পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রে পরীক্ষামূলক উৎপাদনে ত্রুটি, সাময়িক শাটডাউন
ঈশ্বরদী (পাবনা) প্রতিনিধি
প্রকাশ: ১৪ জুন ২০২৬, ০৮:২৮ পিএম
ফাইল ছবি
রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের প্রথম ইউনিটে জ্বালানি লোডিংয়ের (ফুয়েল লোডিং) পর পরীক্ষামূলক উৎপাদন চালাতে গিয়ে কারিগরি ত্রুটি শনাক্ত হয়েছে। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে বিদ্যুৎকেন্দ্রের উৎপাদন প্রক্রিয়া সাময়িকভাবে বন্ধ (শাটডাউন) করতে বাধ্য হয় কর্তৃপক্ষ। আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থার (আইএইএ) উচ্চপর্যায়ের একটি প্রতিনিধিদলের রূপপুর পরিদর্শনকালেই এই ঘটনা ঘটে।
এ প্রসঙ্গে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি সচিব মো. আনোয়ার হোসেন সাংবাদিকদের জানান, শুক্রবার রাতে প্রথম ইউনিটের সিস্টেমে চাপ (প্রেশার) দেওয়ার পর একটি সামান্য ত্রুটি ধরা পড়ে। এটি বড় কোনো বিপর্যয় নয় এবং দ্রুতই এর সমাধান সম্ভব হবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।
প্রকল্পের একজন শীর্ষ কর্মকর্তা জানান, পরীক্ষা চলাকালে প্রকৌশলীরা প্রথম ইউনিটের তিনটি ভিন্ন স্থানে ছোট আকারের ছিদ্র (মাইনর হোলস) বা ত্রুটি শনাক্ত করেন। এরপরই ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে পরবর্তী পরীক্ষা স্থগিত রেখে সমস্যাগুলো আগে সমাধানের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এর আগেও সেখানে এমন ত্রুটি দেখা গিয়েছিল জানিয়ে তিনি বলেন, বিষয়টি ছোট হলেও এর গুরুত্ব ও ক্ষতির পরিধি বিবেচনা করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।
উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধিদলে থাকা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক শফিকুল ইসলাম বলেন, যেকোনো পারমাণবিক কেন্দ্রে ছোটখাটো কারিগরি ত্রুটি বা নিরাপত্তাজনিত শঙ্কা দেখা দিলে প্ল্যান্ট শাটডাউন করা একটি স্বাভাবিক নিয়ম। পরীক্ষামূলক উৎপাদনের শুরুতেই এমন কিছু শনাক্ত হয়েছে, তবে একে বড় সমস্যা বলা যাবে না।
এদিকে রূপপুরে অবস্থানরত আইএইএ সদস্যরা জানান, কেন্দ্র নির্মাণ ও পরিচালনায় তাঁরা পরিদর্শকের ভূমিকা পালন করলেও এর চূড়ান্ত নিয়ন্ত্রণ ও রেগুলেটরি ক্ষমতা সংশ্লিষ্ট দেশের হাতেই থাকে। আইএইএ মূলত কারিগরি সহযোগিতা দিয়ে থাকে।
এর আগে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয় এবং বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি কমিশনের যৌথ উদ্যোগে ‘নিউক্লিয়ার এনার্জি: স্ট্র্যাটেজিক রিয়েলিটিজ অ্যান্ড বাংলাদেশ পাথ ফরোয়ার্ড’ শীর্ষক দুই দিনের একটি কৌশলগত আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হয়। সেখানে আইএইএ বিশেষজ্ঞ, সংসদ সদস্য, ব্যবসায়ী ও সুশীল সমাজের প্রতিনিধিদের সামনে প্রকল্পের অগ্রগতি ও নিরাপত্তা ব্যবস্থা তুলে ধরা হয়।
অনুষ্ঠানে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রী ফকির মাহবুব আনাম বলেন, বিদ্যুৎকেন্দ্রের সার্বিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করাই সরকারের প্রধান লক্ষ্য। অন্য জ্বালানির তুলনায় এখান থেকে দীর্ঘমেয়াদে কম খরচে বিদ্যুৎ পাওয়া যাবে। প্রথম প্রকল্পের চূড়ান্ত সফলতার ওপর ভিত্তি করে সরকার আরও দুটি নতুন ইউনিট স্থাপনের পরিকল্পনা করছে বলেও তিনি জানান।
কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, রিখটার স্কেলে ৮ মাত্রার ভূমিকম্প কিংবা সুনামির মতো প্রাকৃতিক দুর্যোগেও যেন কেন্দ্রটি অক্ষত থাকে, সেজন্য প্রায় ১ বিলিয়ন ডলারের নিরাপত্তা বিনিয়োগ করা হয়েছে। নিউক্লিয়ার পাওয়ার প্ল্যান্ট কোম্পানি বাংলাদেশ লিমিটেডের (এনপিসিবিএল) ব্যবস্থাপনা পরিচালক ড. মো. জাহিদুল হাসান দাবি করেন, এখানে বড় ধরনের দুর্ঘটনার আশঙ্কা নেই বললেই চলে, যা অঙ্কের হিসাবে দশ লাখে মাত্র একবার হতে পারে।
উল্লেখ্য, ২ হাজার ৪০০ মেগাওয়াট মোট উৎপাদন ক্ষমতার এই প্রকল্পের প্রথম ইউনিটে গত ২৮ এপ্রিল জ্বালানি লোডিং সম্পন্ন হয়। আগামী আগস্টের মাঝামাঝি সময়ে এই কেন্দ্র থেকে পরীক্ষামূলকভাবে ৩০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে যুক্ত হওয়ার কথা রয়েছে। এরপর ২০২৭ সালের জানুয়ারিতে প্রথম ইউনিট থেকে পূর্ণাঙ্গভাবে ১ হাজার ১০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ সরবরাহ শুরু হবে। একই বছরের জুনে দ্বিতীয় ইউনিটে জ্বালানি ভরার কাজ শুরু হবে এবং সেপ্টেম্বর নাগাদ দুটি ইউনিট থেকে মোট ২ হাজার ২০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে যুক্ত করা সম্ভব হবে।
