×

বিশেষ সংখ্যা

বৈশাখ: অসাম্প্রদায়িক চেতনার সার্বজনীন উৎসব

Icon

স্বাধীন চৌধুরী

প্রকাশ: ১৩ এপ্রিল ২০২৬, ০৮:৩৬ পিএম

বৈশাখ: অসাম্প্রদায়িক চেতনার সার্বজনীন উৎসব

বৈশাখ: অসাম্প্রদায়িক চেতনার সার্বজনীন উৎসব

কোনো কোনো দিন কেবল দিন নয়- স্মৃতির ভেতর বহমান এক নদী। পহেলা বৈশাখ তেমনই একটি দিন, যার জলে আমরা বারবার নিজেদের মুখ ধুই এবং প্রতিবারই নতুন করে নিজেদের আবিষ্কার করি। এই দিনটি কেবল ল ক্যালেন্ডারের সূচনা নয়, এক অন্তর্লোকের উন্মোচন- মানুষ তার ধর্মীয় পরিচয়, সামাজিক বিভাজন, ব্যক্তিগত সংকীর্ণতা সবকিছুকে অতিক্রম করে এক বৃহত্তর মানবিক সত্তায় উত্তীর্ণ হতে চায়।

বৈশাখ শুধু ঋতুচক্রের বাঁক নয়; এক আবহমান সংস্কৃতির উপলব্ধি, এক নৈতিক আহ্বান এবং সামষ্টিক আত্মদর্শন।

ইতিহাসের গভীর থেকে উঠে আসা এই দিন তথা 

বাংলা সনের উৎপত্তি নিয়ে কথা বলতে গেলে আমাদের ফিরে যেতে হয় মুঘল আমলে, সম্রাট আকবর-এর শাসনকালে। ইতিহাস থেকে আমরা জানি, কৃষিভিত্তিক বাংলায় ফসল তোলার সময় এবং খাজনা আদায়ের সময়ের মধ্যে অসামঞ্জস্য ছিল। হিজরি চন্দ্রবর্ষ কৃষিকাজের সঙ্গে তাল মেলাতে পারছিল না। ফলে প্রশাসনিক ও অর্থনৈতিক অচলাবস্থা দেখা দিচ্ছিল। এই বাস্তবতা থেকেই ‘ফসলি সন’-এর ধারণা। জ্যোতির্বিজ্ঞানী ফতেহউল্লাহ সিরাজী-এর তত্ত্বাবধানে সূর্যভিত্তিক পঞ্জিকা প্রণয়ন করা হয়, যা পরবর্তীতে বাংলা সনে রূপ নেয়। এই ক্যালেন্ডার কৃষিজীবনের সঙ্গে নিবিড়ভাবে যুক্ত ছিল- অর্থাৎ মানুষের জীবনযাত্রার বাস্তব প্রয়োজন থেকেই এর জন্ম।

এখানেই বৈশাখের একটি মৌলিক সত্য নিহিত- যা কোনো ধর্মীয় বিধানের ফসল নয়; মানুষের জীবনের প্রয়োজন, শ্রম, মাটি, ঋতু এবং অর্থনৈতিক বাস্তবতার সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত কৃষিভিত্তিক সামাজের যথার্থ এক উদ্ভাবন।

গ্রামীণ জীবনের অন্তর্গত উৎসব

গ্রামের বৈশাখ ছিল অন্যরকম- আরও সরল, আরও মাটির কাছাকাছি। গ্রামীণ জনপদে পহেলা বৈশাখ মানে নতুন ধানের গন্ধ, মাটির ঘ্রাণ, আর জীবনের প্রতি প্রকৃতিময় এক অকৃত্রিম কৃতজ্ঞতা।

হালখাতা ছিল এই দিনের অন্যতম প্রধান অনুষঙ্গ। ব্যবসায়ীরা পুরোনো হিসাব বন্ধ করে নতুন খাতা খুলতেন। কিন্তু তা কেবল অর্থনৈতিক রীতি ছিল না- ছিল সম্পর্ক নবায়নের এক সামাজিক আচার। ক্রেতাকে মিষ্টি খাওয়ানো, হাসিমুখে সম্ভাষণ-এসবের ভেতর দিয়ে এক ধরনের মানবিক বন্ধন তৈরি হতো।

