ডিজিটাল অস্ত্রের শিকার কি মরিয়ম?
কাগজ ডেস্ক
প্রকাশ: ২২ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৯:১৪ এএম
ছবি : সংগৃহীত
ন্যাম ভবনের একটি ফ্ল্যাটের দরজা ভেতর থেকে বন্ধ ছিল। বাইরে ছিল রাজধানীর ব্যস্ততা। আর ভেতরে পড়ে ছিল ১৯ বছরের মরিয়ম খাতুনের নিথর দেহ। যে বয়সে স্বপ্ন দেখার কথা, সামনে থাকার কথা দীর্ঘ ভবিষ্যৎ সেই বয়সেই শেরেবাংলা নগরের ন্যাম ভবনের ফ্ল্যাটে থেমে গেল তার জীবন।
রোববার (২০ সেপ্টেম্বর) মরিয়মের ঝুলন্ত মরদেহ উদ্ধারের পর ঘটনাটি ঘিরে শুরু হয়েছে নানা আলোচনা। হয়েছে মামলা, গ্রেপ্তার, অভিযোগ ও পাল্টা বক্তব্য। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও বিষয়টি নিয়ে চলছে ব্যাপক আলোচনা। তবে এর পাশাপাশি সামনে এসেছে আরও বড় একটি প্রশ্ন মরিয়মের মৃত্যুর আগে তার চারপাশের সামাজিক ও ডিজিটাল পরিবেশ কেমন ছিল?
মরিয়মের বাবা এস এম মাসুম বিল্লাহ শেরেবাংলা নগর থানায় আত্মহত্যায় প্ররোচনার অভিযোগে মামলা করেছেন। মামলায় সংসদ সদস্য গাজী নজরুল ইসলাম, তার প্রথম স্ত্রী মাকসুদা ইসলাম এবং মরিয়মের মামা ওবায়দুর রহমানকে আসামি করা হয়েছে। পুলিশ নজরুল ইসলাম ও তার প্রথম স্ত্রীকে গ্রেপ্তার করেছে।
তবে কার বিরুদ্ধে কতটা অভিযোগ প্রমাণিত হবে, সেটি তদন্ত ও আদালতের মাধ্যমে নির্ধারিত হবে। একইভাবে মরিয়মের মৃত্যুর চূড়ান্ত কারণও তদন্ত ছাড়া নিশ্চিতভাবে বলা সম্ভব নয়। কিন্তু তার মৃত্যুর আগে তিনি কী ধরনের সামাজিক, পারিবারিক ও ডিজিটাল চাপের মধ্যে ছিলেন সে প্রশ্নের উত্তর খোঁজাও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
সমাজবিজ্ঞানের আলোচনায় আত্মহত্যাকে শুধু ব্যক্তিগত বা মানসিক সংকট হিসেবে দেখা হয় না। ফরাসি সমাজবিজ্ঞানী এমিল ডুর্খেইম আত্মহত্যাকে একটি সামাজিক ঘটনাও হিসেবে ব্যাখ্যা করেছেন। তার মতে, ব্যক্তির সঙ্গে সমাজের সম্পর্ক ও সামাজিক সংহতির ঘাটতিও এমন ঘটনার পেছনে ভূমিকা রাখতে পারে।
মরিয়মের ঘটনাতেও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। গত জুলাইয়ে গাজী নজরুল ইসলামের সঙ্গে মরিয়মের একটি ব্যক্তিগত ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার কথা বিভিন্ন প্রতিবেদনে এসেছে। ভিডিওটি কে বা কারা প্রথম ছড়িয়েছে, কারা পরে তা প্রচার করেছে এবং এর ফলে মরিয়ম কী ধরনের সামাজিক ও মানসিক চাপের মুখে পড়েছিলেন এসব বিষয়ও তদন্তের আওতায় আসার দাবি উঠেছে।
