জন্মদিনে শ্রদ্ধার্ঘ্য
বিপ্লবী প্রীতিলতা: মৃত্যুকে জয় করে বাঁচতে শিখিয়েছিলেন যিনি
ফেরদৌস আরেফীন
প্রকাশ: ০৫ মে ২০২৬, ০৬:২৫ পিএম
ছবি: কৃত্তিম বুদ্ধিমত্তা
বাতাস আজ বিষণ্ণ। মে মাসের প্রথম পঞ্চমী এই দিনটির গায়ে মাখা ইতিহাসের এক রক্তিম আভা। ১৯১১ সালের এই দিনে চট্টগ্রামের এক মধ্যবিত্ত পরিবারের কোল আলোকিত করেছিল এক দামিনী। নাম তাঁর প্রীতিলতা। প্রীতিলতা ওয়াদ্দেদার। পিতার নাম জগবন্ধু ওয়াদ্দেদার, মাতা প্রতিভা দেবী। ছেলেবেলা থেকেই ছিল অসীম সাহস, অসাধারণ মেধা আর প্রখর দেশপ্রেম। যখন গোটা ভারতবর্ষ ব্রিটিশ শৃঙ্খলে যন্ত্রণায় কাতর, তখন ছোট্ট প্রীতিলতা পড়তে শিখেছে ‘বন্দে মাতরম’-এর মন্ত্র।
বিদ্যালয়ে পাঠ নেওয়ার পাশাপাশি তিনি জেনেছেন চট্টগ্রামের অগ্নিযুগের কথা। সূর্য সেন, যাঁর ডাকনাম ‘মাস্টারদা’, তিনি বোমা-পিস্তল তুলে দিয়েছিলেন তরুণ-তরুণীদেরস হাতে। প্রীতিলতা দেখলেন নারীরাও পিছিয়ে নেই। কল্পনা দত্ত, কল্যাণী দাস, প্রীতিলতা নিজেও... তাঁরা একেকজন যেন হয়ে উঠেছিলেন বিপ্লবের শান দেওয়া একেকটি অস্ত্র।
ডাইরির পাতায় প্রীতিলতা লিখেছিলেন একদিন, ‘মৃত্যু ভয় পায় তাকে, যে মৃত্যুকে সঙ্গী করে বাঁচে।’
ইতিহাস সাক্ষী, তিনি সত্যিই মৃত্যুকে সঙ্গী করেছিলেন। শুধু সঙ্গী নয়, বরণ করেছিলেন আলিঙ্গনে।
১৯৩২ সালের ২৪ সেপ্টেম্বর। পাহাড়তলী ইউরোপীয়ান ক্লাব। যে ক্লাবে সাদা চামড়ার বড়লাটরা উপভোগ করত নিষিদ্ধ আমোদ, আর প্রবেশের অযোগ্য ছিল শিক্ষিত-অশিক্ষিত নির্বিশেষে বাংলার মানুষ। প্রীতিলতার নেতৃত্বে একদল বিপ্লবী ক্লাব আক্রমণের পরিকল্পনা করেন। লক্ষ্য- এই ক্লাবের অহংকার ধূলিসাৎ করা, আর ব্রিটিশ সরকারের নাকের উপর দিয়ে বিদ্রোহের বার্তা পৌঁছে দেওয়া।
প্রীতিলতার পরনে সিল্কের শাড়ি, হাতে রিভলবার। সঙ্গী কালীপদ চক্রবর্তী, প্রাণেশ দাশ, বীরেশ্বর রায় আর কল্পনা দত্ত। সবাই সেজেছেন অভিজাত পোশাকে, যাতে ক্লাবের দারোয়ান সন্দেহ না করে। ঘড়ির কাঁটা যখন রাত সাড়ে দশটা। হঠাৎ আক্রমণ শুরু। হাতে-হাতে লড়াই, গুলির আওয়াজে চিৎকার উঠল চারদিকে। সাহেব-মেমদের ভীত সন্ত্রস্ত চিৎকার ভেসে এলো।
প্রীতিলতা গুলি করতে করতে ক্লাবের ভেতরে ঢুকে পড়লেন। পুলিশ বাহিনী পাল্টা গোলাগুলি শুরু করল। প্রাণেশ দাশ ও কল্পনা দত্ত গুরুতর আহত হলেন। প্রীতিলতা বুঝলেন, পরিকল্পনা সফল হলেও ধরা পড়া নিশ্চিত। কিন্তু ব্রিটিশ জল্লাদের হাতে ধরা তাঁর কাছে ছিল অসম্ভবের মতো। হাতে ছিল সায়ানাইডের শিশি। মুখে তুলে নিলেন। সঙ্গে সঙ্গে চিৎকার করে বললেন, ‘জয় হোক বিপ্লবের, জয় হোক স্বাধীনতার।’ পরের মুহূর্তেই এলিয়ে পড়লেন মাটিতে।
মৃত্যু তাঁকে স্পর্শ করতে পারেনি। বরং তিনি মৃত্যুকে জয় করে চিরভাস্বর হয়েছিলেন।
‘বাঁচার মানে শুধু শ্বাস নেওয়া নয়, বাঁচার মানে মৃত্যুর চেয়েও বড় কিছু রেখে যাওয়া’ -মাত্র ২১ বছর বয়সে এই বোধ কী অদ্ভুত! মৃত্যুকে জয় করে প্রীতিলতা রেখে গেলেন এক অবিনশ্বর দৃষ্টান্ত।
আজ ৫ মে তাঁর জন্মদিন। প্রজন্মের পর প্রজন্ম তাঁকে স্মরণ করে বইমেলায়, শহীদ মিনারে, স্কুল-কলেজের নাটকের মঞ্চে। কিন্তু তাঁর আসল প্রয়োজন আজকের নারীদের হৃদয়ে, যেন তাঁরা বোঝে নারী মানে শুধু কোমলতা নয়; নারী মানে দুর্দমনীয় ইচ্ছাশক্তি, নারী মানে তেজোদীপ্ত প্রণামী, নারী মানে প্রীতিলতা।
লেখক: সাংবাদিক