গ্রামের মেলায় যে বৈচিত্র্য দেখা যেত, তা আসলে বাঙালির সাংস্কৃতিক বহুত্বেরই প্রতিফলন। পুতুল নাচ, যাত্রা, বাউলগান, লাঠিখেলা- এসবের মধ্যে কোনো ধর্মীয় বিভাজন ছিল না। সেখানে মানুষের নির্মল হৃদয়ের আনন্দ ছিল সবার জন্য সমানভাবে উন্মুক্ত।

এই অভিজ্ঞতা আমাদের জীবনের সহজাত প্রকৃত যাপনের উপলব্ধি। অর্থাৎ সংস্কৃতি যখন মানুষের ভেতর থেকে উঠে আসে, তখন তা কখনো বিভাজনের কারণ হয় না বরং মিলনের পথ তৈরি করে।

নগরজীবনের পুনর্নির্মাণ

শহরে বৈশাখের যে রূপ আমরা দেখি, তা এক অর্থে আধুনিকতার ভেতর দিয়ে ঐতিহ্যের পুনর্নির্মাণ। বিশেষ করে ছায়ানট-এর উদ্যোগে রমনার বটমূলে সূর্যোদয়ের সঙ্গে ‘এসো হে বৈশাখ’ গানের যে আয়োজন, তা বাঙালির সাংস্কৃতিক ইতিহাসে এক নতুন অধ্যায়।

এই আয়োজন শুধু অনুষ্ঠান হিসেবে উদযাপিত হয়নি, এই আয়োজন নীরব প্রতিরোধ ছিল সংস্কৃতির ওপর আরোপিত দমন-পীড়নের বিরুদ্ধে। একইভাবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা ইনস্টিটিউটের মঙ্গল শোভাযাত্রা আমাদের সময়ের এক শক্তিশালী সাংস্কৃতিক প্রতীক। মুখোশ, প্রতীক, রঙের ভেতর দিয়ে এখানে সমাজের অসঙ্গতি, অন্যায়, ভয়ের বিরুদ্ধে এক সম্মিলিত প্রতিবাদ উচ্চারিত হয়।

ইউনেস্কো এই শোভাযাত্রাকে ‘মানবতার অমূর্ত সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য’ হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে- যা শুধু আন্তর্জাতিক সম্মান নয়; আমাদের সাংস্কৃতিক আত্মপরিচয়ের এক বৈশ্বিক স্বীকৃতি।

অসাম্প্রদায়িকতার অন্তর্নিহিত দর্শন

পহেলা বৈশাখের গভীর তাৎপর্য এর অসাম্প্রদায়িক চরিত্রে। এটি আমাদের এমন এক উৎসব, যা কোনো ধর্মীয় বিধিনিষেধের মধ্যে আবদ্ধ নয়। এখানে মানুষ তার ধর্মীয় পরিচয় ভুলে যায় না, কিন্তু সেটিকে অতিক্রম করে বৃহত্তর মানবিক পরিচয়ের গন্তব্যে পৌঁছায়।

এই অতিক্রমণই মৌলিক অর্জন, চেতনার ফসল। 

আমরা এমন এক সমাজে বাস করি, যেখানে বিভাজন প্রায়শই আমাদের পরিচয়ের কেন্দ্রবিন্দু হয়ে ওঠে। ধর্ম, ভাষা, বর্ণ- এসবের ভেতর দিয়ে আমরা নিজেদের আলাদা করে দেখি। কিন্তু বৈশাখ আমাদের আঙুল উঁচিয়ে দেখিয়ে দেয়, এই আলাদা হওয়াটা শেষ সত্য নয়। এর ওপরে আরও এক স্তর আছে- যেখানে মানুষ কেবলই মানুষ। এই উপলব্ধি সহজ নয়, কিন্তু অর্জন করতে হয়। বৈশাখ সেই অর্জনের এক অনুশীলন।

প্রতিরোধ, প্রতিবাদ এবং সংস্কৃতির রাজনীতি

ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, পহেলা বৈশাখ শুধুই উৎসব ছিল না; কখনো ছিল প্রতিরোধের ভাষা। পাকিস্তান আমলে যখন বাঙালি সংস্কৃতিকে দমিয়ে রাখার চেষ্টা চলছিল, তখন বৈশাখ উদযাপন ছিল নীরব কিন্তু দৃঢ় প্রতিবাদ।

