নিজেদের দুর্গেই পতন, এটাই কি শেষ মমতা-স্তালিনের?
কাগজ ডেস্ক
প্রকাশ: ০৫ মে ২০২৬, ০১:২৪ পিএম
ছবি : সংগৃহীত
নিজেদের উঠোনেই মার খেয়েছেন তাঁরা। বছরের পর বছর ধরে যাঁরা ছিলেন অদম্য, অপরাজেয় ও আত্মবিশ্বাসী তাঁদেরই রাজনৈতিক দুর্গ ভেঙে পড়ে সোমবার (৪ মে)। পশ্চিমবঙ্গের দীর্ঘদিন শাসন ক্ষমতা আগলে রাখা মমতা ব্যানার্জী এবং তামিলনাড়ুর এম কে স্তালিন, দুইজনই নিজেদের ঘাঁটিতে পরাজয়ের মুখ দেখেছেন। আর এরইসঙ্গে তাঁদের দলগুলো কার্যত গৌণ অবস্থানে চলে গেল।
এখন কথা হচ্ছে, তাহলে বিরোধী শিবিরের এই দুই প্রভাবশালী নেতার ভবিষ্যৎ কী? নাকি ভারতীয় জনতা পার্টির (বিজেপি) সম্প্রসারণ পরিকল্পনার সামনে সবচেয়ে শক্তিশালী আঞ্চলিক বাধাগুলোর পতন শুরু হয়েছে? তবে দুজনই ইঙ্গিত দিয়েছেন, তাঁরা সহজে হার মানছেন না।
মমতা ব্যানার্জী বিজেপির জয়কে “অনৈতিক” বলে আখ্যা দিয়ে ঘুরে দাঁড়ানোর অঙ্গীকার করেছেন। আর এম কে স্তালিন বিনয়ের সঙ্গে দৃঢ়ভাবে বলেছেন, “এটা ডিএমকের শেষ নয়, বরং একটি নতুন অধ্যায়ের শুরু।” তবে ৭১ বছর বয়সী মমতা এবং ৭৩ বছর বয়সী স্তালিনের জন্য এটি শুধু একটি রাজনৈতিক ধাক্কা নয়, এটি সময় ফুরিয়ে আসার এক কঠিন বাস্তবতাও বটে।
প্রতিবেশী দেশের পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যে প্রায় ১৫ বছর ধরে তৃণমূল কংগ্রেস বিজেপির উত্থানকে প্রতিহত করে এসেছে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত সেই দুর্গেও ভাঙন ধরে। বিজেপির ধারাবাহিক ও আক্রমণাত্মক প্রচারণার সামনে মমতার অবস্থান ক্রমেই কঠিন হয়ে ওঠে। তিনি ২০১৪, ২০১৬, ২০১৯, ২০২১ ও ২০২৪ সালের বিভিন্ন নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে সফল হলেও পরিস্থিতি ধীরে ধীরে বদলে যাচ্ছিল। ২০১৬ সালে যেখানে বিজেপির আসন ছিল মাত্র ৩, তা ২০১৯ সালে বেড়ে ৭৭-এ পৌঁছায়। এবার তা ২০৬-এ গিয়ে দাঁড়িয়েছে।
পরাজয়ের পরপরই নির্বাচনকে ঘিরে কারচুপির অভিযোগ তোলেন মমতা বন্দোপাধ্যায়। নির্বাচন কমিশনের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন তোলেন তিনি। তাঁর ভাষায়, “বিজেপি ১০০টিরও বেশি আসন লুট করেছে। নির্বাচন কমিশন বিজেপির কমিশনে পরিণত হয়েছে।”
আরো পড়ুন : বাংলায় বিজেপির জোয়ার, কোণঠাসা তৃণমূল
মমতা ব্যানার্জী এই পরাজয়কে গণতন্ত্রের সংকট হিসেবে তুলে ধরছেন এবং ভোটার তালিকা সংশোধন ও নির্বাচন কমিশনের শীর্ষ পর্যায়ের পরিবর্তনকে গণতন্ত্রের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা হিসেবে অভিহিত করছেন। ধারণা করা হচ্ছে, তিনি ভবিষ্যতে আরো জোরালোভাবে “বাংলা বনাম বহিরাগত” রাজনৈতিক বয়ান সামনে আনতে পারেন, যা তাঁর দীর্ঘদিনের পরীক্ষিত কৌশল।
