ফ্যাক্টচেক
সৌদি আরবে মৃত্যুদণ্ড: নজরুল-সুইটির নামে ছড়ানো ভিডিওটি কি আসল?
কাগজ ডেস্ক
প্রকাশ: ২২ অক্টোবর ২০২৬, ১০:১৯ পিএম
ছবি: ভিডিও থেকে নেওয়া স্ক্রিনশট
সৌদি আরবে দুই বাংলাদেশির মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের ঘটনাটি এখন আলোচনার বড় বিষয়। তাদের বিষয়ে আনুষ্ঠানিক কোনো তথ্য এখনো মেলেনি, কিন্তু তথ্য ছড়ানো বন্ধ নেই। সেই তথ্যের ভিড়ে একটি ভিডিও ছড়াচ্ছে এখন ফেসবুকে।
দাবি করা হচ্ছে, এই ভিডিও দেখেই অনৈতিক কর্মকাণ্ডের অভিযোগে গ্রেপ্তার হন এই দুই বাংলাদেশি নারী-পুরুষ। তারপর বিচারের পর গত ১৪ অক্টোবর কার্যকর হয় মৃত্যুদণ্ডাদেশ। কিন্তু যাচাই করে ভিডিওটির সত্যতা নিয়ে নিশ্চিত হওয়া যাচ্ছে না। ভিডিওটি কৃত্রিমভাবে তৈরি হওয়ার সম্ভাবনাই বেশি দেখা যাচ্ছে।
গত ১৫ অক্টোবর সৌদি আরবের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বরাতে দেশটির সংবাদমাধ্যমে তার এক দিন আগে দুই বাংলাদেশির মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের খবরটি আসে। সংবাদ প্রতিবেদনে দুজনের নাম বলা হয়েছিল- নাজেরুল ইসলাম আবদুল বাসির ও সিতি আখতার।
পরে বাংলাদেশের জনশক্তি কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরোর (বিএমইটি) বহির্গমন ছাড়পত্র ও জাতীয় পরিচয়পত্রের তথ্য যাচাই করে নাম দুটি পাওয়া যায় নজরুল ইসলাম ও সুইটি আক্তার।
সুইটির বাড়ি টাঙ্গাইলের মির্জাপুর উপজেলার মহেড়া ইউনিয়নে। নজরুলের বাড়ি ব্রাহ্মণবাড়িয়ার সদর উপজেলার সুলতানপুর ইউনিয়নের বিরামপুর গ্রামে। তারা দুজনই পরিচ্ছন্নতাকর্মীর কাজ নিয়ে গিয়েছিলেন মধ্যপ্রাচ্যের দেশটিতে।
কী ভিডিও ছড়াচ্ছে?
ফেসবুকের ‘Rajonyo Ruhani’ নামের একটি আইডি থেকে আজ বৃহস্পতিবার ৫৬ সেকেন্ডের ভিডিওটি পোস্ট করা হয়। তার ক্যাপশানে লেখা— ‘প্রবাসী নজরুল-সিঁথির সেদিনের সেই ভিডিও, যা দেখে তাদের মৃ'ত্যু'দ'ণ্ড দেওয়া হয়েছে’।
ভিডিওতে দেখা যায়, সাদা রঙের হিজাব মাথায় নীল পোশাকে আবছা এক নারী এবং নীল পোশাকের একজন পুরুষকে সাদা রঙের কোনো বিছানা বা সোফাসদৃশ স্থানে আলিঙ্গনরত। রাতে প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত ভিডিওটি দেখা হয় ৭০ হাজার বার। এটি ৭২ বার শেয়ার হয় এবং এতে ৭১০টি প্রতিক্রিয়া পড়ে।
যাচাইয়ে যা মিলছে
ভিডিওটি অনেকে সত্য ভাবলেও কেউ কেউ আবাার সন্দিহান। এটি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা দিয়ে তৈরি, এমন কমেন্টও পাওয়া যাচ্ছে পোস্টটিতে। ভিডিওটি থেকে কি-ফ্রেম নিয়ে রিভার্স সার্চ করে মূলধারার কোনো সংবাদমাধ্যমে এমন কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি।
ভিডিও থেকে স্ক্রিনশট নিয়ে এআই শনাক্তকরণ টুলসে যাচাই করা হলে পাঁচটি ফরেনসিক এআই ডিটেক্টরের মধ্যে তিনটি নিশ্চিত করেছে যে এটি এআই দিয়ে তৈরি। Sparse-ViT মডেল ছবির মূল ব্যক্তির চারপাশে ১০০% ফ্রিকোয়েন্সি অসঙ্গতি এবং B-Free মডেল ৯৯% কৃত্রিম ভিজুয়াল প্যাটার্ন শনাক্ত করেছে।
বাস্তব ক্যামেরায় ছবি তুললে তাতে ক্যামেরা মডেল, অ্যাপারচার ও সময়ের মতো মেটাডেটা (EXIF) থাকে। এই ছবিতে কোনো মেটাডেটা নেই। HiFi-Net++ মডেল দেখিয়েছে, এটি ফটোশপ বা সাধারণ সম্পাদনা করে তৈরি করা ছবি নয়, বরং এটি পুরোপুরি নতুন করে জেনারেট করা এআই ইমেজ।
এআই শনাক্তকরণ টুলের বিশ্লেষণে ভিডিওটিতে কৃত্রিমতা বা এআই (AI) ব্যবহারের আলামত পাওয়া গেছে। এনভিডিয়াভিত্তিক ডিপফেক শনাক্তকরণ মডেলে ভিডিওটির 'সিন্থেটিক স্কোর' এসেছে ৭৭.৯% (যেখানে ৩০%-এর বেশি হলে ভিডিওটিকে এআই-জেনারেটেড হিসেবে গণ্য করা হয়)।
অন্যদিকে, ফেস-সোয়াপ বা মুখাবয়ব পরিবর্তনের সম্ভাবনা যাচাইকারী মডেলে মাঝারি ধরনের আলামত মিললেও শুধু মুখের অংশ পরিবর্তন করা হয়েছে কি না—সে বিষয়ে শতভাগ নিশ্চিত হওয়ার জন্য পর্যাপ্ত প্রমাণ পাওয়া যায়নি। তবে সব মিলিয়ে দেখা যাচ্ছে, ভিডিওটি কৃত্রিমভাবে তৈরির সম্ভাবনা অনেক বেশি।
নজরুল ও সুইটিকে নিয়ে এর আগে নানা বিভ্রান্তিকর তথ্যও ছড়িয়েছে। সুইটির যে ছবি ফেসবুকে এসেছিল, তা সত্য নয় বলে তার পরিবার নিশ্চিত করে।
আবার বাংলাদেশি এ দুজন বিবাহিত এবং তারা ওমরাহ পালনে সৌদি আরব গিয়েছিলেন বলে তথ্যও ছড়ানো হয়েছিল, যা সঠিক নয় বলে পরে প্রমাণিত হয়। অনৈতিক কর্মকাণ্ডের দায়ে তাদের মৃত্যুদণ্ড হলেও তারা আসলে কী করেছিলেন, সেই তথ্যও এখনো বাংলাদেশ সরকার জানতে পারেনি।
যে দুজনের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হয়েছে, তাদের বিষয়ে পূর্ণাঙ্গ তথ্য চেয়ে এরই মধ্যে সৌদি আরব সরকারের কাছে বাংলাদেশ মিশনের পক্ষ থেকে আবেদন করা হয়েছে।
সূত্র: আগামীর সময়
