×

বিশেষ সংখ্যা

সময়ের অবহেলায় ক্ষতবিক্ষত আমার স্বাধীনতার গৌরব!

Icon

অনামিকা রায়

প্রকাশ: ২৬ মার্চ ২০২৬, ১০:১৩ এএম

সময়ের অবহেলায় ক্ষতবিক্ষত আমার স্বাধীনতার গৌরব!

সময়ের অবহেলায় ক্ষতবিক্ষত আমার স্বাধীনতার গৌরব!

আমার বেড়ে ওঠা একেবারে প্রত্যন্ত এক গ্রামে। আধুনিকতার কোলাহল যেখানে পৌঁছাতে পৌঁছাতে ক্লান্ত হয়ে পড়ে, সেখানেই আমার শৈশব তার নিজস্ব ছন্দে বেড়ে উঠেছে। শরতের শুভ্র আকাশ, শিউলির সুবাস, আর মধুমতির অবাধ জলে তারার প্রতিবিম্ব, এসবই ছিল আমার পৃথিবী। সেই সরল জীবনে হয়তো আধুনিকতার চাকচিক্য ছিল না, কিন্তু ছিল গভীর মায়া, নিখাদ অনুভূতি।

কিন্তু এই মায়াময় শৈশবের ভেতরেও একটি অভাব ছিল- আমার বাবাকে কাছে না পাওয়ার অভাব। সরকারি চাকুরে বাবার মেয়ে হওয়ার সৌভাগ্য যেমন ছিল, তেমনি ছিল দূরত্বের বেদনা। বাবাকে সবসময় কাছে পাইনি, কিন্তু যতটুকু পেয়েছি, তা আমার জীবনের সবচেয়ে গৌরবময় স্মৃতির অংশ হয়ে আছে। কারণ আমার বাবা শুধু একজন বাবা নন, তিনি একজন বীর মুক্তিযোদ্ধা। বাংলাদেশ নামক এই ভূ-খণ্ডের স্বাধীনতা অর্জনে আমার বাবার অবদান কোনোভাবেই কম নয় একটুও।

এই পরিচয় আমার কাছে কেবল একটি তথ্য নয়; এটি আমার গর্ব, আমার অহংকার, আমার অস্তিত্বের অংশ। এই দেশের অসংখ্য অবহেলিত বীর সন্তানের মতোই আমার বাবাও একদিন সব ছেড়ে বেরিয়ে পড়েছিলেন এক ভয়ংকর অনিশ্চিত পথে- দেশমাতৃকার ডাকে সাড়া দিয়ে। কিন্তু তিনি বিফল হননি। শত্রুর মুখ থেকে ছিনিয়ে এনেছেন লাল সবুজের পতাকা।

বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ—এই শব্দ দুটি উচ্চারণ করলেই যে ইতিহাস আমাদের সামনে ভেসে ওঠে, তা কোনো সাধারণ ইতিহাস নয়।  এটি কেবল একটি যুদ্ধ নয়; এটি একটি জাতির আত্মপরিচয় ফিরে পাওয়ার লড়াই। পাকিস্তানি শাসকদের দীর্ঘদিনের বৈষম্য, শোষণ এবং সাংস্কৃতিক দমন-পীড়নের বিরুদ্ধে বাঙালি জাতি রুখে দাঁড়িয়েছিল। ইতিহাসে অপারেশন সার্চলাইট নামে পরিচিত ২৫ মার্চের কালোরাত্রি, সেই নির্মমতার এক জ্বলন্ত উদাহরণ। সশস্ত্র পাকিস্তানি বাহিনী ট্যাংক, মর্টার ও ভারী অস্ত্রে সজ্জিত হয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ে নিরস্ত্র বাঙালিদের ওপর। রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ স্থানে একযোগে হামলা চালায় তারা। সবচেয়ে নির্মম আঘাত আসে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায়। ছাত্র-শিক্ষকদের লক্ষ্য করে পরিচালিত হামলায় বহু নিরীহ মানুষ প্রাণ হারান। জগন্নাথ হল পরিণত হয় রক্তাক্ত হত্যাক্ষেত্রে। একই সঙ্গে রাজারবাগ পুলিশ লাইন ও পিলখানায় চালানো হামলায় প্রতিরোধ গড়ে তোলার চেষ্টা করা বাহিনীকে নির্মমভাবে দমন করা হয়। এই অভিযান ছিল সুপরিকল্পিত। এর লক্ষ্য ছিল রাজনৈতিক নেতৃত্ব, বুদ্ধিজীবী এবং সচেতন নাগরিকদের নিশ্চিহ্ন করা, যাতে ভবিষ্যতে কোনো প্রতিরোধ গড়ে উঠতে না পারে।

