আজ মা দিবস
মায়ের আঁচলে পৃথিবীর প্রথম আশ্রয়
কাগজ ডেস্ক
প্রকাশ: ১০ মে ২০২৬, ১১:০৪ এএম
ছবি : ভোরের কাগজ
মুখে উচ্চারিত প্রথম ডাক, কপালে স্নেহভরা স্পর্শ কিংবা নিঃস্বার্থ ত্যাগ, মানুষের জীবনের সবচেয়ে গভীর অনুভূতির নামই যেন “মা”। পৃথিবীতে এমন কোনো সম্পর্ক নেই, যেখানে প্রত্যাশার চেয়ে ভালোবাসা বেশি। কিন্তু মা বরাবরই ব্যতিক্রম। পৃথিবীর সব সম্পর্ক যেখানে হিসাব-নিকাশে আবদ্ধ, সেখানে মায়ের ভালোবাসা নিঃস্বার্থ, নির্মল ও সীমাহীন। সন্তান যতটা স্নেহ, ভালোবাসা কিংবা আশ্রয় প্রত্যাশা করে, মা তার চেয়েও বহু গুণ বেশি উজাড় করে দিতে সদা প্রস্তুত থাকেন। সন্তানের সামান্য কষ্টে যে হৃদয় নিঃশব্দে কেঁদে ওঠে, সন্তানের সামান্য সাফল্যে যে চোখ আনন্দে ভিজে যায়- সেই হৃদয়ের নামই মা।
একজন মা নিজের সুখ, স্বপ্ন কিংবা আরাম বিসর্জন দিয়েও সন্তানের মুখে হাসি দেখতে চান। সন্তানের ভবিষ্যৎ সুন্দর করতে তিনি নিরবে সহ্য করেন অসংখ্য ত্যাগ, ক্লান্তি আর সংগ্রাম। পৃথিবী যখন কঠিন হয়ে ওঠে, তখন মায়ের আঁচলই হয়ে ওঠে সবচেয়ে নিরাপদ আশ্রয়। তার স্নেহ এমন এক ছায়া, যেখানে হতাশ মানুষও খুঁজে পায় সাহস, ভরসা ও বেঁচে থাকার শক্তি।

মায়ের ভালোবাসার সবচেয়ে আশ্চর্য দিক হলো, এ ভালোবাসার কোনো শর্ত নেই। সন্তান ভুল করলেও মা ক্ষমা করেন, দূরে চলে গেলেও অপেক্ষা করেন, আর হাজার ব্যস্ততার মাঝেও সন্তানের জন্য প্রার্থনা করতে ভুলে যান না। তাই হয়তো পৃথিবীর সবচেয়ে গভীর, সবচেয়ে পবিত্র এবং সবচেয়ে নির্ভরতার সম্পর্কটির নাম- মা।
আজ বিশ্ব মা দিবস। পৃথিবীর সবচেয়ে নিঃস্বার্থ, সবচেয়ে মমতাময় মানুষটিকে সম্মান ও ভালোবাসা জানাতে বিশ্বের নানা দেশে পালিত হচ্ছে বিশেষ এই দিনটি। মা- একটি ছোট্ট শব্দ, অথচ এর গভীরতা আকাশসম। জন্মের পর প্রথম যে মুখটি মানুষ দেখে, প্রথম যে স্পর্শে নিরাপত্তা খুঁজে পায়, প্রথম যে কণ্ঠে ভালোবাসা অনুভব করে—সেই মানুষটিই মা।

সময়ের প্রবাহে আধুনিক সভ্যতা মানুষকে দিয়েছে প্রযুক্তির বিস্ময়, দ্রুতগতির জীবন আর সীমাহীন ব্যস্ততা। কিন্তু এই ব্যস্ততার ভিড়ে কোথাও যেন ধীরে ধীরে ফিকে হয়ে যাচ্ছে সম্পর্কের উষ্ণতা, কমে আসছে একসঙ্গে বসে গল্প করার সময়, অনুভূতিগুলো আটকে যাচ্ছে মোবাইল বা কম্পিউটারের পর্দায়। মানুষ যত যান্ত্রিক হচ্ছে, ততই আবেগ আর সম্পর্কের জায়গাগুলো সংকুচিত হয়ে পড়ছে। এমন বাস্তবতায় মা দিবস যেন এক গভীর অনুভূতির দরজা খুলে দেয়, মনে করিয়ে দেয়, পৃথিবীর সব অর্জনের পেছনে নিঃশব্দে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষটির নাম মা।