কারও ব্যক্তিগত ছবি বা ভিডিও অনুমতি ছাড়া ছড়িয়ে পড়লে সেটি মুহূর্তেই হাজারো মানুষের কাছে পৌঁছে যেতে পারে। পোস্ট সরিয়ে ফেললেও স্ক্রিনশট বা কপি থেকে যেতে পারে। ফলে ভুক্তভোগীর ব্যক্তিগত পরিসর মুহূর্তের মধ্যে জনসম্মুখে চলে আসে। কটূক্তি, বিদ্রূপ কিংবা অবাঞ্ছিত মন্তব্য পরিস্থিতিকে আরও কঠিন করে তুলতে পারে।
এ ধরনের ঘটনাকে সমাজ ও অপরাধ বিশ্লেষকেরা ‘ডিজিটাল হয়রানি’ বা অনলাইন নিপীড়নের বৃহত্তর বাস্তবতার সঙ্গে মিলিয়ে দেখছেন। তবে মরিয়মের মৃত্যুর সঙ্গে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিওর সরাসরি সম্পর্ক ছিল কি না, সেটি তদন্ত ছাড়া নিশ্চিতভাবে বলা যায় না।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক সাইফুল আলম বলেন, মরিয়মের পরিবার বিয়ের পর শারীরিক ও মানসিক নির্যাতনের অভিযোগ করেছে এবং আত্মহত্যায় প্ররোচনার কথাও মামলায় উল্লেখ করা হয়েছে। এসব অভিযোগের সত্যতা তদন্তে নির্ধারিত হবে বলে তিনি মনে করেন। একই সঙ্গে মরিয়মের ব্যক্তিগত সম্পর্ক, ক্ষমতার ভারসাম্য, নিরাপত্তা এবং তার ওপর কোনো ধরনের চাপ ছিল কি না এসব বিষয়ও খতিয়ে দেখা প্রয়োজন বলে মত দেন তিনি।
তার মতে, একজন মানুষের জীবনে সংকট সাধারণত একটি মাত্র কারণে তৈরি হয় না। সম্পর্কের টানাপোড়েন, পারিবারিক দ্বন্দ্ব, সামাজিক অপমান, ডিজিটাল হয়রানি, একাকিত্ব, ভয় কিংবা ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তা বিভিন্ন চাপ একসঙ্গে কাজ করতে পারে। তাই মরিয়মের ঘটনাকে শুধু দাম্পত্য বিরোধ, সম্পর্কের সংকট কিংবা একজন ব্যক্তির দায় হিসেবে দেখলে ঘটনার অনেক দিক অজানা থেকে যেতে পারে।
মরিয়মের মৃত্যুর পর তার বিছানা থেকে হাতে লেখা কিছু চিরকুট উদ্ধারের কথাও সংবাদমাধ্যমে এসেছে। সেখানে প্রথম স্ত্রীর অধিকার, ভালোবাসা ভাগ হয়ে যাওয়ার কষ্ট এবং নিজেকে প্রতারিত ও পরাজিত মনে করার মতো অনুভূতির কথা থাকার দাবি করা হয়েছে। এসব চিরকুটের বিষয়বস্তু ও ঘটনার সঙ্গে এর সম্পর্কও তদন্তের মাধ্যমে যাচাই করা প্রয়োজন।
অন্যদিকে সমাজের দৃষ্টিভঙ্গি নিয়েও প্রশ্ন তুলছেন বিশ্লেষকেরা। কোনো নারী নির্যাতন বা সামাজিক সংকটে পড়লে অনেক সময় তার পাশে দাঁড়ানোর বদলে তার ব্যক্তিগত জীবন, সম্পর্ক কিংবা সিদ্ধান্ত নিয়ে প্রশ্ন তোলা হয়। ভুক্তভোগীর বদলে তার চরিত্রকে আলোচনার কেন্দ্রে নিয়ে আসার প্রবণতা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলতে পারে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. আ ক ম জামাল উদ্দিন বলেন, কোনো নারী চরম নির্যাতনের শিকার হয়ে সামাজিক বা প্রাতিষ্ঠানিক সুরক্ষা না পেলে নিজেকে একা ও গুরুত্বহীন মনে করতে পারেন। তার মতে, প্রভাবশালী ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে পারিবারিক বা মানসিক সহিংসতার অভিযোগকে ‘পারিবারিক বিষয়’ হিসেবে এড়িয়ে যাওয়ার প্রবণতা ভুক্তভোগীর জন্য ঝুঁকি বাড়াতে পারে।
