খুলনায় বাবা-মেয়ে হত্যা: ৫ আসামির মৃত্যুদণ্ড বহাল
কাগজ ডেস্ক
প্রকাশ: ২৩ জুলাই ২০২৬, ১০:৩৮ পিএম
ছবি : সংগৃহীত
খুলনার লবণচোরা এলাকায় ব্যাংক কর্মকর্তা পারভীন সুলতানা ও তার বাবা ইলিয়াস চৌধুরীকে হত্যা মামলায় নিম্ন আদালতের দেওয়া পাঁচ আসামির মৃত্যুদণ্ড বহাল রেখেছেন হাইকোর্ট। তবে একই ঘটনায় দায়ের করা ধর্ষণ মামলায় আসামিদের মৃত্যুদণ্ড কমিয়ে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে।
বৃহস্পতিবার (২৩ জুলাই) বিচারপতি ভীষ্মদেব চক্রবর্তী ও বিচারপতি কে এম রাশেদুজ্জামান রাজার সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্টের বিশেষ বেঞ্চ এ রায় দেন।
দণ্ডপ্রাপ্ত পাঁচ আসামি হলেন মো. লিটন, সাইফুল ইসলাম পিটিল, আবু সাঈদ, আজিজুর রহমান ওরফে পলাশ এবং শরিফুল আলম।
আদালতের রায়ে বলা হয়, হত্যা মামলায় দণ্ডবিধির ৩৯৬ ধারায় ডাকাতিসহ হত্যার অভিযোগে নিম্ন আদালতের দেওয়া পাঁচ আসামির মৃত্যুদণ্ড বহাল রাখা হয়েছে। অন্যদিকে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনের ৯(৩) ধারার পরিবর্তে ৯(১) ধারায় দণ্ড পরিবর্তন করে পাঁচ আসামিকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে।
আদালতে বাদীপক্ষে শুনানি করেন সিনিয়র আইনজীবী মোহাম্মদ তাজুল ইসলাম। তাঁকে সহযোগিতা করেন আইনজীবী সৈয়দ আল আসাফুর আলী রাজা, মো. নাজিমুদ্দীন ও মাহমুদুল ইসলাম। রাষ্ট্রপক্ষে ছিলেন ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল সৈয়দ ইজাজ কবির ও তারেক ইমাম।
রায় ঘোষণার পর তাজুল ইসলাম বলেন, হত্যা মামলায় আসামিদের মৃত্যুদণ্ড বহাল থাকায় তাঁরা সন্তুষ্ট। তবে ধর্ষণ মামলায় মৃত্যুদণ্ড কমিয়ে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেওয়ার বিষয়ে পূর্ণাঙ্গ রায় পর্যালোচনা করে প্রয়োজন হলে সাজা বৃদ্ধির জন্য আপিল করার বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।
তিনি আরো বলেন, বাবা-মেয়েকে নির্মমভাবে হত্যার ঘটনায় মৃত্যুদণ্ড বহাল থাকায় ভুক্তভোগী পরিবার কিছুটা হলেও সান্ত্বনা পাবে। তবে সাজা কার্যকর হওয়ার পরই পরিবার প্রকৃত অর্থে ন্যায়বিচার পাওয়ার অনুভূতি পাবে।
মামলার নথি অনুযায়ী, ২০১৫ সালের ১৮ সেপ্টেম্বর রাতে খুলনা মহানগরের লবণচোরা এলাকার বুড়ো মৌলভীর দরগাহপাড়ার ঢাকাইয়া হাউজে এ ঘটনা ঘটে।
অভিযোগ অনুযায়ী, দুর্বৃত্তরা বাসায় ঢুকে প্রথমে ব্যাংক কর্মকর্তা পারভীন সুলতানাকে সংঘবদ্ধভাবে ধর্ষণ করে। পরে তাঁকে ও তাঁর বাবা ইলিয়াস চৌধুরীকে শ্বাসরোধে হত্যা করা হয়। হত্যার পর বাবা-মেয়ের মরদেহ বাড়ির সেপটিক ট্যাংকে ফেলে রেখে যায় তারা।
ঘটনার পরদিন ১৯ সেপ্টেম্বর লবণচোরা থানায় দণ্ডবিধির ৩০২ ধারায় হত্যা মামলা করেন নিহত পারভীনের ভাই রেজাউল আলম চৌধুরী বিপ্লব। তদন্তের একপর্যায়ে পুলিশ মো. লিটন ও আবু সাঈদকে গ্রেপ্তার করে। পরে মো. লিটনের স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিতে হত্যার আগে পারভীন সুলতানাকে ধর্ষণের তথ্য উঠে আসে। এর পরিপ্রেক্ষিতে ২২ সেপ্টেম্বর নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনের ৯(৩) ধারায় ধর্ষণ ও হত্যার অভিযোগে আরেকটি মামলা করা হয়। পরে খুলনার নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনাল-৩-এ দুটি মামলার বিচার অনুষ্ঠিত হয়।
বিচারিক আদালতের রায় ও হাইকোর্টে আইনি জটিলতা
২০১৯ সালের ১৬ জুলাই খুলনার নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনাল-৩ পৃথক দুটি মামলায় পাঁচ আসামিকে দুটি মামলাতেই মৃত্যুদণ্ড দেন।
এরপর মৃত্যুদণ্ড অনুমোদনের জন্য মামলা দুটির ডেথ রেফারেন্স এবং আসামিদের আপিল হাইকোর্টে আসে। শুনানির শুরুতে এখতিয়ার নিয়ে জটিলতা দেখা দেয়। কারণ, একটি মামলা দণ্ডবিধির আওতায় এবং অন্যটি নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনের আওতায় হওয়ায় বিশেষ বেঞ্চের এখতিয়ার নিয়ে প্রশ্ন ওঠে।
ঘটনা ও সাক্ষ্য-প্রমাণ একই হওয়ায় দুটি মামলা পৃথক বেঞ্চে শুনানি হলে ন্যায়বিচার ব্যাহত হতে পারে- এ আশঙ্কায় মামলার বাদী রেজাউল আলম চৌধুরী প্রধান বিচারপতির কাছে আবেদন করেন।
সে সময় বাদীপক্ষের আইনজীবী সৈয়দ আল আসাফুর আলী রাজা এবং রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল তারেক ইমামও ন্যায়বিচারের স্বার্থে দুটি মামলার ডেথ রেফারেন্স একই বেঞ্চে শুনানির পক্ষে মত দেন।
পরে প্রধান বিচারপতির নির্দেশে একই বিশেষ বেঞ্চে টানা শুনানি শেষে বৃহস্পতিবার এ রায় ঘোষণা করা হয়।