সেই ভয়াল রাতে পাকিস্তানি বর্বর হানাদার বাহিনীর নির্মম গুলিতে শহীদ হন ড. গোবিন্দ চন্দ্র দেব, ড. মনিরুজ্জামান, অধ্যাপক জ্যোতির্ময় গুহ ঠাকুরতা, অধ্যাপক সন্তোষ ভট্টাচার্যসহ অনেকেই। রোকেয়া হলের ছাত্রীরাও রক্ষা পাননি হানাদার বাহিনীর বর্বরতা থেকে। নিরস্ত্র মানুষকে নির্বিচারে হত্যা, নারী নির্যাতন, গ্রাম জ্বালিয়ে দেওয়া—সবকিছুই ছিল এই জাতিকে দমিয়ে রাখার অপচেষ্টা। কিন্তু বাঙালি মাথা নত করেনি। বাঙালি আসলে মাথা নত করতে শেখেনি কখনো।

২৫ মার্চের সেই ভয়াল রাতের হত্যা, নির্যাতন আর ধ্বংসযজ্ঞের সেই অন্ধকারেই জন্ম নেয় প্রতিরোধ। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে বাঙালি জাতি এক অভূতপূর্ব ঐক্যে আবদ্ধ হয়। লাখো তরুণ, আমার বাবার মতো, জীবন বাজি রেখে ঝাঁপিয়ে পড়ে যুদ্ধে। তারা জানত না তারা বাঁচবে কি না, কিন্তু তারা জানত—দেশকে মুক্ত করতেই হবে।

নয় মাসের রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের পর ১৬ ডিসেম্বর আসে বিজয়। লাল-সবুজের পতাকা উড়ে ওঠে স্বাধীন বাংলাদেশের আকাশে। যখন আমি আকাশের দিকে তাকিয়ে পতপত করে উড়তে থাকা সেই পতাকা দেখি, তখন মনে হয়—এই পতাকার প্রতিটি সুতায় আমার বাবারও অবদান জড়িয়ে আছে। আর সেই ভাবনা আমার চোখ ভিজিয়ে দেয় অশ্রুতে।

বাংলাদেশ- একটি নাম, যার ভেতরে জড়িয়ে আছে রক্ত, অশ্রু, ত্যাগ আর অনমনীয় সাহসের ইতিহাস। এই ভূখণ্ডের প্রতিটি ইঞ্চি মাটি সাক্ষী সেই সংগ্রামের। দীর্ঘ লড়াই, লাখো শহীদের আত্মদান এবং অসংখ্য মা-বোনের ত্যাগের বিনিময়ে আমরা পেয়েছি স্বাধীনতা।  কিন্তু আজ, সেই গর্বের সঙ্গে এক গভীর প্রশ্নও জড়িয়ে আছে। এই দেশ, যা এত ত্যাগের বিনিময়ে অর্জিত, আজ কি সেই ত্যাগের মর্যাদা রাখতে পারছে? নাকি আমরা নিজেরাই তা অবহেলা আর অপমানের অন্ধকারে ঠেলে দিচ্ছি?

