক সংঘাতের চাপ
রাজনৈতিক সংকটের পাশাপাশি পাকিস্তানকে আরও কয়েকটি বড় চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে হচ্ছে। দেশটিতে জঙ্গিবাদ বাড়ছে। ‘গ্লোবাল টেররিজম ইনডেক্স ২০২৬’-এ সন্ত্রাসবাদের কারণে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত দেশ হিসেবে পাকিস্তান শীর্ষে ছিল।
প্রতিবেশী দুই দেশ আফগানিস্তান ও ভারতের সঙ্গেও পাকিস্তানের সম্পর্ক উত্তেজনাপূর্ণ। আফগান তালেবান সরকারের বিরুদ্ধে জঙ্গিগোষ্ঠীগুলোকে আশ্রয় দেওয়ার অভিযোগ তুলে পাকিস্তান একাধিকবার আফগানিস্তানে বিমান হামলা চালিয়েছে। তবে তালেবান সরকার এ অভিযোগ অস্বীকার করেছে।
অন্যদিকে, ভারতের সঙ্গে পাকিস্তানের দীর্ঘদিনের বিরোধ নতুন করে সংঘাতে রূপ নেওয়ার আশঙ্কাও রয়েছে। এ পরিস্থিতিতে হুথিদের সঙ্গে সংঘাত ক্রমেই বিপজ্জনক হয়ে ওঠায় সৌদি আরবকে হামলা থেকে আত্মরক্ষায় সহায়তার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে পাকিস্তান।
এমন বহুমুখী সংকটের মধ্যে খাইবার পাখতুনখোয়ায় জরুরি অবস্থা জারি নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি করতে পারে বলে সতর্ক করছেন বিশ্লেষকেরা। তাঁদের মতে, প্রাদেশিক সরকারকে স্থগিত করার ফলে ইসলামাবাদকে সরাসরি ওই অঞ্চলের দায়িত্ব নিতে হবে। এতে কেন্দ্রীয় সরকারের ওপর চাপ আরও বাড়তে পারে।
মাইকেল কুগেলম্যানের আশঙ্কা, এ সিদ্ধান্ত হিতে বিপরীত হতে পারে। তাঁর মতে, পদক্ষেপটি প্রদেশের মানুষের মধ্যে ক্ষোভ ও অসন্তোষ বাড়িয়ে দিলে সরকার বড় ধরনের সংকটে পড়তে পারে।
জাহিদ হুসেনও একে বেপরোয়া পদক্ষেপ বলে মনে করেন। তাঁর আশঙ্কা, পাকিস্তানের বর্তমান পরিস্থিতিতে এমন সিদ্ধান্ত আরও অস্থিতিশীলতা তৈরি করতে পারে। একই সঙ্গে ভবিষ্যতে দেশের অন্যান্য অঞ্চলেই এ ধরনের ক্ষমতা প্রয়োগের প্রবণতা দেখা দিতে পারে।
সামরিক অভিযানের ঝুঁকিও কম নয়
সন্ত্রাসবাদ দমনে আরও সক্রিয় সামরিক অভিযান চালানোরও ঝুঁকি রয়েছে বলে মনে করেন ফারজানা শেখ। তাঁর মতে, এমন অভিযান শুরু হলে সশস্ত্র বাহিনীর সদস্যদের হতাহতের ঘটনা ঘটতে পারে। হতাহতের সংখ্যা উল্লেখযোগ্য হলে সামরিক প্রতিষ্ঠানের ভেতরেও প্রশ্ন উঠতে পারে।
পাকিস্তানের ইতিহাসে সামরিক অভ্যুত্থানের একাধিক নজির রয়েছে। অতীতে প্রাদেশিক কিংবা জাতীয় পর্যায়ে নির্বাচিত সরকারকে ক্ষমতাচ্যুত করার প্রচেষ্টা দেশটির রাজনীতিতে তিক্ত পরিণতি ডেকে এনেছে।
আরিফা নূরের মতে, কেন্দ্রীয় সরকারে থাকা পাকিস্তান মুসলিম লীগ-নওয়াজের (পিএমএল-এন) শীর্ষ নেতারাও বুঝতে পারছেন, বর্তমান পরিস্থিতির কিছু সিদ্ধান্ত ভবিষ্যতে তাঁদের জন্য বিপদ তৈরি করতে পারে। একইভাবে পিটিআইও হয়তো বুঝতে পারছে, শুধু বিক্ষোভ করে ইমরান খানকে মুক্ত করা সম্ভব নয়।
পাকিস্তানের বর্তমান সংকটের সবচেয়ে হতাশাজনক দিক তুলে ধরে নূর বলেন, সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলো পরিস্থিতির সম্ভাব্য পরিণতি সম্পর্কে সচেতন হলেও তা থামানোর কার্যকর উদ্যোগ দেখা যাচ্ছে না। তাঁর আশঙ্কা, দেশটি এমন এক সংকটের দিকে এগোচ্ছে, যার পরিণতি সম্পর্কে সবাই কিছুটা ধারণা রাখলেও পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনা কঠিন হয়ে পড়ছে।
সূত্র: বিবিসি।
