জ্বালানি সংকট কাটাতে সর্বোচ্চ চেষ্টা চলছে: প্রধানমন্ত্রী
কাগজ ডেস্ক
প্রকাশ: ০৮ আগস্ট ২০২৬, ০৬:৩৪ পিএম
ছবি : সংগৃহীত
দেশের চলমান বিদ্যুৎ, গ্যাস ও জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় সরকার সর্বোচ্চ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে বলে জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। তিনি বলেন, অতীতে নেওয়া অপরিকল্পিত বিভিন্ন সিদ্ধান্তের কারণে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে বর্তমান সংকট তৈরি হয়েছে। এই পরিস্থিতি থেকে দেশ ও জনগণকে বের করে আনতে সরকার পরিকল্পিতভাবে কাজ করছে।
শনিবার (৮ আগস্ট) জাতীয় সংসদের এলডি হলে ডক্টরস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ড্যাব)-এর ৩৭তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে আয়োজিত চিকিৎসক সমাবেশে এসব কথা বলেন প্রধানমন্ত্রী।
তারেক রহমান বলেন, রাষ্ট্র, রাজনীতি ও প্রশাসনের বিভিন্ন পর্যায়ে ফ্যাসিবাদের সুবিধাভোগীরা এখনো সক্রিয়। একটি চক্র কৌশলে দেশের বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতকে অস্থিতিশীল করার চেষ্টা করছে। এ নিয়ে নানা বিভ্রান্তিকর তথ্যও ছড়ানো হচ্ছে বলে মন্তব্য করেন তিনি।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, বর্তমান সরকার দেশে জ্বালানি, বিদ্যুৎ ও গ্যাসের সংকট রয়েছে- এ বিষয়টি অস্বীকার করছে না। বরং অতীতে কোনো প্রতিষ্ঠানকে বিশেষ সুবিধা দিতে নেওয়া অপরিকল্পিত উদ্যোগের কারণে যে পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে, তার দায় এখন দেশ, জনগণ ও সরকারকে বহন করতে হচ্ছে।
তিনি বলেন, ‘বর্তমান সরকার একটি ভঙ্গুর পরিস্থিতির মধ্যে দায়িত্ব নিয়েছে। নানা ধরনের সংকট কাটিয়ে দেশকে সামনে এগিয়ে নিতে ইতোমধ্যে বিভিন্ন উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। গ্যাস, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সংকট থেকে মানুষকে ধীরে ধীরে মুক্ত করতে প্রয়োজনীয় পরিকল্পনা প্রণয়ন ও বাস্তবায়নের কাজ চলছে।’
এর আগে জাতীয় সংসদের এলডি হল প্রাঙ্গণে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ও তার সহধর্মিণী ডা. জুবাইদা রহমান নিম ও অর্জুন গাছের চারা রোপণ করেন। পরে জাতীয় ও দলীয় পতাকা উত্তোলন এবং বেলুন ও পায়রা উড়িয়ে চিকিৎসক সমাবেশের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করা হয়।
পবিত্র কুরআন তিলাওয়াত ও মোনাজাতের মধ্য দিয়ে সমাবেশের কার্যক্রম শুরু হয়। এতে দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে ড্যাবের নেতাকর্মী ও চিকিৎসকেরা অংশ নেন।
ড্যাব সভাপতি অধ্যাপক ডা. হারুন আল রশীদের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত সমাবেশে বক্তব্য দেন বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, প্রধানমন্ত্রীর সহধর্মিণী ডা. জুবাইদা রহমান, সমাজকল্যাণমন্ত্রী অধ্যাপক ডা. এ জেড এম জাহিদ হোসেন, স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন এবং ড্যাব মহাসচিব ডা. মো. জহিরুল ইসলাম শাকিলসহ অন্যরা।
