দেশের চলমান পরিস্থিতি নিয়ে বাম দলগুলোর বিবৃতি
কাগজ প্রতিবেদক
প্রকাশ: ০৩ আগস্ট ২০২৪, ০৮:৫৬ পিএম
বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সমাবেশে অংশ নেয়া মানুষের একাংশ। ছবি: ভোরের কাগজ
কোটা আন্দোলন ঘিরে পরিস্থিতিতে স্বৈরতান্ত্রিক ক্ষমতা কাঠামোর পরিবর্তন করে গণতান্ত্রিক শাসন কায়েম করার আহ্বান জানিয়েছে দেশের অধিকাংশ বাম দলগুলো। শনিবার সংবাদপত্রে দেয়া এক বিবৃতিতে দেশের বর্তমান পরিস্থিতিতে উদ্বেগ প্রকাশ করে তারা বলেন, গত কয়েকদিনে দেশে একদিকে যেমন রাষ্ট্র সরকারের পক্ষ থেকে স্মরণকালের ভয়াবহতম রাজনৈতিক দমন, পীড়ন, হত্যাযজ্ঞ চালানো হয়েছে আর অপরদিকে ছাত্র-জনতার অভূতপূর্ব গণঅভ্যুত্থান সংগঠিত হয়েছে। নেতারা দমন পীড়ন নীতি বন্ধ করা ও এ স্বৈরাচারী সরকারের পদত্যাগের দাবি জানিয়েছে।
বাম গণতান্ত্রিক জোটের কেন্দ্রীয় সমন্বয়ক ও বাসদের সাধারণ সম্পাদক বজলুর রশীদ ফিরোজ, বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির সিপিবির সভাপতি মো. শাহ আলম, সাধারণ সম্পাদক রুহিন হোসেন প্রিন্স, বাংলাদেশ জাসদ এর সভাপতি শরীফ নূরুল আম্বিয়া, সাধারণ সম্পাদক নাজমুল হক প্রধান, বিপ্লবী কমিউনিস্ট লীগের সাধারণ সম্পাদক ইকবাল কবির জাহিদ, গণতাান্ত্রিক বিপ্লবী পার্টি সাধারণ সম্পাদক মোশরেফা মিশু, বাসদ (মার্কসবাদী) সমন্বয়ক মাসুদ রানা, সমাজতান্ত্রিক পার্টির নির্বাহী সভাপতি আব্দুল আলী প্রমুখ বাম নেতারা এ দাবি জানান।
বিবৃতিতে বলা হয়, এই কয়েকদিনে ফ্যাসিবাদী আওয়ামী লীগ সরকারের দানবীয় আক্রমণ প্রত্যক্ষ করেছে দেশের মানুষ। ছাত্রদের ন্যায়সঙ্গত দাবিতে গড়ে উঠা বৈষম্য বিরোধী ছাত্র আন্দোলন দমন করতে অন্তত ২১৩ জনকে হত্যা, (আন্দোলনকারীদের দাবি ২৬৬), ৭ হাজারের বেশি আহত, ১২ হাজারের বেশি গ্রেপ্তার, আড়াই লাখের মত অজ্ঞাতনামা আসামি করে মামলা করা হয়েছে (পত্রিকার খবর অনুযায়ী)। এই ধরনের রাষ্ট্রীয় দমনের চিত্র এই ভূখণ্ডের মানুষ পাকিস্তান আমলে এবং বাংলাদেশের গত ৫৩ বছরে আর দেখেনি।
বিবৃতিতে বলা হয়, ১ জুলাই থেকে ১৪ তারিখ পর্যন্ত এই আন্দোলন শান্তিপূর্ণ এবং ক্রমাগত শক্তি অর্জন করে সারাদেশে গ্রাম পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়ে। যেখানে স্কুলের ছাত্ররাও ব্যাপকহারে অংশ নেয়। মুক্তিযুদ্ধকে আন্দোলনের বিপরীতে দাঁড় করানোর চেষ্টা, আন্দোলনকারীদের প্রতি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার অপমানজনক ও কুরুচিপূর্ণ উক্তি এবং সেতু মন্ত্রী ওবায়দুল