মা শুধু একজন অভিভাবক নন, তিনি সন্তানের প্রথম আশ্রয়, প্রথম শিক্ষক, প্রথম বন্ধু এবং প্রথম ভালোবাসা। সন্তানের প্রথম হাঁটা, প্রথম কথা বলা, প্রথম স্বপ্ন দেখা—সবকিছুর নেপথ্যে থাকেন একজন মা। নিজের শত কষ্ট, ক্লান্তি আর না-পাওয়া আড়াল করে সন্তানের মুখে হাসি ফোটানোর চেষ্টাই যেন তার জীবনের সবচেয়ে বড় আনন্দ।
মা দিবস তাই কেবল একটি আনুষ্ঠানিক উদযাপন নয়, এটি মায়ের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশের এক আবেগঘন উপলক্ষ। এই দিনটি যেন আমাদের মনে করিয়ে দেয় জীবনের ব্যস্ততার মাঝেও মায়ের জন্য একটু সময়, একটু যত্ন আর একটুখানি ভালোবাসাই হতে পারে তার সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি।
মা দিবসের ইতিহাস
মায়ের প্রতি এক কন্যার গভীর আবেগ থেকে বিশ্বজুড়ে শুরু হয়েছিল মা দিবসের উদযাপন। বিংশ শতাব্দীর শুরুর দিকে যুক্তরাষ্ট্রে মা দিবসের উৎপত্তি ঘটে। এই দিবস চালুর পেছনে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন আনা জার্ভিস। তবে এই ভাবনার মূল সূত্রপাত হয়েছিল তার মা অ্যান রিভস জার্ভিসের কাছ থেকেই। ১৮৭৬ সালে পশ্চিম ভার্জিনিয়ার একটি সানডে স্কুলের ক্লাস পরিচালনার সময় তিনি মায়েদের সম্মান জানাতে একটি বিশেষ দিনের ধারণা প্রকাশ করেছিলেন। ছোটবেলা থেকেই আনা জার্ভিস মায়ের সেই ভাবনাকে হৃদয়ে ধারণ করে বড় হন।
১৯০৫ সালে মায়ের মৃত্যুর পর তিনি সিদ্ধান্ত নেন, মায়েদের সম্মান জানাতে একটি জাতীয় দিবস প্রতিষ্ঠা করতেই হবে। তিনি মে মাসের দ্বিতীয় রোববার দিনটি বেছে নেন, কারণ এটি তার মায়ের মৃত্যুদিন ৯ মের কাছাকাছি ছিল।
১৯০৮ সালে পশ্চিম ভার্জিনিয়ার গ্রাফটনের একটি মেথডিস্ট গির্জায় আনা জার্ভিস প্রথম আনুষ্ঠানিক মা দিবস উদযাপনের আয়োজন করেন। এরপর তিনি দেশজুড়ে সংবাদপত্র ও রাজনীতিবিদদের কাছে চিঠি লিখে মা দিবসকে জাতীয়ভাবে স্বীকৃতি দেওয়ার দাবি জানান। তার নিরলস প্রচেষ্টায় ১৯১২ সালে প্রতিষ্ঠিত হয় “মাদার্স ডে ইন্টারন্যাশনাল অ্যাসোসিয়েশন”। অবশেষে ১৯১৪ সালে তৎকালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট উড্রো উইলসন মে মাসের দ্বিতীয় রোববারকে আনুষ্ঠানিকভাবে জাতীয় মা দিবস হিসেবে ঘোষণা করেন।
বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রসহ বিশ্বের বহু দেশে মা দিবস ব্যাপক উৎসাহ ও আবেগের সঙ্গে পালিত হয়। এ দিনে সন্তানরা মাকে ফুল, উপহার কিংবা বিশেষ আয়োজনের মাধ্যমে ভালোবাসা ও কৃতজ্ঞতা জানায়।
বিশ্বের বিভিন্ন দেশে মা দিবসের ভিন্নধর্মী আয়োজন