মার্কিন উদ্ভাবক ও ব্যবসায়ী টমাস আলভা এডিসনের একটি বক্তব্যের উদাহরণ টেনে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ভবিষ্যতের চিকিৎসকদের কাজ শুধু ওষুধ দেওয়া নয়; বরং রোগীদের শরীরচর্চা, সুষম খাবার এবং রোগ প্রতিরোধের উপায় সম্পর্কে সচেতন করাও গুরুত্বপূর্ণ।
তারেক রহমান বলেন, এই ধারণার সঙ্গে বর্তমান সরকারের স্বাস্থ্যনীতির যথেষ্ট মিল রয়েছে। সরকার ‘প্রতিকারের চেয়ে প্রতিরোধ উত্তম’ নীতিতে বিশ্বাস করে। অর্থাৎ রোগ হওয়ার পর চিকিৎসার চেয়ে আগে থেকেই রোগ প্রতিরোধে সচেতনতা তৈরি করাকে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
তিনি জানান, স্বাস্থ্য খাতে সারাদেশে এক লাখ নতুন স্বাস্থ্যকর্মী নিয়োগের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। এসব স্বাস্থ্যকর্মী জনগণকে প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা বিষয়ে সচেতন ও সতর্ক করবেন। তাদের যথাযথ প্রশিক্ষণ নিশ্চিত করতে চিকিৎসকদের নেতৃত্ব দেওয়ার আহ্বান জানান তিনি।
চিকিৎসকদের পক্ষ থেকে উপস্থাপিত বিভিন্ন প্রস্তাবকে অযৌক্তিক নয় বলে মন্তব্য করেন প্রধানমন্ত্রী। এর মধ্যে রয়েছে স্বল্পতম সময়ের মধ্যে বিশেষ বিসিএসের মাধ্যমে ৫ হাজার চিকিৎসক নিয়োগ, সরকারি চাকরিতে চিকিৎসকদের প্রবেশের বয়সসীমা ৩২ থেকে ৩৪ বছর করা এবং অবসরের বয়সসীমা ৬১ থেকে ৬৫ বছরে উন্নীত করা।
এ ছাড়া চিকিৎসক ও রোগী উভয়ের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সময়োপযোগী স্বাস্থ্যসেবা সুরক্ষা আইন প্রণয়ন, উপজেলা ও প্রত্যন্ত অঞ্চলে কর্মরত চিকিৎসকদের জন্য বিশেষ ভাতা ও প্রণোদনা, বেসরকারি খাতে কর্মরত লক্ষাধিক চিকিৎসকের জন্য ন্যায্য ও সুনির্দিষ্ট বেতন কাঠামো এবং রাজধানীর বাইরে বিভাগ, জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে বিশেষায়িত হাসপাতাল প্রতিষ্ঠার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে।
তারেক রহমান বলেন, চিকিৎসকদের এসব প্রস্তাব ইতিবাচকভাবে পর্যালোচনা করা হবে। ঢাকার বাইরে শিশু হাসপাতালসহ কয়েকটি বিশেষায়িত হাসপাতাল নির্মাণের পরিকল্পনা ইতোমধ্যে বাস্তবায়নের পর্যায়ে রয়েছে বলেও জানান তিনি। অন্যান্য প্রস্তাবও পর্যায়ক্রমে বিবেচনা করা হবে।
রাজনীতিতে পেশাজীবীদের ভূমিকা নিয়েও বক্তব্য
শিক্ষার্থী ও পেশাজীবীদের রাজনীতিতে সম্পৃক্ততা প্রসঙ্গে প্রধানমন্ত্রী বলেন, একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত সমাজ ও রাষ্ট্রের প্রায় সব ক্ষেত্রেই প্রভাব ফেলে। তাই শিক্ষার্থী, শিক্ষক কিংবা পেশাজীবীরা নিজেদের মতাদর্শ অনুযায়ী রাজনৈতিকভাবে সচেতন বা সংগঠিত থাকলে সেটিকে অযৌক্তিক বলা যায় না।