ইস্ট ওয়েস্ট ইউনিভার্সিটির সমাজবিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষক ও গবেষক ড. রাসেল হোসেনও মরিয়মের ঘটনাকে বৃহত্তর সামাজিক বাস্তবতার আলোকে দেখার পরামর্শ দিয়েছেন। তার মতে, পারিবারিক সংকট, সামাজিক বৈষম্য ও একাকিত্বের মতো বিষয়গুলো একজন মানুষের ওপর দীর্ঘমেয়াদি চাপ তৈরি করতে পারে। বিপদের সময়ে পরিবার ও সমাজ তাকে কীভাবে সহায়তা করছে, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ।
তিনি বলেন, মরিয়মের মৃত্যুর তদন্ত শুধু ফ্ল্যাট, মরদেহ, ময়নাতদন্ত ও এজাহারের মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে তার জীবনের শেষ কয়েক মাসের ঘটনাপ্রবাহও খতিয়ে দেখা প্রয়োজন। ভিডিও ছড়িয়ে পড়ার পর কী ঘটেছিল, কারা তার সঙ্গে যোগাযোগ করেছিল, তিনি কোনো হুমকি পেয়েছিলেন কি না, কারও কাছে সাহায্য চেয়েছিলেন কি না এসব প্রশ্নের উত্তর জানা দরকার।
এসব প্রশ্নের উত্তর মরিয়মকে ফিরিয়ে আনতে পারবে না। তবে ভবিষ্যতে একই ধরনের পরিস্থিতিতে থাকা অন্য কাউকে সুরক্ষা দেওয়ার ক্ষেত্রে তা গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে।
ডিজিটাল যুগে ব্যক্তিগত তথ্য, ছবি বা ভিডিও ছড়িয়ে পড়া ঠেকানো ক্রমেই কঠিন হয়ে উঠছে। একটি ব্যক্তিগত মুহূর্ত কয়েক মিনিটের মধ্যে হাজারো মানুষের হাতে পৌঁছে যেতে পারে। আর সেই প্রচারের কেন্দ্রে থাকা ব্যক্তি সামাজিক চাপ, অপমান ও হয়রানির মুখে পড়তে পারেন।
মরিয়মের মৃত্যুর ঘটনায় তাই আইনি তদন্তের পাশাপাশি ডিজিটাল পরিবেশ, সামাজিক প্রতিক্রিয়া এবং পারিবারিক পরিস্থিতির ভূমিকাও সামনে এসেছে। তার মৃত্যুর জন্য কে বা কারা দায়ী তা তদন্ত ও আদালতের মাধ্যমে নির্ধারিত হবে। কিন্তু ঘটনাটি একই সঙ্গে সমাজের সামনে একটি প্রশ্ন রেখে গেছে কোনো মানুষ যখন সংকটে পড়েন, তখন আমরা তাকে সহায়তা করি, নাকি তার ব্যক্তিগত জীবনকে বিচার করার আরও একটি কারণ খুঁজি?
মরিয়মের মৃত্যুর তদন্ত ও বিচার যেমন প্রয়োজন, তেমনি ব্যক্তিগত ভিডিও ছড়িয়ে দেওয়া, অনলাইন হয়রানি এবং ভুক্তভোগীকে সামাজিকভাবে একঘরে করে দেওয়ার সংস্কৃতি নিয়েও নতুন করে ভাবার প্রয়োজন রয়েছে। কারণ একটি মৃত্যুর পর শোক প্রকাশের চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো পরবর্তী এমন মৃত্যু ঠেকাতে সমাজ কতটা প্রস্তুত।
সূত্র: রূপালী বাংলাদেশ