অন্যদিকে, দলের ভেতরে নেতৃত্ব ধরে রাখা, দলত্যাগ ঠেকানো এবং সাংগঠনিক ঐক্য বজায় রাখা তাঁর জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াবে। সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হলো—সরকারি ক্ষমতা ছাড়া তিনি কতটা কার্যকরভাবে বিজেপির মোকাবিলা করতে পারবেন।
এদিকে এম কে স্তালিনের দল ডিএমকে দীর্ঘদিন ধরে বিজেপি সরকারের কেন্দ্রীয় নীতির কড়া সমালোচক হিসেবে পরিচিত ছিল। গত সাত বছর ধরে এবং তিনটি বড় নির্বাচনে দলটি শক্ত অবস্থানে ছিল।
২০১৯ ও ২০২৪ সালের লোকসভা এবং ২০২১ সালের রাজ্য নির্বাচনে ডিএমকে ও তার জোট শক্তিশালী জয় পায়। ২০১৯ সালে প্রায় সব আসনে জয়ের পাশাপাশি ২০২১ সালে বিধানসভায় ২৩৪টির মধ্যে ১৫৯টি আসনও তারা নিশ্চিত করে। কিন্তু সাম্প্রতিক ফলাফল সেই ধারাকে উল্টে দিয়েছে। অভিনেতা বিজয় থালাপাতির দল তামিলগা ভেট্রি কাজাগাম (টিভিকে) নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা থেকে মাত্র ১০টি আসন কম পেয়ে বড় চমক সৃষ্টি করেছে।
স্তালিনের ক্ষেত্রে পরিস্থিতি মমতার মতো ধারাবাহিক পতন নয়, বরং হঠাৎ একটি বড় ধাক্কা। কোনো পূর্বাভাস ছাড়াই এই পরাজয় এসেছে। বিজয়ের জনপ্রিয়তা, চলচ্চিত্র জগতের আবেগঘন প্রভাব এবং তরুণ ভোটারদের মধ্যে পরিবর্তনের আকাঙ্ক্ষা ডিএমকের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে।
তবে মমতার মতোই স্তালিনও এখানেই থেমে যাচ্ছেন না। তিনি নিজেকে ও দলকে দ্রাবিড় পরিচয়ের রক্ষক হিসেবে তুলে ধরতে চাইবেন—যা তামিল রাজনীতির মূল ভিত্তি।
বিজয়ের উত্থান ডিএমকে-এআইএডিএমকে দ্বিমেরু রাজনীতিকে চ্যালেঞ্জ করলেও, দ্রাবিড় রাজনৈতিক কাঠামো সম্পূর্ণ ভেঙে যায়নি।
মমতার মতো স্তালিনও এখন অভিভাবকের ভূমিকায় যেতে পারেন। তবে তাঁর জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হলো—একটি তুলনামূলক নতুন রাজনৈতিক শক্তির মোকাবিলা করা, যাদের নেতৃত্বে রয়েছেন এমন একজন যিনি আগে কখনও নির্বাচিত জনপ্রতিনিধি ছিলেন না।
দুই নেতার ক্ষেত্রেই ব্যক্তিগত পরাজয়ও গুরুত্বপূর্ণ। মমতা তাঁর ঘনিষ্ঠ থেকে প্রতিদ্বন্দ্বী হওয়া শুভেন্দু অধিকারীর কাছে ভবানীপুরে পরাজিত হয়েছেন। আর স্তালিন কোলাথুরে পরাজিত হয়েছেন তাঁরই এক সময়ের ঘনিষ্ঠ ভি এস বাবুর কাছে, যিনি তাঁর রাজনৈতিক উত্থানের পেছনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিলেন। এই পরাজয় দুজনকেই রাজনৈতিকভাবে নতুন বাস্তবতার মুখোমুখি করেছে।
বিজেপির জন্য পূর্ব ভারতে এই সাফল্য বড় অর্জন। তবে দক্ষিণ ভারত এখনও তাদের জন্য এক কঠিন চ্যালেঞ্জ। কেরালা ও তামিলনাড়ুতে তারা শক্ত অবস্থান তৈরি করতে পারেনি, যদিও কিছু সীমিত সাফল্য তাদের উপস্থিতি বজায় রেখেছে।
সব মিলিয়ে ২০২৬ সালের রাজনৈতিক চক্রের এই ধাক্কা ভারতের রাজনৈতিক মানচিত্রে নতুন সমীকরণ তৈরি করেছে—যেখানে দুই শক্তিশালী আঞ্চলিক নেতা প্রথমবারের মতো নিজেদের ঘাঁটিতেই বড় পরাজয়ের মুখোমুখি হলেন।