যদিও মা দিবসের আধুনিক সূচনা যুক্তরাষ্ট্রে, তবে বিশ্বের নানা দেশ নিজেদের সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য অনুযায়ী এই দিন উদযাপন করে। যুক্তরাজ্যে মা দিবসের ধারণাটি “মাদারিং সানডে” নামের খ্রিস্টীয় ঐতিহ্যের সঙ্গে মিলেমিশে যায়। লেন্ট ঋতুর চতুর্থ রোববার মানুষ তাদের “মাদার চার্চ” পরিদর্শন করত। সময়ের সঙ্গে এটি মায়েদের প্রতি ভালোবাসা প্রকাশের দিনে পরিণত হয়। সন্তানরা এদিন মায়েদের উপহার দেয়, বিশেষ করে “সিমনেল কেক” নামের ফলের কেক উপহার দেওয়ার প্রচলন রয়েছে।
ফ্রান্সে মা দিবস পরিচিত “লা ফেত দে মের” নামে। শুরুতে এটি ছিল বহু সন্তানের জননী নারীদের সম্মান জানানোর আয়োজন। বর্তমানে মে মাসের শেষ দিকে উদযাপিত এ দিনে শিশুরা মায়েদের ফুল ও ছোট ছোট উপহার দেয়।
আরো পড়ুন : যেমন থাকবে আজ ঢাকার আকাশ
মেক্সিকোতে মা দিবসে সন্তানরা গান বাজিয়ে মায়েদের ঘুম থেকে জাগায়। অনেকে ছোট নাটক বা সাংস্কৃতিক পরিবেশনার আয়োজন করে মায়েদের আনন্দ দেওয়ার চেষ্টা করে। পরে পরিবার নিয়ে রেস্তোরাঁয় খেতে যাওয়াও একটি জনপ্রিয় রীতি।
পেরুতে মা দিবসের আগের সপ্তাহজুড়ে পরিবারগুলো মায়েদের উপহার দেয় ও বাইরে খেতে নিয়ে যায়। তবে মা দিবসের দিনটি সেখানে কিছুটা আবেগঘন ও গম্ভীর পরিবেশে পালিত হয়। মানুষ এদিন কবরস্থানে গিয়ে প্রয়াত মা ও নারী স্বজনদের কবর পরিষ্কার ও সাজিয়ে স্মরণ করে।
এ ছাড়া বিশ্বের অনেক দেশেই মা দিবস আন্তর্জাতিক নারী দিবসের সঙ্গে মিলিয়ে ৮ মার্চ উদযাপন করা হয়।
মা দিবসে ফুল দীর্ঘদিন ধরে ভালোবাসা, কৃতজ্ঞতা ও শ্রদ্ধার প্রতীক হিসেবে বিবেচিত হয়ে আসছে। প্রতিটি ফুলের রয়েছে আলাদা অর্থ ও অনুভূতি। তাই মাকে ফুল উপহার দেওয়া শুধু সৌন্দর্যের প্রকাশ নয়, বরং গভীর আবেগ ও ভালোবাসার বহিঃপ্রকাশও বটে।
মায়ের ভালোবাসা: ভাষার বাইরে এক অনুভূতি
মায়ের ভালোবাসার কোনো সংজ্ঞা নেই। সন্তানের ছোট্ট হাসিতে যে নারী নিজের সমস্ত কষ্ট ভুলে যান, রাত জেগে সন্তানের অসুস্থতায় পাশে থাকেন, নিজের স্বপ্ন বিসর্জন দিয়ে সন্তানের ভবিষ্যৎ গড়েন- তিনি-ই মা। একজন মা শুধু সন্তান জন্ম দেন না, তিনি তার সাহস, মূল্যবোধ, মানবিকতা ও স্বপ্নও জন্ম দেন। পৃথিবীর সবচেয়ে নিরাপদ স্থান বলা হয় মায়ের কোলকে। কারণ সেখানে নেই কোনো ভয়, নেই কোনো শর্ত।
আজকের দিনে অনেক সন্তান হয়তো দূরে থাকে- ভিন্ন শহরে, ভিন্ন দেশে। তবুও মায়ের ফোনের ওপাশের কণ্ঠে সেই একই উদ্বেগ, “খেয়েছিস তো?” এই একটি প্রশ্নেই লুকিয়ে থাকে পৃথিবীর সবচেয়ে নির্মল ভালোবাসা।
মা দিবস কেবল একটি উৎসব নয়, এটি কৃতজ্ঞতা প্রকাশের একটি উপলক্ষ। জীবনের প্রতিটি সাফল্যের পেছনে যে নারীর নিরব ত্যাগ লুকিয়ে থাকে, তাকে স্মরণ করার দিন। সময় বদলায়, মানুষ বদলায়, পৃথিবী বদলায়, কিন্তু মায়ের ভালোবাসা বদলায় না। তাই হয়তো পৃথিবীর সব ভাষায় সবচেয়ে কোমল, সবচেয়ে শান্তির শব্দটি একটাই- “মা”।
