×

জাতীয়

নতুন বাস্তবতার মুখে ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্ক

Icon

কাগজ ডেস্ক

প্রকাশ: ১৫ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ০৩:২৪ পিএম

নতুন বাস্তবতার মুখে ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্ক

ছবি : সংগৃহীত

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) বড় জয় পাওয়ার পর নতুন করে আলোচনায় এসেছে ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্কের ভবিষ্যৎ। নির্বাচনের পরপরই ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি বাংলা ভাষায় এক বার্তায় বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমানকে বিজয়ের জন্য অভিনন্দন জানান। একইসঙ্গে একটি গণতান্ত্রিক, প্রগতিশীল ও অন্তর্ভুক্তিমূলক প্রতিবেশী হিসেবে বাংলাদেশের পাশে থাকার আশ্বাস দেন। দুই দেশের বহুমুখী সম্পর্ক আরো জোরদার করার আগ্রহও প্রকাশ করেন  তিনি।

তবে এই শুভেচ্ছা বার্তার মধ্যেও ছিল সতর্ক কূটনৈতিক সুর। জেন-জির নেতৃত্বে ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানের পর সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ভারতে আশ্রয় নেওয়ার পর দুই দেশের সম্পর্কের মধ্যে অবিশ্বাস তৈরি হয়। একই সঙ্গে আওয়ামী লীগকে নির্বাচনে অংশ নিতে না দেওয়াও রাজনৈতিক বাস্তবতাকে বদলে দিয়েছে।

অনেক বাংলাদেশি মনে করেন, ক্রমশ কর্তৃত্ববাদী হয়ে ওঠা শেখ হাসিনা সরকারের প্রতি ভারতের সমর্থন দুই দেশের সম্পর্ককে বিতর্কিত করেছে। এর সঙ্গে সীমান্ত হত্যা, পানিবণ্টন বিরোধ, বাণিজ্য সীমাবদ্ধতা এবং উত্তপ্ত রাজনৈতিক বক্তব্যের মতো পুরোনো ইস্যুগুলোও যুক্ত হয়েছে। বর্তমানে ভিসা কার্যক্রম প্রায় স্থগিত, আন্তঃদেশীয় বাস ও ট্রেন চলাচল বন্ধ এবং ঢাকা-দিল্লি ফ্লাইটও উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে।

ভারতের জন্য এখন প্রশ্নটি বিএনপি সরকারের সঙ্গে যোগাযোগ স্থাপন করা নয়, বরং কীভাবে তা করা হবে। বিশেষ করে বিচ্ছিন্নতাবাদ ও উগ্রবাদের বিষয়ে নিজেদের নিরাপত্তা উদ্বেগ বজায় রেখে এবং উত্তেজনাপূর্ণ বক্তব্য কমিয়ে কিভাবে এই সম্পর্ক এগিয়ে যাবে।

বিশ্লেষকদের মতে, সম্পর্ক পুনর্গঠন সম্ভব হলেও এর জন্য সংযম ও পারস্পরিক সহযোগিতা প্রয়োজন। লন্ডনের সোয়াস বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক অবিনাশ পালিওয়াল বলেন, রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা ও মধ্যপন্থি অবস্থানের কারণে ভারতের জন্য বিএনপি তুলনামূলকভাবে নিরাপদ অংশীদার হতে পারে। তবে তারেক রহমান কীভাবে দেশ পরিচালনা করবেন, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।

ভারতের কাছে বিএনপি অপরিচিত নয়। ২০০১ সালে খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে বিএনপি-জামায়াত জোট ক্ষমতায় এলে দুই দেশের সম্পর্ক দ্রুত শীতল হয়ে যায়। ভারতের তৎকালীন জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা ব্রাজেশ মিশ্রা প্রথম বিদেশি কূটনীতিক হিসেবে খালেদা জিয়াকে অভিনন্দন জানিয়েছিলেন, কিন্তু পরবর্তীতে পারস্পরিক অবিশ্বাস বাড়তে থাকে।

উত্তর-পূর্ব ভারতের বিদ্রোহী গোষ্ঠীগুলোর প্রতি সমর্থন বন্ধ করা এবং সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, এই দুটি বিষয় ভারতের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। ২০০৪ সালে চট্টগ্রামে ১০ ট্রাক অস্ত্র জব্দের ঘটনা এবং সংখ্যালঘুদের ওপর হামলার অভিযোগ সম্পর্ককে আরো খারাপ করে। একই সময়ে টাটা গ্রুপের প্রস্তাবিত প্রায় ৩ বিলিয়ন ডলারের বিনিয়োগও শেষ পর্যন্ত বাস্তবায়িত হয়নি।

পরবর্তীতে ভারত শেখ হাসিনা সরকারের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক গড়ে তোলে। তার ১৫ বছরের শাসনামলে নিরাপত্তা সহযোগিতা, যোগাযোগ উন্নয়ন এবং ভারতের সঙ্গে কৌশলগত সমন্বয় জোরদার হয়। তবে এই ঘনিষ্ঠতা রাজনৈতিকভাবে বিতর্কও সৃষ্টি করে।

