×

স্মরণ

ভীমনালি গণহত্যা

যুদ্ধ শেষ হলেও যার নির্মমতা থামেনি

Icon

ফেরদৌস আরেফীন

প্রকাশ: ২২ মে ২০২৬, ০৯:৩৩ এএম

যুদ্ধ শেষ হলেও যার নির্মমতা থামেনি

ভীমনালি গণহত্যা আমাদের শিক্ষা দেয় যে ধর্মীয় ও জাতিগত বিদ্বেষ কতটা ভয়াবহ পরিণতি ডেকে আনতে পারে

বাংলাদেশের মহান মুক্তিযুদ্ধের নয় মাসে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী ও তাদের স্থানীয় দোসররা দেশের বিভিন্ন প্রান্তে অসংখ্য গণহত্যা সংঘটিত করে। এরমধ্যে একটি নির্মম অধ্যায় হলো পিরোজপুরের মঠবাড়িয়ার ভীমনালি গণহত্যা। 

১৯৭১ সালের ২২ মে পাকিস্তানি বাহিনীর সহযোগী শান্তি কমিটির সদস্যরা এই গ্রামে আক্রমণ চালিয়ে ১৫ জন নিরীহ বাঙালি হিন্দুকে গুলি করে হত্যা করে। তুলনামূলকভাবে ছোট আকারের এই গণহত্যাটি পরবর্তী বিচার ও ন্যায়ের প্রক্রিয়ায় এক করুণ পরিণতির সাক্ষী হয়ে ওঠে, যা মুক্তিযুদ্ধের অপরাধের বিচারের জটিলতা ও দীর্ঘসূত্রতার একটি প্রতিচ্ছবি হয়ে আছে।

ভীমনালি গ্রামটি বর্তমান বাংলাদেশের পিরোজপুর জেলার মঠবাড়িয়া উপজেলার সাপলেজা ইউনিয়নে অবস্থিত। নালি খালের পাড়ে গড়ে ওঠা এই গ্রামটি মঠবাড়িয়া উপজেলা সদর থেকে প্রায় ১৮ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত। ১৯৭১ সালে এটি একটি প্রধানত বাঙালি হিন্দু অধ্যুষিত গ্রাম ছিল। ওই সময় গ্রামটিতে ৮০টি বাঙালি হিন্দু পরিবার বসবাস করত, যারা ওয়াপডা বাঁধের পাশে বসতি স্থাপন করেছিল।

মুক্তিযুদ্ধের সময় ভীমনালির যোগাযোগ ব্যবস্থা মারাত্মকভাবে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছিল। গ্রামটি কার্যত দেশের অন্যান্য অংশ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়, আর এই কারণে গ্রামটিতে মুক্তিযোদ্ধাদের যাতায়াত ছিল নিয়মিত। আশপাশের গ্রামের অনেক বাঙালি হিন্দুও নিরাপত্তার আশায় ভীমনালিতে আশ্রয় নিয়েছিলেন।

১৯৭১ সালের ১৬ মে তুষখালী গ্রামে এক জনসভায় আবদুল জব্বার ইঞ্জিনিয়ার নামে এক শান্তি কমিটির নেতা ঘোষণা করেন যে মুক্তিযোদ্ধা, আওয়ামী লীগ কর্মী ও হিন্দুরা পাকিস্তানের শত্রু এবং তাদের ধ্বংস করতে হবে। এই জনসভার পরপরই পাকিস্তানপন্থীরা তুষখালী গ্রামের হিন্দু মহল্লা কালুপাড়া ও নাথপাড়ায় হামলা চালায়। ভীমনালির জন্য এই হামলা ছিল পরবর্তী বড় বিপর্যয়ের ইঙ্গিত।