দুঃখজনকভাবে, উত্তরটা সবসময় ইতিবাচক নয়। দেশের বিভিন্ন স্থানে মুক্তিযুদ্ধের ভাস্কর্য ভাঙচুরের ঘটনা আমাদের বিবেককে নাড়া দেয়। এই ভাস্কর্যগুলো কেবল স্থাপনা নয়; এগুলো আমাদের ইতিহাসের দৃশ্যমান প্রতীক। যখন এগুলো ভেঙে ফেলা হয়, তখন মনে হয়—আমরা নিজেরাই আমাদের ইতিহাসকে অস্বীকার করছি।

আরো বেদনাদায়ক হলো, যার নেতৃত্বে, যার জয়ধ্বনি করে বাংলার আপামর জনসাধারণ জীবন বাজি রেখে যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়েছিল সেই জাতির পিতার স্মৃতিচিহ্নও রক্ষা পাচ্ছে না স্বাধীনতাবিরোধী রাক্ষসের ভয়াল থাবা থেকে । বঙ্গবন্ধু স্মৃতি জাদুঘর, যেখানে দাঁড়িয়ে একটি জাতির স্বপ্ন বোনা হয়েছিল সেটিও বিভিন্ন সময়ে আক্রমণের শিকার হয়েছে। এই ধরনের ঘটনা শুধু একটি স্থাপনার ক্ষতি নয়; এটি আমাদের জাতীয় চেতনায় আঘাত।

স্বাধীনতার পরবর্তী প্রজন্মের একটি বড় অংশ মুক্তিযুদ্ধ দেখেনি, তারা যুদ্ধের ভয়াবহতা অনুভব করেনি। তাদের কাছে স্বাধীনতা একটি স্বাভাবিক বিষয়। কিন্তু এই স্বাভাবিকতার পেছনে যে অসংখ্য ত্যাগ, তা যদি আমরা ভুলে যাই, তাহলে একদিন এই স্বাধীনতাও অর্থহীন হয়ে পড়বে।

ইতিহাস বিকৃতির চেষ্টাও আজ বড় উদ্বেগের, বড় বেদনার। কিছু গোষ্ঠী নিজেদের স্বার্থে মুক্তিযুদ্ধের সত্যকে আড়াল করতে চায়। সামজিক মাধ্যমে সামান্য কয়েক সেকেন্ডের রিলস নামক বিনোদনের বিষয়বস্তুর মত আমাদের গৌরবের, ত্যাগের, বহুপ্রাণের বিনিময়ে অর্জিত গোটা ইতিহাসকে বাক্সবন্দি করতে চায় তারা। কিন্তু তারা জানে না, সত্য কখনো চাপা থাকে না। ইতিহাস সূর্যের মত উজ্জ্বল। ইতিহাস বারবার ফিরে আসে, আমাদের ভুলগুলো স্মরণ করিয়ে দিতে। নতুন প্রজন্মকে সত্য জানাতে।

এই বাস্তবতায় দাঁড়িয়ে আমার মতো একজন মুক্তিযোদ্ধার সন্তানের মনে প্রশ্ন জাগে—আমরা কি সত্যিই আমাদের দায়িত্ব পালন করছি? আমার বাবা এবং তাঁর মতো হাজারো বীর মুক্তিযোদ্ধার স্বপ্ন ছিল একটি ন্যায়ভিত্তিক, মানবিক ও সম্মানজনক বাংলাদেশ। সেই স্বপ্ন কি আমরা বাস্তবায়ন করতে পেরেছি?