আরো পড়ুন : মঙ্গলবার সকালে সংসদ সদস্য, বিকেলে মন্ত্রিসভার শপথ: আইন উপদেষ্টা

বর্তমানে শেখ হাসিনা ভারতে অবস্থান করছেন। ২০২৪ সালের সহিংস দমন অভিযানের ঘটনায় যেখানে জাতিসংঘের তথ্য অনুযায়ী প্রায় ১ হাজার ৪০০ মানুষ নিহত হন। এই ঘটনায় তার বিরুদ্ধে অনুপস্থিতিতে মৃত্যুদণ্ডের রায় হয়েছে। তাকে ফেরত না দেওয়ার বিষয়টি দুই দেশের সম্পর্ক পুনর্গঠনের পথে একটি বড় বাধা হিসেবে দেখা হচ্ছে।

সম্প্রতি ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্কর ঢাকায় এসে তারেক রহমানের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। তবে, এক সমাবেশে তারেক রহমান “দিল্লি নয়, পিন্ডি নয়—সবার আগে বাংলাদেশ” স্লোগান দিয়ে ভারত ও পাকিস্তান উভয়ের প্রভাব থেকে স্বাধীন অবস্থানের ইঙ্গিত দেন।

এদিকে হাসিনা সরকারের পতনের পর পাকিস্তানের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্কও উষ্ণ হয়েছে। ১৪ বছর পর ঢাকা-করাচি সরাসরি ফ্লাইট চালু হয়েছে, ১৩ বছর পর পাকিস্তানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী বাংলাদেশ সফর করেছেন এবং সামরিক ও নিরাপত্তা সহযোগিতাও পুনরায় শুরু হয়েছে। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে দুই দেশের বাণিজ্য ২৭ শতাংশ বেড়েছে।

নয়াদিল্লিভিত্তিক ইনস্টিটিউট ফর ডিফেন্স স্টাডিস অ্যান্ড অ্যানালাইসিসের বিশ্লেষক স্মৃতি পট্টনায়ক বলেন, পাকিস্তানের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ক থাকা স্বাভাবিক হলেও সম্পর্কের ভারসাম্য একদিকে বেশি ঝুঁকে পড়া ভারতের জন্য উদ্বেগের বিষয় হতে পারে।

তিনি আরো বলেন, শেখ হাসিনার ভারতে অবস্থান এবং তাকে ফেরত দেওয়ার সম্ভাবনা কম হওয়া নতুন সম্পর্ক গড়ার ক্ষেত্রে জটিলতা তৈরি করবে। একই সঙ্গে ঢাকার রাজনৈতিক বিরোধীরা এ বিষয়টি নিয়ে সরকারের ওপর চাপ অব্যাহত রাখবে।

ওপি জিন্দাল গ্লোবাল ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক শ্রীরাধা দত্ত মনে করেন, ভারতে আশ্রয় নেওয়া আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের উপস্থিতিও সম্পর্কের ক্ষেত্রে একটি সংবেদনশীল বিষয় হয়ে উঠতে পারে।

বিশ্লেষকদের মতে, সীমান্ত-সংক্রান্ত সমস্যা, ভারতীয় রাজনীতি ও গণমাধ্যমের উসকানিমূলক বক্তব্য এবং পারস্পরিক অবিশ্বাস এসব বিষয় নতুন সম্পর্কের পথে চ্যালেঞ্জ হয়ে থাকবে। তবে নিরাপত্তা সহযোগিতা, অর্থনৈতিক সম্পর্ক এবং ভৌগোলিক বাস্তবতা দুই দেশকে কাছাকাছি রাখে। প্রায় ৪ হাজার কিলোমিটার দীর্ঘ সীমান্ত, শক্তিশালী বাণিজ্য সম্পর্ক এবং সাংস্কৃতিক যোগাযোগ, এসব কারণে সম্পর্ক পুরোপুরি বিচ্ছিন্ন হওয়া সম্ভব নয়।

বিশেষজ্ঞদের মতে, ভবিষ্যৎ নির্ভর করবে ঢাকা ও দিল্লি উভয়েই উত্তেজনাপূর্ণ বক্তব্য কমিয়ে বাস্তবমুখী সহযোগিতার পথে কতটা এগোতে পারে তার ওপর। দুই দেশের সম্পর্ক পুনর্গঠন শেষ পর্যন্ত কূটনৈতিক বক্তব্যের চেয়ে আস্থাভিত্তিক পদক্ষেপের ওপরই নির্ভর করবে।

টাইমলাইন: ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন

আরো পড়ুন

সাবস্ক্রাইব ও অনুসরণ করুন

কৃষি ব্যাংক ম্যানেজারের সচেতনতায় বানচাল

জাল দলিল দিয়ে ব্যাংক লোনের ফন্দি কৃষি ব্যাংক ম্যানেজারের সচেতনতায় বানচাল

মোবাইল কোর্টে টিমের ওপর ড্রেজার ব্যবসায়ীদের হামলা!

মোবাইল কোর্টে টিমের ওপর ড্রেজার ব্যবসায়ীদের হামলা!

সাবেক দুই সেনাসদস্যের বিরুদ্ধে ইন্টারপোলে রেড নোটিশ

তনু হত্যা মামলা সাবেক দুই সেনাসদস্যের বিরুদ্ধে ইন্টারপোলে রেড নোটিশ

‘রূপায়ণ সিটি উত্তরা’ যেন ঢাকার ‘ক্যাসিনো সিটি’

‘রূপায়ণ সিটি উত্তরা’ যেন ঢাকার ‘ক্যাসিনো সিটি’ পরিচালনায় সম্রাটের ক্যাসিনো পার্টনার কাশেম

সব খবর

সম্পাদক : শ্যামল দত্ত

প্রকাশক : সাবের হোসেন চৌধুরী

অনুসরণ করুন

BK Family App