কেউ আঘাত পেয়ে থাকলে দুঃখ প্রকাশ করছি, কোনো ভুল করিনি: ইশরাক
কাগজ ডেস্ক
প্রকাশ: ১৯ অক্টোবর ২০২৬, ০৭:০৮ পিএম
জাতীয় প্রেস ক্লাবে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে বক্তব্য দেন ইশরাক হোসেন। ছবি: সংগৃহীত
মাদকবিরোধী অভিযানে আগ্নেয়াস্ত্র হাতে নেওয়ার ঘটনায় বিতর্কের মধ্যে মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক প্রতিমন্ত্রীর পদ থেকে স্বেচ্ছায় অব্যাহতি চেয়েছেন বলে জানিয়েছেন ইশরাক হোসেন। তাঁর দাবি, ওই দিন আত্মরক্ষার প্রয়োজনেই তিনি নিজের লাইসেন্স করা অস্ত্র হাতে রেখেছিলেন। তবে এ ঘটনায় কেউ আঘাত পেয়ে থাকলে তিনি দুঃখ প্রকাশ করেছেন। একই সঙ্গে তিনি বলেছেন, সেদিন তিনি কোনো ভুল করেননি এবং মাদকের বিরুদ্ধে তাঁর অভিযান অব্যাহত থাকবে।
সোমবার (১৯ অক্টোবর) দুপুরে রাজধানীর জাতীয় প্রেসক্লাবে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে এসব কথা বলেন ইশরাক হোসেন। প্রতিমন্ত্রীর পদ থেকে পদত্যাগের ঘোষণা দিতে পূর্বনির্ধারিত এ সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করা হয়।
বেলা পৌনে দুইটার দিকে নেতা-কর্মীদের নিয়ে জাতীয় প্রেসক্লাবের আবদুস সালাম হলে প্রবেশ করেন ইশরাক। এ সময় তাঁর অনুসারীরা ‘রাজপথের ইশরাক ভাই, আমরা তোমায় ভুলি নাই’, ‘ইশরাক ভাই ভয় নাই, রাজপথ ছাড়ি নাই’ এবং ‘মাদকের আস্তানা, ভেঙে দাও, গুঁড়িয়ে দাও’সহ বিভিন্ন স্লোগান দেন। বেলা দুইটার দিকে সংবাদ সম্মেলন শুরু হয়।
আগ্নেয়াস্ত্র প্রদর্শনের ঘটনা সম্পর্কে ইশরাক হোসেন বলেন, ‘যদি আমার দ্বারা কোনো ভুল হয়ে থাকে, আমি কাউকে আঘাতপ্রাপ্ত করে থাকি এই অভিযানের মাধ্যমে, সেটার জন্য আগে আমি দুঃখ প্রকাশ করে নিচ্ছি। কিন্তু আমি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি, আমি কোনো ভুল সেদিন করিনি। আমি কেবল আমার নিরাপত্তার জন্য আমার হাতে অস্ত্রটুকু যতটুকু সময় প্রয়োজন রেখেছিলাম, পরবর্তীকালে সেটি আর আমার দৃশ্যমান হয়নি।’
প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব থেকে সরে দাঁড়ানোর বিষয়ে ইশরাক বলেন, তিনি সোমবার থেকে মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব থেকে স্বেচ্ছায় অব্যাহতি চেয়ে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে জানিয়েছেন। ঢাকা-৬ আসন ও আশপাশের এলাকায় মাদক নির্মূলসহ জনজীবনের বিভিন্ন সমস্যা নিয়ে কাজ করতে চান বলেও প্রধানমন্ত্রীকে জানিয়েছেন তিনি।
আরও পড়ুন: ‘পাপের লাশ চাই না’ বলে ক্ষমা চাইলেন এমপি রতন