তবে অতিরিক্ত রাজনৈতিক সম্পৃক্ততার কারণে যেন পেশাগত দায়িত্ব পালনে ব্যাঘাত না ঘটে, সে বিষয়ে সবাইকে সতর্ক থাকার আহ্বান জানান তিনি। একই সঙ্গে প্রচলিত রাজনীতির বাইরে গিয়ে রাজনীতির গুণগত পরিবর্তন আনার প্রয়োজনীয়তার কথাও তুলে ধরেন।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, বর্তমান সরকার দুর্বল অর্থনীতি, বিভাজিত প্রশাসন এবং ভঙ্গুর শিক্ষা ও স্বাস্থ্যব্যবস্থার মতো নানা সংকটের মধ্যে দায়িত্ব নিয়েছে। এসব চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করে দেশকে ঘুরে দাঁড় করানোর চেষ্টা চলছে।
তিনি অভিযোগ করেন, রাষ্ট্র, রাজনীতি, শাসন ও প্রশাসনের বিভিন্ন পর্যায়ে ফ্যাসিবাদের সুবিধাভোগীরা এখনো সক্রিয়। সাম্প্রতিক সময়ে একটি চক্র পরিকল্পিতভাবে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতকে অস্থিতিশীল করার চেষ্টা করছে। তবে সরকার ইতিবাচক উদ্যোগের মাধ্যমে এসব পরিস্থিতি মোকাবিলা করছে বলে জানান তিনি।
তারেক রহমান বলেন, শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও জ্বালানি খাতকে স্বয়ংসম্পূর্ণ ও স্বনির্ভর করতে সরকার বাস্তবমুখী পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে। স্বাস্থ্য খাতকে আধুনিক করতে এবার প্রথমবারের মতো দ্বিতীয় সর্বোচ্চ বাজেট বরাদ্দ রাখা হয়েছে। আগামী পাঁচ বছরের মধ্যে স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দ জিডিপির ৫ শতাংশে উন্নীত করার পরিকল্পনাও রয়েছে।
প্রধানমন্ত্রী জানান, যত দ্রুত সম্ভব ই-হেলথ কার্ড চালুর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে দেশের প্রতিটি উপজেলা হাসপাতালকে ১০১ শয্যার হাসপাতালে উন্নীত করার সিদ্ধান্ত হয়েছে।
তবে শুধু অবকাঠামোগত উন্নয়ন করলেই স্বাস্থ্য খাতে কাঙ্ক্ষিত সাফল্য আসবে না উল্লেখ করে তিনি বলেন, চিকিৎসকদের সেবার মানসিকতা নিয়ে দায়িত্ব পালন করতে হবে।
চিকিৎসকদের উদ্দেশে তিনি বলেন, দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে তাদের বিভিন্ন সীমাবদ্ধতার মুখোমুখি হতে হয়। তারপরও কিছু ক্ষেত্রে অনিচ্ছাকৃত অবহেলা বা দায়িত্ব পালনে শৈথিল্য সরকারের সামগ্রিক কার্যক্রমকে প্রশ্নবিদ্ধ করে এবং চিকিৎসক ও চিকিৎসাব্যবস্থার প্রতি মানুষের আস্থায় নেতিবাচক প্রভাব ফেলে।
এ কারণে জনগণ চিকিৎসকদের কাছ থেকে আরও দায়িত্বশীল, মানবিক ও আন্তরিক ভূমিকা প্রত্যাশা করে বলে জানান প্রধানমন্ত্রী।
তিনি বলেন, এমন একটি চিকিৎসাবান্ধব বাংলাদেশ গড়ে তুলতে হবে, যেখানে দেশের প্রতিটি মানুষ মানসম্মত স্বাস্থ্যসেবা পাবে এবং উন্নত চিকিৎসার জন্য বিদেশে যেতে হবে না।
সমাবেশে বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, প্রধানমন্ত্রীর সহধর্মিণী ডা. জুবাইদা রহমান, সমাজকল্যাণমন্ত্রী অধ্যাপক ডা. এ জেড এম জাহিদ হোসেন, স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন, প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা মো. ইসমাইল জবিউল্লাহ, স্বাস্থ্য প্রতিমন্ত্রী ড. এম এ মুহিত, ড্যাব সভাপতি অধ্যাপক ডা. হারুন আল রশীদ, ড্যাব মহাসচিব ডা. মো. জহিরুল ইসলাম শাকিল এবং প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।
