ইতিহাসের বৃহত্তম সাড়ে ৯ লাখ কোটি টাকার বাজেট আসছে
নিজস্ব প্রতিবেদক, ভোরের কাগজ
প্রকাশ: ১০ জুন ২০২৬, ১১:৩১ পিএম
ছবি : সংগৃহীত
দেশের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় জাতীয় বাজেট আজ সংসদে উপস্থাপন করতে যাচ্ছেন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জন্য প্রস্তাবিত বাজেটের সম্ভাব্য আকার ধরা হয়েছে ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকা, যা বাংলাদেশের ইতিহাসে সর্ববৃহৎ বাজেট।
গত ১২ ফেব্রুয়ারির জাতীয় নির্বাচনে বিজয়ের পর বিএনপি নেতৃত্বাধীন সরকারের এটিই প্রথম বাজেট। ফলে অর্থনৈতিক দিক থেকে সরকারের নীতিগত অগ্রাধিকার ও ভবিষ্যৎ কর্মপরিকল্পনার প্রতিফলন ঘটবে এবারের বাজেটে।
ট্রিলিয়ন ডলার অর্থনীতির লক্ষ্য
‘অর্থনৈতিক গণতান্ত্রিকীকরণ ও বিকেন্দ্রীকরণ: ট্রিলিয়ন ডলার অর্থনীতির পথে বাংলাদেশ’ -এই প্রতিপাদ্যকে সামনে রেখে বাজেট প্রণয়ন করা হয়েছে বলে অর্থ মন্ত্রণালয় সূত্র জানিয়েছে।
নীতিনির্ধারকদের মতে, অবকাঠামো উন্নয়নের পাশাপাশি মানবসম্পদ উন্নয়ন, কর্মসংস্থান সৃষ্টি, উদ্যোক্তা বিকাশ এবং সামাজিক নিরাপত্তা জোরদার করাই হবে এবারের বাজেটের মূল লক্ষ্য।
শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে বিশেষ গুরুত্ব
প্রস্তাবিত বাজেটে শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে সর্বোচ্চ বরাদ্দ দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। মানবসম্পদ উন্নয়নকে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির প্রধান চালিকাশক্তি হিসেবে বিবেচনা করেই এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হচ্ছে।
এছাড়া ২৫ লাখ নাগরিককে স্বাস্থ্যসেবার আওতায় আনতে ‘ই-হেলথ কার্ড’ কর্মসূচি চালুর উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। স্বাস্থ্যসেবা ডিজিটালাইজেশনের ক্ষেত্রে এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
উদ্যোক্তা ও কর্মসংস্থানে বড় উদ্যোগ
দেশীয় শিল্পের বিকাশ এবং নতুন উদ্যোক্তা তৈরির লক্ষ্যে উদ্যোক্তা উন্নয়ন তহবিলে ২২৫ কোটি টাকা বরাদ্দের প্রস্তাব রয়েছে। পাশাপাশি ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের (এসএমই) জন্য ২ হাজার কোটি টাকার বিশেষ তহবিল গঠনের উদ্যোগ নেওয়া হতে পারে।
বৈদেশিক কর্মসংস্থান বাড়াতে আগামী কয়েক বছরে ১ কোটি মানুষের বিদেশে কর্মসংস্থান সৃষ্টির লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।
যুব উন্নয়নে ৩০০ কোটি টাকার পরিকল্পনা
যুবসমাজকে মাদক, সন্ত্রাস ও জঙ্গিবাদ থেকে দূরে রেখে উৎপাদনশীল কর্মকাণ্ডে সম্পৃক্ত করতে ৩০০ কোটি টাকা বরাদ্দের প্রস্তাব থাকতে পারে। সরকারের আশা, এ উদ্যোগ তরুণদের দক্ষতা বৃদ্ধি ও কর্মসংস্থানে ইতিবাচক ভূমিকা রাখবে।
সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচিতে নতুন সংযোজন
সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনী আরও সম্প্রসারণের লক্ষ্যে ফ্যামিলি কার্ড ও কৃষক কার্ড কর্মসূচি চালুর প্রস্তাব রয়েছে। একই সঙ্গে বিদ্যমান সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচিগুলোর বরাদ্দও বাড়ানো হতে পারে।
সরকারি চাকরিজীবীদের জন্য নতুন বেতন কাঠামোর আংশিক বাস্তবায়নের ঘোষণাও বাজেটে আসতে পারে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।
প্রবৃদ্ধি ৬.৫ শতাংশ, মূল্যস্ফীতি নামানোর লক্ষ্য
আগামী অর্থবছরে মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) আকার ধরা হয়েছে ৬৮ লাখ ৩০ হাজার কোটি টাকা। অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে ৬ দশমিক ৫ শতাংশ, আর মূল্যস্ফীতি কমিয়ে ৭ দশমিক ৫ শতাংশে নামিয়ে আনার পরিকল্পনা রয়েছে।
অর্থনীতিবিদদের মতে, বর্তমানে মূল্যস্ফীতির চাপ বিবেচনায় এ লক্ষ্য অর্জন সরকারের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হবে।
রাজস্ব আহরণের লক্ষ্য ৬.৯৫ লাখ কোটি টাকা
প্রস্তাবিত বাজেটে মোট রাজস্ব আহরণের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ৬ লাখ ৯৫ হাজার কোটি টাকা। বাকি অর্থ বৈদেশিক সহায়তা ও অভ্যন্তরীণ ঋণের মাধ্যমে সংগ্রহ করা হবে।
সব মিলিয়ে বাজেট ঘাটতি দাঁড়াতে পারে ২ লাখ ৫১ হাজার কোটি টাকা, যা জিডিপির প্রায় ৩ দশমিক ৬ শতাংশ।
ব্যবসাবান্ধব সংস্কারে জোর
ব্যবসা পরিচালনা সহজ করতে লাইসেন্স, অনুমোদন ও কর ব্যবস্থায় ব্যাপক সংস্কারের পরিকল্পনা রয়েছে। এ লক্ষ্যে ‘বাংলাবিজ’ নামে একটি সমন্বিত ওয়ান-স্টপ সার্ভিস চালুর উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে, যার মাধ্যমে ব্যবসাসংক্রান্ত অধিকাংশ সেবা ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে পাওয়া যাবে।
জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) কার্যক্রমও আরও ব্যাপকভাবে অনলাইনে নিয়ে আসার পরিকল্পনা রয়েছে। অনলাইনে কর রিটার্ন দাখিল, সরাসরি ব্যাংক হিসাবে কর ফেরত এবং কর-সংক্রান্ত বিরোধ দ্রুত নিষ্পত্তির ব্যবস্থাও চালু হতে পারে।
বড় চ্যালেঞ্জ মূল্যস্ফীতি ও বিনিয়োগ
অর্থনীতিবিদরা বলছেন, মে মাসে দেশের মূল্যস্ফীতি ৯ দশমিক ৪২ শতাংশে পৌঁছেছে। এ অবস্থায় মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, রাজস্ব আদায় বৃদ্ধি এবং বেসরকারি বিনিয়োগে গতি আনা সরকারের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াবে।
তবে নীতিনির্ধারকদের আশা, চলমান অর্থনৈতিক সংস্কার, বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ এবং মানবসম্পদ উন্নয়নকেন্দ্রিক পদক্ষেপ দেশের অর্থনীতিকে নতুন গতি দেবে এবং দীর্ঘমেয়াদে ট্রিলিয়ন ডলার অর্থনীতির লক্ষ্যের দিকে বাংলাদেশকে এগিয়ে নেবে।