ইশরাক বলেন, ‘আমি তাঁকে বলেছি, পুরো সময়টাতে ঢাকা-৬ আসন, পার্শ্ববর্তী এলাকা, পরবর্তী সময়ে আরও যদি এলাকা থাকে, সেখানকার মাদক নির্মূল এবং আমাদের জাতীয় জনজীবনের অন্যান্য সমস্যা নিয়ে কাজ করতে চাই। তিনি সদয় সম্মত হয়েছেন এবং আমাকে সুযোগ করে দিয়েছেন— “ঠিক আছে যাও, এলাকা ঠিক করে এলাকায় কাজ করো।”’
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান নির্বাচন-পরবর্তী সময়ে তাঁকে প্রথম মন্ত্রিসভায় স্থান দিয়েছিলেন উল্লেখ করে ইশরাক বলেন, তিনি দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ও গৌরবোজ্জ্বল মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করছিলেন।
সাম্প্রতিক ঘটনাটি নিয়ে দেশি-বিদেশি গণমাধ্যমে প্রকাশিত খবরের প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, গত দুই-তিন দিন ধরে বিষয়টি নিয়ে নানা আলোচনা হচ্ছে। এ নিয়ে প্রকাশিত প্রতিবেদনের কিছু তথ্য সত্য হলেও কিছু খবর অতিরঞ্জিত হয়েছে বলে তাঁর দাবি। ঘটনার প্রকৃত বিবরণ তুলে ধরতেই তিনি সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করেছেন।
আত্মরক্ষার জন্য অস্ত্র হাতে নিয়েছিলেন বলে দাবি
ঘুণ্টিঘরে মাদকবিরোধী অভিযানে যাওয়ার বিষয়ে ইশরাক হোসেন বলেন, পূর্বপরিকল্পনা অনুযায়ী তাঁরা সেখানে গিয়েছিলেন এবং যাওয়ার আগে থানাকে জানিয়েছিলেন। তাঁর লাইসেন্স করা আগ্নেয়াস্ত্রটি সব সময় কোমরে থাকে। ওই দিন কোনো অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতি তৈরি হলে আত্মরক্ষার জন্য তিনি অস্ত্রটি হাতে নিয়েছিলেন বলে দাবি করেন।
ইশরাকের ভাষ্য, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিওতে তিনি নিশ্চিত করেছেন, মাদকাসক্ত ব্যক্তিদের হাতে কোনো অস্ত্র ছিল না।
ঘটনার পর পূজামণ্ডপ পরিদর্শনে গিয়েছিলেন জানিয়ে তিনি বলেন, রাতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একটি ভিডিও ছড়িয়ে পড়তে দেখেন। পরে বিভিন্ন গণমাধ্যমে এ নিয়ে নানা শিরোনামে প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়।
ইশরাক বলেন, ঘটনার দিন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান রাজধানীর ১৩টি স্থান পরিদর্শন করেছিলেন, যা প্রশংসনীয় উদ্যোগ। কিন্তু তাঁকে নিয়ে প্রকাশিত সংবাদ ও আলোচনা প্রধানমন্ত্রীর ওই কার্যক্রমগুলোকে আড়াল করে দিয়েছে।
পরে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে দেখা করে মাদকের ভয়াবহতা তুলে ধরেন বলে জানান ইশরাক। এ সময় তিনি নিজের পদত্যাগের ইচ্ছার কথাও জানান। তাঁর কর্মকাণ্ডের কারণে প্রধানমন্ত্রীর উদ্যোগগুলো ম্লান হয়ে যাক, তা তিনি চাননি বলে উল্লেখ করেন। তবে প্রতিমন্ত্রীর পদ থেকে সরে দাঁড়ালেও মাদকের বিরুদ্ধে অভিযান চালিয়ে যাওয়ার ঘোষণা দেন তিনি।