স্বাধীনতা কেবল একটি অর্জন নয়; এটি একটি দায়িত্ব। এই দায়িত্ব হলো সত্যকে ধারণ করে, ইতিহাসকে সম্মান করে অন্যায়ের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানো। যদি আমরা তা না করি, তাহলে আমরা শুধু অতীতকে নয়, ভবিষ্যৎকেও অন্ধকারে ঠেলে দিচ্ছি।

আজ আমি যখন আমার বাবার কথা ভাবি, তখন গর্বে বুক ভরে ওঠে। কিন্তু একই সঙ্গে একটি ভয়ও কাজ করে, তিনি যদি আজকের বাংলাদেশ দেখতেন, তাহলে কি তিনি খুশি হতেন? আজকের এই বাংলাদেশ দেখে  ইতিহাস কি আমাদের ক্ষমা করবে? ক্ষমা করবেন কি আমার বাবা?

স্বাধীনতা কেবল রাজনৈতিক নয়; এটি একটি নৈতিক দায়িত্বও। এই দেশের প্রতিটি নাগরিকের কর্তব্য হলো সেই চেতনাকে ধারণ করা, যার ভিত্তিতে দেশটি গড়ে উঠেছে। আমরা যদি নিজেরাই সেই চেতনাকে অবহেলা করি, তাহলে বাইরের কোনো শক্তির প্রয়োজন হবে না আমাদের দুর্বল করতে।

আজ যখন আমরা দেখি, মুক্তিযোদ্ধারা তাদের প্রাপ্য সম্মান পাচ্ছেন না, যখন দেখি তাদের অবদান নিয়ে প্রশ্ন তোলা হয়, তখন কষ্ট হয়। যারা জীবন বাজি রেখে দেশ স্বাধীন করেছে, তাদের সম্মান রক্ষা করা আমাদের নৈতিক দায়িত্ব।

একইসঙ্গে, আমাদের বুঝতে হবে যে স্বাধীনতার চেতনা কেবল অতীতে সীমাবদ্ধ নয়; এটি বর্তমান এবং ভবিষ্যতের জন্যও প্রাসঙ্গিক। দুর্নীতি, অবিচার, অসহিষ্ণুতা—এইসবই স্বাধীনতার চেতনার পরিপন্থী। যদি আমরা সত্যিই স্বাধীনতার মূল্য দিতে চাই, তাহলে আমাদের এসবের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াতে হবে।

হাজারো বীর মুক্তিযোদ্ধার ত্যাগের গল্প আমাদের অনুপ্রাণিত করে। তাদের স্বপ্ন ছিল একটি ন্যায়ভিত্তিক, সমৃদ্ধ এবং মানবিক বাংলাদেশ। সেই স্বপ্নকে বাস্তবায়ন করা আমাদের দায়িত্ব।

শেষ পর্যন্ত, প্রশ্নটি আমাদের সবার জন্য- আমরা কি সেই স্বপ্নের যোগ্য উত্তরসূরি হতে পেরেছি?

লেখক:  সাংবাদিক ও সংস্কৃতিকর্মী

টাইমলাইন: মহান স্বাধীনতা ও জাতীয় দিবস ২০২৬

আরো পড়ুন

সাবস্ক্রাইব ও অনুসরণ করুন

একই পরিবারে জামায়াত-বিএনপি সংঘর্ষে কৃষকদল নেতার মৃত্যু

একই পরিবারে জামায়াত-বিএনপি সংঘর্ষে কৃষকদল নেতার মৃত্যু

শক্তিশালী গণতান্ত্রিক সরকার গড়ে তুলতে বদ্ধপরিকর

চিফ হুইপ শক্তিশালী গণতান্ত্রিক সরকার গড়ে তুলতে বদ্ধপরিকর

শহীদ পুলিশ সদস্যদের প্রতি স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর শ্রদ্ধা

শহীদ পুলিশ সদস্যদের প্রতি স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর শ্রদ্ধা

সদরপুরে মহান স্বাধীনতা দিবস ও জাতীয় দিবস পালিত

সদরপুরে মহান স্বাধীনতা দিবস ও জাতীয় দিবস পালিত

সব খবর

সম্পাদক : শ্যামল দত্ত

প্রকাশক : সাবের হোসেন চৌধুরী

অনুসরণ করুন

BK Family App