ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়েও অর্থাভাবে পড়াশোনা অনিশ্চিত আলামিনের
নুর আলম দুলাল, কুষ্টিয়া
প্রকাশ: ২২ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৬:৪৬ পিএম
ছবি: সংগৃহীত
কুষ্টিয়ার কুমারখালী উপজেলার পান্টি ইউনিয়নের রাজাপুর গ্রাম। সরু গ্রামীণ পথ ধরে ভেতরে ঢুকলে চোখে পড়ে জরাজীর্ণ একটি টিনশেড ঘর। ঘরের ভেতর কাঠের একটি ভাঙা চেয়ার-টেবিলে বসে বইয়ের পাতা উল্টাচ্ছেন তরুণ মো. আলামিন হোসেন (২০)। দেশের সর্বোচ্চ বিদ্যাপীঠ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের প্রথম বর্ষের ছাত্র তিনি।
অথচ এই সময়ে তার থাকার কথা ছিল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্লাসরুমে। অর্থাভাবে এখন তার ঠিকানা সেই গ্রামের ভাঙা ঘরই। অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে তার পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়া।
সোমবার দুপুরে আলামিনের বাড়িতে গিয়ে দেখা যায়, আলামিনের ঘরে ভালো একটি চেয়ার ও টেবিল নেই। নেই আসবাব ও ভালো আলোর ব্যবস্থা। নানা সংকটের মধ্য দিয়ে পড়াশোনা করতে হচ্ছে তাকে।
আরও পড়ুন: সচিবের ভাই পরিচয়ে ইউএনওর কাছে লাখ টাকা দাবি, অতঃপর
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী আলামিন বলেন, ভর্তির দুই মাস পরে হলে উঠেছি। থাকা-খাওয়া আর পড়ার খরচ মাসে ৫ থেকে ৬ হাজার টাকা লাগে। বাবা ভ্যান চালিয়ে যা আয় করেন, তা দিয়ে সংসারই চলে না। আমি ঢাকায় টিকতে পারিনি। গত বৃহস্পতিবার রাতে গ্রামে ফিরে এসেছি। বন্ধুরা এখন সেমিস্টার ফাইনালের প্রস্তুতি নিচ্ছে, আর আমি বাড়িতে বসে আছি। অথচ নানা সংকট মোকাবিলা করে বুকভরা স্বপ্ন নিয়ে ঢাবিতে ভর্তি হয়েছিলাম। আলামিনের বাবা আলেফ আলী পেশায় ভ্যানচালক। অভাবের সংসারে আলামিন বড় ছেলে।
আলামিন ছাড়াও দ্বিতীয় স্ত্রী রোকসানা বেগম, বৃদ্ধ মা চন্দনা খাতুন ও স্কুল পড়ুয়া দুই মেয়ে ও এক ছেলে রয়েছে। আলামিন ২০২৩ সালে ডাঁসা মাধ্যমিক বিদ্যালয় থেকে বাণিজ্য বিভাগে জিপিএ-৫ পেয়ে এসএসসি এবং ২০২৫ সালে শৈলকুপার কাতলাগাড়ি ডিগ্রি কলেজ থেকে জিপিএ-৫ পেয়ে এইচএসসি পাস করেন। এরপর একটি বৃত্তি পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে ঢাকার একটি কোচিং সেন্টারে বিনামূল্যে বিশ্ববিদ্যালয় ভর্তি প্রস্তুতি নেন। মেধার স্বাক্ষর রাখেন ভর্তি পরীক্ষায়—জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সি ইউনিটে ২০তম, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিজ্ঞান বিভাগে ৯৫তম এবং বি ইউনিটে ৫২৬তম স্থান অর্জন করেন। স্থানীয়দের সহযোগিতা ও ধারদেনা করে ২০২৫-২৬ শিক্ষাবর্ষে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হন তিনি। কিন্তু ভর্তির পাঁচ মাসের মাথায় সব স্বপ্ন আটকে যায় টাকার কাছে।
আলামিনের বাবা আলেফ আলী বলেন, ভ্যান চালাইয়া দিনে ৪০০-৫০০ টাকা পাই। এই দিয়া সংসার চালাই, ছেলের পড়ার খরচ কীভাবে দেব? ছেলের এই খরচ-খরচাটা এখন জুলুম হয়ে যাচ্ছে আমার কাছে। টাকার অভাবে ছেলে ঢাকা থেকে চলে আসছে। সরকার যদি একটু সহযোগিতা করতো। ছেলে পড়াশোনায় ভালো। অনেকের সহযোগিতায় এই পর্যন্ত সে পড়াশোনা চালিয়ে আসছে বলে জানালেন সৎমা রোকসানা বেগম।
তিনি বলেন, আমরা চাই ও পড়ুক, কিন্তু আমাদের সামর্থ্য নাই। টাকার অভাবে বাড়ি চলে আসছে। সরকার যদি একটু সহযোগিতা করতো। তাহলে পড়াশোনাটা করে কিছু একটা করে খেতে পারতো। আলামিনের জীবনের গল্প আরও করুণ। পারিবারিক অস্বচ্ছলতা আর ঋণের চাপে ২০২৩ সালে তার মা কাজলী খাতুন আত্মহত্যা করেন। মা হারানোর পর পড়াশোনা প্রায় বন্ধ হতে বসেছিল। তবে গ্রামের মানুষ ও স্বজনদের সহায়তায় তিনি ঘুরে দাঁড়ান।
প্রতিবেশীরা বলছেন, আলামিন অত্যন্ত বিনয়ী ও মেধাবী। প্রতিবেশী সাগর আলী বলেন, আমাদের গ্রামে এমন মেধাবী ছেলে আর একটাও নেই। ঋণের চাপ সইতে না পেরে ওর (আলামিনের) মা আত্মহত্যা করেছিল। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে চান্স পাওয়া চারটিখানি কথা না। আমরা চাই সকলেই ওর পাশে দাঁড়াক। আরেক প্রতিবেশী খাইরুল ইসলাম বলেন, ওর মা মারা যাওয়ার পরও ছেলেটা হাল ছাড়েনি। এখন টাকার জন্য যদি ওর পড়া বন্ধ হয়ে যায়, এটা খুবই দুঃখজনক। বিত্তবানদের এগিয়ে আসা উচিত। দারিদ্র্যের খবর পেয়ে ভর্তির সময় ২০ হাজার টাকা সহযোগিতা করার
কথা হয় পান্টি ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মো. হাফিজুর রহমানের সঙ্গে। তিনি বলেন, আলামিনের স্বপ্ন বাঁচাতে সকলকে এগিয়ে আসা উচিত। কুমারখালী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ফারজানা আখতার বলেন, বিষয়টি আমরা জেনেছি। উপজেলা প্রশাসন সবসময় মেধাবীদের পাশে দাঁড়িয়েছে। আলামিন লিখিত আবেদন করলে উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে এবং বিভিন্ন সরকারি বৃত্তির মাধ্যমে তাকে সাধ্যমত সহযোগিতার চেষ্টা করা হবে।
