ঢাকায় ভারতীয় রাজনীতিক হাইকমিশনার, প্রথা ভাঙার নেপথ্যে যে কারণ
কাগজ ডেস্ক
প্রকাশ: ২৮ এপ্রিল ২০২৬, ১১:৫৫ এএম
সাবেক কেন্দ্রীয় রেলমন্ত্রী ও বিজেপি নেতা দীনেশ ত্রিবেদী। ছবি : সংগৃহীত
ভারত-বাংলাদেশ কূটনৈতিক সম্পর্কের দীর্ঘদিনের প্রচলিত ধারা থেকে সরে এসে নতুন কৌশল গ্রহণ করেছে নরেন্দ্র মোদি সরকার। এতদিন ঢাকায় হাইকমিশনার হিসেবে পেশাদার কূটনীতিকদেরই নিয়োগ দেওয়া হলেও এবার সেই প্রথা ভেঙে একজন অভিজ্ঞ রাজনীতিককে পাঠানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে নয়াদিল্লি।
সাবেক কেন্দ্রীয় রেলমন্ত্রী ও বিজেপি নেতা দীনেশ ত্রিবেদীকে বাংলাদেশে ভারতের প্রথম রাজনৈতিক নিয়োগপ্রাপ্ত হাইকমিশনার হিসেবে পাঠানোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। এই পদক্ষেপকে কেবল ব্যক্তিগত পরিবর্তন নয়, বরং ঢাকার বর্তমান রাজনৈতিক বাস্তবতায় ভারতের পররাষ্ট্রনীতির একটি বড় ধরনের দিক পরিবর্তন হিসেবে দেখছেন বিশ্লেষকরা।
কেন এই পরিবর্তন?
ভারতের পররাষ্ট্র ক্যাডারের জন্য ঢাকার পোস্টিং সবসময়ই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে বিবেচিত হয়ে এসেছে। অতীতে হর্ষবর্ধন শ্রিংলা বা বিক্রম দোরাইস্বামীর মতো অভিজ্ঞ কূটনীতিকরা সফলভাবে দায়িত্ব পালন করেছেন। তবে এখন দিল্লির নীতিনির্ধারকদের একটি অংশ মনে করছে, পেশাদার কূটনীতিকরা অনেক সময় প্রথাগত প্রোটোকল ও আমলাতান্ত্রিক কাঠামোর কারণে মাঠপর্যায়ের রাজনৈতিক বাস্তবতা পুরোপুরি ধরতে পারেন না।
বিশেষ করে, সাম্প্রতিক নির্বাচনে বিএনপি ক্ষমতায় আসার পর বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে যে পরিবর্তন এসেছে, তা উপলব্ধিতে কিছু সীমাবদ্ধতা ছিল বলে মনে করছে দিল্লি। এ কারণেই সরাসরি রাজনৈতিক অভিজ্ঞতাসম্পন্ন একজন ব্যক্তিকে দায়িত্ব দেওয়াকে সময়োপযোগী সিদ্ধান্ত হিসেবে দেখা হচ্ছে।
আওয়ামী লীগ-পরবর্তী বাস্তবতা
দীর্ঘ সময় আওয়ামী লীগ সরকারের সঙ্গে ভারতের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক ছিল। ফলে বাংলাদেশের একটি বড় অংশের মধ্যে এমন ধারণা তৈরি হয়েছিল যে, ভারত কেবল একটি নির্দিষ্ট রাজনৈতিক দলের সঙ্গে সম্পর্ক রাখে। বর্তমান প্রেক্ষাপটে দিল্লি সেই ধারণা বদলাতে চায়। বিএনপি সরকারের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়নের মাধ্যমে ভারত বোঝাতে চাইছে যে, তারা বাংলাদেশের রাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্ককে গুরুত্ব দেয়, কোনো একক দলের সঙ্গে নয়।
দীনেশ ত্রিবেদীর মতো একজন রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব ঢাকায় দায়িত্ব নিলে সরাসরি রাজনৈতিক যোগাযোগ বাড়বে এবং পারস্পরিক অবিশ্বাস কমাতে সহায়তা করবে বলে মনে করা হচ্ছে। এটি ভারতের ‘নেইবারহুড ফার্স্ট’ নীতিরই একটি অংশ।
আরো পড়ুন : কে এই দীনেশ ত্রিবেদী
পশ্চিমবঙ্গ ফ্যাক্টর
ত্রিবেদীর নিয়োগের পেছনে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো তার ভৌগোলিক ও সাংস্কৃতিক পটভূমি। পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত থাকার কারণে তিনি বাংলা ভাষা ও সংস্কৃতির সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে পরিচিত।
তিস্তা পানি বণ্টন বা সীমান্ত সংক্রান্ত ইস্যুর মতো স্পর্শকাতর বিষয়গুলোতে পশ্চিমবঙ্গের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। ত্রিবেদী তৃণমূল কংগ্রেস ও বিজেপি—উভয় দলের অভ্যন্তরীণ রাজনীতির অভিজ্ঞতা থাকার কারণে দিল্লি ও কলকাতার মধ্যে কার্যকর সেতুবন্ধন তৈরি করতে পারবেন, যা আগে কূটনীতিকদের পক্ষে সবসময় সহজ ছিল না।
রাজনৈতিক নিয়োগের নজির
ভারতের ইতিহাসে গুরুত্বপূর্ণ কূটনৈতিক মুহূর্তে রাজনৈতিক নিয়োগের উদাহরণ রয়েছে। ১৯৯০ সালে নেপালের সঙ্গে সম্পর্ক সংকটে পড়লে জেনারেল এস কে সিনহাকে পাঠানো হয়েছিল। শ্রীলঙ্কার ক্ষেত্রেও অতীতে এমন নিয়োগ দেখা গেছে। এসব উদাহরণ ইঙ্গিত দেয়, বিশেষ পরিস্থিতিতে দিল্লি কৌশলগতভাবে রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বকে কূটনৈতিক দায়িত্বে পাঠায়। বাংলাদেশের ক্ষেত্রে এই প্রথম এমন পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে, যা ঢাকাকে ভারতের পররাষ্ট্রনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হিসেবে তুলে ধরে।
ত্রিবেদীর সামনে চ্যালেঞ্জ
দীনেশ ত্রিবেদীর প্রধান চ্যালেঞ্জ হবে বাংলাদেশে ভারতের প্রতি থাকা নেতিবাচক ধারণা কমানো। একজন রাজনীতিবিদ হিসেবে তাকে জনসমক্ষে এসে ইতিবাচক বার্তা পৌঁছে দিতে হবে, যা পেশাদার কূটনীতিকদের তুলনায় ভিন্নধর্মী দায়িত্ব।
এছাড়া নিরাপত্তা ও আঞ্চলিক ইস্যুগুলো, যেমন উগ্রবাদ বা সীমান্তসংক্রান্ত উদ্বেগ নিয়ে আলোচনায় তার রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। ত্রিবেদীর এই নিয়োগের মাধ্যমে ভারত স্পষ্ট বার্তা দিচ্ছে যে, তারা বাংলাদেশের সঙ্গে সম্পর্ককে নতুনভাবে সক্রিয় রাজনৈতিক সম্পৃক্ততার মাধ্যমে এগিয়ে নিতে চায়। এখন দেখার বিষয়, এই নতুন কৌশল ঢাকা-দিল্লি সম্পর্ককে কোন দিকে নিয়ে যায়।