কাদেরের ছাত্রলীগকে লেলিয়ে দেয়ার উস্কানিতে (যা ফৌজদারি অপরাধ) ছাত্রলীগ-যুবলীগ নৃশংস আক্রমণে ঝাপিয়ে পড়ে আন্দোলনকারীদের উপর। শত শত শিক্ষার্থী আহত হয়, নারী শিক্ষার্থীদের উপর ন্যাক্কারজনক হামলা পরিচালনা করা হয় এবং আহত ও চিকিৎসাধীন শিক্ষার্থীদের উপরে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালেও আক্রমণ করে ছাত্রলীগ সন্ত্রাসীরা।
ফলশ্রুতিতে সাধারণ শিক্ষার্থীদের প্রবল প্রতিরোধে একের পর এক বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজ থেকে পালিয়ে যেতে বাধ্য হয় ছাত্রলীগ নেতাকর্মী ও সন্ত্রাসী ক্যাডাররা। এরপর শুরু হয় রাষ্ট্রীয় বাহিনীর আক্রমণ। একটি বিষয় লক্ষণীয় ২০১৮ এবং ২০২৪ সালে দু’বারই শাসকশ্রেণি তাদের দুর্নীতি, দুঃশাসন ও অপকর্মকে আড়াল করতে মুক্তিযুদ্ধকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করে আন্দোলনকারীদের মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দেয়। আরো লক্ষ্যণীয় দেশের পুলিশ, র্যাব, বিজিবি ও সেনাবাহিনীর প্রধানরা রাজনৈতিক দলের নেতাদের মত বক্তব্য দিয়ে পরিস্থিতি আরো জটিল করে ফেলে যা দেশের ভবিষ্যতের জন্য মারাত্মক হুমকীস্বরূপ।
বিবৃতিতে নেতৃবৃন্দ বলেন, হাসপাতাল থেকে আহত ছাত্র নেতাদের গ্রেপ্তার, ডিবি কার্যালয়ে নিয়ে আটকে রাখা ও নির্যাতন করা, জোর করে তাদের দিয়ে আন্দোলন প্রত্যাহারের ঘোষণা দিয়ে প্রেস কনফারেন্স করানো, তাদেরকে খাওয়ানোর নামে মশকরা করা এবং ছবি প্রচারমাধ্যমে দিয়ে অপমান করা সবই করেছে রাষ্ট্রীয় এই সংস্থা।
আর একের পর এক মিথ্যাচার করে নিজেদেরকে বাঁচাবার ব্যর্থ চেষ্টা করছে সরকার। যার সর্বনিকৃষ্ট প্রমাণ পুলিশের গুলিতে নিহত সাঈদকে আন্দোলনকারীদের ইট পাটকেলের আঘাতে মৃত্যু বলে রিপোর্ট দেয়া, গণভবনে নিহতদের নির্বাচিত স্বজনদের মধ্যে চেক বিতরণের ফলাও প্রচার করা। কিন্তু আমরা মনে করি টাকার চেক দিয়ে রক্তের দাগ মুছতে পারবে না এই সরকার।
এরা মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে বাণিজ্যের পণ্য বানিয়েছে, সহানুভুতি দেখিয়ে রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাসকে আড়াল করতে চাইছে, এখন মুক্তিযুদ্ধের আবেগকে কাজে লাগিয়ে নিপীড়নের হাতিয়ার করে জনগণকে বিভ্রান্ত করে ক্ষমতায় থাকার চেষ্টা হিসেবে জামাত-শিবির নিষিদ্ধের কথা বলছে। কিন্তু দুর্নীতি এবং দুঃশাসন চালিয়ে, শত শত ছাত্র জনতার রক্ত ঝরিয়ে আওয়ামী লীগ সরকার কোনভাবেই তাদের অপকর্মকে আড়াল করে ক্ষমতায় থাকতে পারবে না।