১৯৭১ সালের ২২ মে সকাল ১০টার দিকে প্রায় ৫০০ জন সশস্ত্র দোসর ভীমনালি গ্রাম ঘিরে ফেলে। এই দোসররা ছিলেন শান্তি কমিটির সদস্য এবং পাকিস্তানি বাহিনীর স্থানীয় সহযোগী। বিপদ টের পেয়ে গ্রামবাসীরা বড়ুই পরিবারের বাড়িতে জড়ো হন। দোসররা গ্রামের দিকে এগিয়ে এলে প্রায় ২০০ বাঙালি হিন্দু গ্রামবাসী নিজেদের রক্ষায় লাঠি, বর্শা ও ঢাল নিয়ে ওয়াপডা বাঁধে অবস্থান নেন। তারা নির্ভীকভাবে আক্রমণকারীদের মোকাবিলা করার চেষ্টা করেন। বর্শা ও ঢালের মতো দেশীয় অস্ত্রে সজ্জিত এই নিরীহ গ্রামবাসীরা তাদের প্রাণের টানে, বাড়ি-ঘরের মায়ায় সশস্ত্র দোসরদের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়েছিলেন। দোসররা গুলি চালানো শুরু করলে গ্রামবাসীরা ঢাল দিয়ে আত্মরক্ষার চেষ্টা করেন। কিন্তু অত্যাধুনিক আগ্নেয়াস্ত্রের মুখে তাদের প্রতিরোধ কিছুক্ষণের মধ্যেই ভেঙে পড়ে। দোসরদের গুলিতে ১৫ জন গ্রামবাসী সেখানেই নিহত হন। আবদুল জব্বার ইঞ্জিনিয়ার নিজে সেখানেই সখানাথ খরতি নামে এক ব্যক্তিকে গুলি করে হত্যা করেন। দোসর দলেরও এক সদস্য লালু খান নিহত হন। হত্যাকাণ্ডের পর দোসররা নিহতদের মৃতদেহ খালে ফেলে দেয়। তারপর তারা গ্রামের সব ৮০টি বাঙালি হিন্দু পরিবারের বাড়ি লুট করে এবং বাড়িঘরে আগুন ধরিয়ে দেয়। পুরো গ্রাম ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়।

গণহত্যার পর গ্রামের অধিকাংশ বাঙালি হিন্দু বাড়িঘর ছেড়ে অন্যত্র চলে যেতে বাধ্য হন। আতঙ্কের মধ্যে দিয়ে প্রাণ বাঁচাতে তারা আশ্রয় নেন বিভিন্ন স্থানে। মুক্তিযুদ্ধে বাংলাদেশের বিজয়ের পর এই পরিবারগুলোর অনেকে ফিরে এসে নিজেদের ধ্বংসপ্রাপ্ত বাড়ি পুনর্নির্মাণ করেন। 

স্বাধীনতার পর ১৯৭২ সালের ১৯ এপ্রিল গণহত্যায় বাঁচা এক ব্যক্তি, নাম যাজ্ঞেশ্বর বড়ুই, পিরোজপুরের মহকুমা আদালতে একটি মামলা দায়ের করেন। এই মামলায় ২৫৯ জন দোসরের নাম উল্লেখ করা হয়, যেখানে প্রধান আসামি করা হয় আবদুল জব্বার ইঞ্জিনিয়ারকে। কিন্তু মামলা দায়েরের মাত্র ছয় মাস পর রাতে অজ্ঞাত দুষ্কৃতিকারীরা যাজ্ঞেশ্বর বড়ুইকে তুলে নিয়ে যায় এবং তাকে গুলি করে হত্যা করে। গ্রামের আরেক বাসিন্দা বিনোদ বিহারী বড়ুই, যিনি হামলার সময় গ্রামের প্রতিরক্ষায় নেতৃত্ব দিয়েছিলেন, তাকেও শ্বাসরোধ করে হত্যা করা হয়। এরপর মামলার নথি আদালত ও থানা থেকে রহস্যজনকভাবে হারিয়ে যায়। এই ঘটনা মুক্তিযুদ্ধে সংঘটিত অপরাধের বিচার প্রক্রিয়ায় প্রতিহিংসা ও ন্যায়বিচারের লড়াইয়ের করুণ পরিণতির এক নিদারুণ উদাহরণ।

