প্রিয়জনকে বিয়ের জন্য লিঙ্গ পরিবর্তন, তরুণীর মৃত্যু
কাগজ ডেস্ক
প্রকাশ: ০৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৬:২৭ পিএম
ছবি: সংগৃহীত
স্বপ্ন ছিল নিজের পরিচয় বদলে পুরুষ হয়ে ভালোবাসার মানুষটিকে আজীবনের জন্য আপন করে নেওয়ার। সেই ভালোবাসাকে পূর্ণতা দিতেই অস্ত্রোপচারের টেবিলে জীবন বাজানো বাজি ধরেছিলেন ৩১ বছর বয়সী তরুণী রোজি আক্তার লিজা। কিন্তু ভাগ্যে লিখা ছিল ভিন্ন কিছু।
যে ভালোবাসার জন্য তিনি এত বড় ঝুঁকি নিয়েছিলেন, অস্ত্রোপচারের মাত্র কয়েক ঘণ্টার মাথায় তার মৃত্যু হয়েছে।
রোববার (৬ সেপ্টম্বর) ভোর সাড়ে ৪টায় ঢাকার পান্থপথ গ্রীণ রোডের ইউনিহেলথ স্পেশালাইজড হাসপাতালে লিজার মৃত্যু হয়।
নিহত লিজা বরিশালের গৌরনদী উপজেলার বাসিন্দা।
এর আগে, গত শনিবার বিকেলে তার অস্ত্রোপচার সম্পন্ন হয়। পরবর্তীতে স্বজনেরা তার মরদেহ বাড়িতে নিয়ে আসলে এলাকায় ব্যাপক চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়। পরিস্থিতি সামাল দিতে ওই দিনই তড়িঘড়ি করে সন্ধ্যার মধ্যে লিজার দাফন শেষ করা হয়।
আরো পড়ুন: ঝটিকা মিছিলের চেষ্টা, ধরা খেলো নিষিদ্ধ ছাত্রলীগের ৪ কর্মী
স্থানীয় বাসিন্দা ও পরিবার সূত্রে জানা যায়, লিজা নারী হলেও তার পোশাক ও চালচলন ছিল পুরুষালী। চুলও কাটতেন ছেলেদের মতো। তার বাড়িতে ঢাকার যাত্রাবাড়ী এলাকার জেমিনি ওরফে জেনিফা আক্তার নামে এক তরুণীর নিয়মিত আসা-যাওয়া ছিল, যাকে লিজা নিজের স্ত্রী হিসেবেই গণ্য করতেন। প্রতিবেশীদের ধারণা, তাদের মধ্যে সমকামী প্রেমের সম্পর্ক গড়ে উঠেছিল।
জানা যায়, প্রায় তিন বছর আগে লিজা নিজের ভাবিকে নিয়েও একইভাবে আত্মগোপন করেছিলেন, যদিও পরে তারা আবার ফিরে আসেন। পরবর্তীতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের সূত্রে জেনিফার সঙ্গে লিজার ঘনিষ্ঠতা হয়। এরপর থেকে জেনিফা নিয়মিত লিজার বাড়িতে এসে দীর্ঘ সময় এক ছাদের নিচে বসবাস করছিলেন।
জেমিনি ওরফে জেনিফা আক্তারের ভাষ্যমতে, ‘তারা একে অপরের বাসায় বেড়াতেন। একসঙ্গে থাকতেন। লিজা ঢাকায় হরমোনের চিকিৎসা করাতেন। লিজার মা, বাবা ও বোন অস্ত্রোপচারের জন্য দেড় লাখ টাকা দিয়েছেন। ওই টাকা দিয়ে ৩ সেপ্টেম্বর ঢাকার পান্থপথের ইউনিহেলথ স্পেশাইলজড হাসপাতালে সরফরাজ নাম দিয়ে লিজাকে ভর্তি করা হয়। সেখানে অস্ত্রোপচারের আগে সম্মতিপত্রে লিজার স্ত্রী হিসেবে তিনি (জেনিফা) সই করেন।’
মেয়ে হয়ে আরেকজন মেয়ের স্ত্রী পরিচয়ে সম্মতিপত্রে সইয়ের বিষয়ে জেনিফা দাবি করেন, ‘লিজার মা ও বাবার সম্মতি নিয়ে সই করা হয়েছে।’
তবে মৃত রোজীর বাবা বলেন, ‘সে (জেনিফা) যে সই করবে, তার সইয়ে যে অপারেশন হবে; সে বিষয়ে আমি কিছুই জানি না। এমনকি লিজার নাম যে সরফরাজ রাখা হয়েছে তা আজই কেবল জেনেছি।’
তিনি আরও বলেন, ‘লিজা অপারেশন করে পুরুষ হয়ে জেনিফাকে বিয়ে করবে, এমনটা ওর (লিজা) মায়ের কাছে শুনেছি।’
এ বিষয়ে লিজার মা বলেন, ‘আমার মেয়ে লিজা ছোটবেলা থেকেই কোনো ছেলেকে পছন্দ করতো না। তাকে জোর করে দুইবার বিয়ে দেওয়া হয়েছিল। কোনোখানেই সে (লিজা) সংসার করেনি। ছেলেদের সঙ্গে সঙ্গ দেওয়া কিংবা ঘর সংসার করার কোনো মনমানসিকতাই তার ছিল না।’
আরো পড়ুন: বাবা ও ছেলের নিয়ন্ত্রণে ইউনিয়ন ভূমি অফিস
তিনি আরও বলেন, ‘দীর্ঘদিন ধরে জেনিফা আমাদের বাড়িতে এসে লিজার ঘনিষ্ঠ বান্ধবী হিসেবে বেড়াতো। যে কারণে লিজার অপারেশনের দায়িত্ব আমরা জেনিফার ওপর ছেড়ে দিয়েছিলাম।’
এ ধরনের কর্মকাণ্ড ইসলাম সমর্থন করে কি-না জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘ইসলাম সমর্থন করে না জানি। তবে মোবাইলে এসব ঘটনা এখন শত শত দেখা যায়।’
অন্যদিকে, ইউনিহেলথ স্পেশালাইজড হাসপাতালের দেওয়া মৃত্যু সনদে উল্লেখ করা হয়েছে, ৩ সেপ্টেম্বর লিজাকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। তবে ওই সনদে লিজার নাম ‘সরফরাজ’ এবং লিঙ্গ ‘পুরুষ’ হিসেবে লেখা হয়েছে।
বিষয়টি নিয়ে জানতে মৃত্যু সনদে থাকা হাসপাতালের নম্বরে যোগাযোগ করা হলে লিমন নামে এক ব্যক্তি নিজেকে হাসপাতালের অ্যাডমিন হিসেবে পরিচয় দেন। এ বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি হাসপাতালের জিএমের সঙ্গে কথা বলার পরামর্শ দেন।
পরে হাসপাতালের জিএম বিশ্বজিত বৈদ্যের সঙ্গে যোগাযোগ করে বিষয়টি জানতে চাওয়া হলে তিনি রোগীর ভর্তি-সংক্রান্ত চিকিৎসকের সঙ্গে কথা বলতে বলেন।
এরপর সংশ্লিষ্ট চিকিৎসক মাহমুদুল হাসানের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি ব্যস্ততার কথা জানিয়ে পরে ফোন করবেন বলে কলটি কেটে দেন। পরবর্তীতে একাধিকবার তার মুঠোফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন ধরেননি।