আরও পড়ুন: আমি টার্গেটের শিকার: ইশরাক
প্রেসক্লাব থেকে বেরিয়ে পদত্যাগের ঘোষণা পুনর্ব্যক্ত
সংবাদ সম্মেলন শেষে নেতা-কর্মীদের নিয়ে জাতীয় প্রেসক্লাব ভবনের তিনতলা থেকে নিচে নেমে আসেন ইশরাক হোসেন। এ সময়ও তাঁর অনুসারীরা বিভিন্ন স্লোগান দিতে থাকেন। পরে প্রেসক্লাব প্রাঙ্গণে নিজের গাড়িতে উঠে নেতা-কর্মীদের উদ্দেশে হাত নাড়েন তিনি।
এরপর গাড়ির ছাদ খুলে হ্যান্ডমাইকে সংক্ষিপ্ত বক্তব্য দেন ইশরাক। সেখানে প্রতিমন্ত্রীর পদ থেকে সরে দাঁড়ানোর ঘোষণা পুনর্ব্যক্ত করেন তিনি।
বক্তব্য শেষে গাড়িতে দাঁড়িয়ে নেতা-কর্মীদের অভিবাদন জানান ইশরাক। বেলা ২টা ৫৬ মিনিটের দিকে তিনি প্রেসক্লাব প্রাঙ্গণ ত্যাগ করেন। তাঁর গাড়ি প্রেসক্লাবের সামনে থেকে বেরিয়ে শিক্ষা ভবন হয়ে সচিবালয়ের দিকে যায়। পরে জিরো পয়েন্ট হয়ে গোপীবাগের দিকে যান তিনি। এ সময় তাঁর সঙ্গে নেতা-কর্মীরাও ছিলেন।
এর আগে রোববার সরকারসংশ্লিষ্ট উচ্চপর্যায়ের একাধিক সূত্র জানায়, মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক প্রতিমন্ত্রী ইশরাক হোসেনকে মন্ত্রিসভা থেকে পদত্যাগের নির্দেশ দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। সূত্রগুলোর ভাষ্য অনুযায়ী, রোববার বিকেলে সচিবালয়ে মন্ত্রিসভার বৈঠক শেষে ইশরাককে ডেকে পাঠান প্রধানমন্ত্রী। সেখানেই তাঁকে পদত্যাগের নির্দেশ দেওয়া হয়।
গত শনিবার রাজধানীর গেন্ডারিয়ার ঘুণ্টিঘরে মাদকবিরোধী অভিযানে গিয়ে আগ্নেয়াস্ত্র উঁচিয়ে ধরেন ইশরাক হোসেন। তাঁর সঙ্গে থাকা ব্যক্তিদের হাতেও অস্ত্র দেখা যায়। এ ঘটনার ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর একজন প্রতিমন্ত্রীর এভাবে অস্ত্র প্রদর্শন করে অভিযানে অংশ নেওয়া নিয়ে প্রশ্ন ওঠে।
ঘটনাটি নিয়ে বিএনপি ও সরকারের ভেতরেও অস্বস্তি ও অসন্তোষ তৈরি হয় বলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা জানান। তাঁদের মতে, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান যখন রাজধানীর বিভিন্ন হাসপাতাল, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও সরকারি আবাসিক এলাকা আকস্মিকভাবে পরিদর্শন করে বিভিন্ন সমস্যা চিহ্নিত করছেন, তখন একজন প্রতিমন্ত্রীর এমন কর্মকাণ্ড সরকারকে বিব্রতকর পরিস্থিতিতে ফেলেছে।
তবে সমালোচনার মুখে নিজের ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজে দেওয়া এক বিবৃতিতে ইশরাক হোসেন দাবি করেছিলেন, তিনি মাদকবিরোধী সামাজিক প্রতিরোধ কর্মসূচিতে অংশ নিতে সেখানে গিয়েছিলেন। পুলিশ, স্থানীয় রাজনৈতিক নেতা ও সামাজিক নেতাদের যৌথ সিদ্ধান্তে ওই কর্মসূচি নেওয়া হয়েছিল বলে বিবৃতিতে উল্লেখ করেন তিনি।