ভীমনালি গণহত্যা একাত্তরের বৃহত্তর বাঙালি গণহত্যার একটি অংশ। ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ রাতে পাকিস্তানি বাহিনী ‘অপারেশন সার্চলাইট’-এর মাধ্যমে ঢাকায় নিরস্ত্র বাঙালিদের ওপর হামলা চালিয়ে গণহত্যা শুরু করে। এই গণহত্যায় কেবল বাঙালি হিন্দুরাই নয়, বরং ধর্মনিরপেক্ষ বাঙালি মুসলমানরাও পাকিস্তানি বাহিনীর নির্দিষ্ট লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হয়েছিল। আট মাসেরও বেশি সময় ধরে চালানো এই গণহত্যায় প্রায় ৩০ লাখ মানুষ প্রাণ হারান এবং প্রায় এক কোটি মানুষ শরণার্থী হয়ে ভারতে আশ্রয় নেন।

সারা দেশের ন্যায় ভীমনালি গণহত্যায় পরিকল্পিতভাবে বাঙালি হিন্দু সম্প্রদায়কে লক্ষ্য করে হামলা চালানো হয়। এটি পাকিস্তানি বাহিনীর ‘ইস্ট পাকিস্তান থেকে হিন্দুদের নির্মূল করার’ বৃহত্তর পরিকল্পনারই একটি অংশ ছিল, যা সেই সময়ে জারি করা বিভিন্ন নির্দেশনায় স্পষ্ট ছিল।

মুক্তিযুদ্ধে ভীমনালি গণহত্যা একক ও বিচ্ছিন্ন ঘটনা ছিল না। একই সময়ে খুলনার ডুমুরিয়ার চুকনগরে ২০ মে পাকিস্তানি বাহিনী ও তাদের দোসররা প্রায় ১০ হাজার বাঙালিকে হত্যা করে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ সারা দেশের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, বুদ্ধিজীবী ও সাধারণ মানুষ নির্বিচারে হত্যার শিকার হন। সেসব গণহত্যার সঙ্গে ভীমনালির মিল হচ্ছে নিরস্ত্র ও নিরীহ মানুষকে পরিকল্পিতভাবে হত্যা করা এবং হিন্দু সম্প্রদায়কে বিশেষ লক্ষ্য করে তোলা।

একাত্তরের গণহত্যার সময় আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় মূলত নীরব ভূমিকা পালন করে। যুক্তরাষ্ট্র তৎকালীন পাকিস্তানি সামরিক শাসক ইয়াহিয়া খানের ঘনিষ্ঠ মিত্র ছিল। যদিও পৃথিবীর বিভিন্ন গণমাধ্যম ও বুদ্ধিজীবী মহল পাকিস্তানি বাহিনীর বর্বরতার প্রতিবাদ জানিয়েছিল, কিন্তু কার্যকর কোনো হস্তক্ষেপ ঘটেনি। খান আবদুল গাফফার খান (সীমান্ত গান্ধী) নামক পাকিস্তানের একজন বিশিষ্ট পশতুন নেতা ১৯৭১ সালের ২২ মে দিল্লিতে প্রকাশিত এক বিবৃতিতে পূর্ব পাকিস্তানের পরিস্থিতির তীব্র নিন্দা জানান। তিনি প্রশ্ন তোলেন, পাকিস্তানের শাসকেরা সবসময় ইসলামের কথা বললেও পূর্ব পাকিস্তানে যা চলছে তা ইসলাম সমর্থন করে কি না।

দুঃখজনকভাবে, ভীমনালি গণহত্যার স্মৃতিকে ধরে রাখার মতো এখন পর্যন্ত কোনো স্মৃতিসৌধ বা স্মারক স্থাপনা গড়ে ওঠেনি। দেশের আরও বহু গণহত্যার মতো এই গণহত্যার ইতিহাসও ধীরে ধীরে বিবর্ণ হয়ে যাচ্ছে। গণহত্যার স্থানটি শনাক্ত ও সংরক্ষণের উদ্যোগ গ্রহণ করা এখনো হয়নি। মুক্তিযুদ্ধের অন্যান্য গণহত্যার স্মৃতিচিহ্নের মতো ভীমনালি গণহত্যার স্মৃতিও রক্ষার অভাবে ধ্বংসের মুখে। মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর দেশব্যাপী গণহত্যার তথ্য ও নিদর্শন সংগ্রহ করে সংরক্ষণের কাজ চালিয়ে যাচ্ছে। খুলনায় গণহত্যা-নির্যাতন আর্কাইভ ও জাদুঘর নামে একটি বিশেষ জাদুঘরও গড়ে উঠেছে। এসব উদ্যোগের মাধ্যমে তরুণ প্রজন্ম ১৯৭১ সালের বর্বরতার প্রকৃত চিত্র জানতে পারছে। আশা করা যায়, ভবিষ্যতে ভীমনালি গণহত্যার ইতিহাসও যথাযথভাবে সংরক্ষিত হবে।

ভীমনালি গণহত্যা আমাদের শিক্ষা দেয় যে ধর্মীয় ও জাতিগত বিদ্বেষ কতটা ভয়াবহ পরিণতি ডেকে আনতে পারে। ১৯৭১ সালে পাকিস্তানি বাহিনী বাঙালি জাতিকে পরিকল্পিতভাবে নিধন করেছিল। সেই স্মৃতি আমাদের মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ও আদর্শকে লালন করার প্রেরণা জোগায়।

মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণকারী বীর মুক্তিযোদ্ধারা এ দেশের স্বাধীনতার জন্য আত্মোৎসর্গ করেছিলেন। ভীমনালির মতো ঘটনাগুলো স্মরণ করে আমরা তাদের সেই ত্যাগের মর্যাদা রক্ষা করি এবং ভবিষ্যতে যেন কোনো জাতির ওপর এমন অত্যাচার আর না ঘটে, সেদিকে সতর্ক থাকি।

ভীমনালি গণহত্যা একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধে পাকিস্তানি বাহিনী ও তাদের দোসরদের সংঘটিত অসংখ্য অপরাধের একটি করুণ ও নির্মম উদাহরণ। ১৯৭১ সালের ২২ মে প্রায় ৫০০ সশস্ত্র দোসরের হাতে ১৫ জন নিরীহ বাঙালি হিন্দুর প্রাণহানি, তাদের বাড়িঘর লুট ও ধ্বংস এই গণহত্যার মর্মান্তিক চিত্র। স্বাধীনতার পর ন্যায়বিচারের আশায় বাঁচা এক ব্যক্তি মামলা করলে তাকেও হত্যা করা হয় এবং মামলার নথি হারিয়ে যায়।

এই ঘটনা প্রমাণ করে যে মুক্তিযুদ্ধের সময় বাঙালি জাতি কত ভয়াবহ নির্যাতনের শিকার হয়েছিল এবং স্বাধীনতার পরেও ন্যায়ের পথ কত কঠিন ছিল। ভীমনালির শহীদ ও নির্যাতিতদের স্মৃতি রক্ষা করা এবং নতুন প্রজন্মের কাছে তাদের আত্মত্যাগের কাহিনি পৌঁছে দেওয়া আমাদের দায়িত্ব। তবেই মহান মুক্তিযুদ্ধের চেতনা অমলিন থাকবে এবং বাঙালি জাতি তার ইতিহাসের এই করুণ অধ্যায় থেকে শিক্ষা নিয়ে একটি গণতান্ত্রিক, অসাম্প্রদায়িক ও শোষণমুক্ত সমাজ গড়ে তুলতে সক্ষম হবে।

লেখক: সাংবাদিক, মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরের আজীবন সদস্য

সাবস্ক্রাইব ও অনুসরণ করুন

টানা ৫ ঘণ্টা বিদ্যুৎ থাকবে না যেসব এলাকায়

টানা ৫ ঘণ্টা বিদ্যুৎ থাকবে না যেসব এলাকায়

ইসলামিক ফাউন্ডেশনের নতুন ডিজি মুহিব্বুল্লাহিল বাকী

ইসলামিক ফাউন্ডেশনের নতুন ডিজি মুহিব্বুল্লাহিল বাকী

হজের দায়িত্বে অবহেলায় কাউকে ছাড় দেওয়া হবে না

ধর্মমন্ত্রী হজের দায়িত্বে অবহেলায় কাউকে ছাড় দেওয়া হবে না

যুদ্ধ শেষ হলেও যার নির্মমতা থামেনি

ভীমনালি গণহত্যা যুদ্ধ শেষ হলেও যার নির্মমতা থামেনি

সব খবর

সম্পাদক : শ্যামল দত্ত

প্রকাশক : সাবের হোসেন চৌধুরী

অনুসরণ করুন

BK Family App