রমনার বটমূলে গান, চারুকলার শোভাযাত্রা- এইসব ছিল এক ধরনের সাংস্কৃতিক ঘোষণাঃ 'আমরা আছি, আমরা আমাদের মতো করেই থাকব।' এই প্রেক্ষাপটে বৈশাখ হয়ে ওঠে এক রাজনৈতিক প্রতীক- কিন্তু তা কোনো দলীয় রাজনীতির নয়; সংস্কৃতির রাজনীতি, আত্মপরিচয়ের রাজনীতি, অস্তিত্বের রাজনীতি।


অর্থনীতি, বাজার এবং বৈশাখের দ্বৈততা

সময়ের সঙ্গে সঙ্গে বৈশাখের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে শক্তিশালী অর্থনৈতিক মাত্রা। নতুন পোশাক, পান্তা-ইলিশ, নানা ধরনের পণ্য- এসব কিছু বাজারে এক ধরনের উৎসবমুখরতা তৈরি করে। যা একদিকে  অর্থনৈতিক গতিশীলতা সৃষ্টি করে, অন্যদিকে প্রশ্নও তোলে- উৎসব কি ধীরে ধীরে পণ্যে পরিণত হচ্ছে?

-এই দ্বৈততা আমাদের ভাবায়। কারণ, উৎসবের প্রাণ যদি কেবল ভোগে সীমাবদ্ধ হয়ে যায়, তবে তার গভীর মানবিকতা ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। তাই প্রয়োজন ভারসাম্য- যেখানে আনন্দ থাকবে, কিন্তু তার ভেতরে থাকবে বোধের গভীরতা।

বিশ্বায়নের প্রেক্ষাপটে বৈশাখ

আজ বৈশাখ শুধু বাংলাদেশের নয়; বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে থাকা বাঙালির উৎসব। লন্ডন, নিউইয়র্ক, টরন্টো, সিডনি তথা বিশ্বের বহু দেশে পহেলা বৈশাখ উদযাপিত হয়। এই বিস্তার প্রমাণ করে, বৈশাখ কোনো ভূগোলের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। বৈশাখ একটি চেতনা, যা মানুষ তার সঙ্গে বহন করে নিয়ে যায় তার যাপনের সঙ্গে কোথাও না কোথাও। 

কিন্তু বিশ্বায়নের এইকালে প্রশ্ন থাকে- আমরা কি আমাদের বৈশাখকে তার মৌলিকতার মধ্যে ধরে রাখতে পারছি? নাকি আমরা কেবল একটি প্রদর্শনীর মধ্যে আবর্তন করছি? না,শুধুই তা হলে হয় না। বৈশাখ এক আত্মসমালোচনার জলছবি, 

বৈশাখ আমাদের জীবনে শুধুই আনন্দ দেয় না; আমাদের সামনে চকচকে আয়নাটি ধরে রাখে; সেই আয়নায় আমরা নিজেদের দেখি- সংকীর্ণতা, ভণ্ডামি আর আমাদের সীমাবদ্ধতা।

আমরা কি সত্যিই অসাম্প্রদায়িক? নাকি  এক দিনের জন্য কেবল অভিনয়? এই প্রশ্নের উত্তর সহজ নয়। কিন্তু প্রশ্নটাই গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, প্রশ্ন না থাকলে আত্মসমালোচনা হয় না, আর আত্মসমালোচনা ছাড়া কোনো সমাজ কিংবা  জাতির উন্নতি সম্ভব নয়।

নবজাগরণের অন্তর্লোক

পহেলা বৈশাখ একটি দিন নয়; জনজীবনের একটি প্রক্রিয়া- নিরন্তর নবায়নের,ব্যক্তিক ও সামষ্টিক পুনর্গঠনের পথে মানুষ হয়ে ওঠার প্রক্রিয়া। এই দিনে আমরা নতুন পোশাক পরি, নতুন বছরকে স্বাগত জানাই- কিন্তু তার চেয়েও বড় কথা, আমরা চেষ্টা করি প্রকৃত অর্থে নতুন মানুষ হতে। এই চেষ্টায় বৈশাখের আসল সৌন্দর্য।

বৈশাখের আদর্শিক মর্ম হলো মানবিক বোধের সুসম সমাজ, এ সাধনার কাজ। এ কাজ- সবাই মিলে করার সংগ্রাম। এ সাধনার পথে লুকিয়ে আছে অসাম্প্রদায়িকতার প্রকৃত অর্থ- এখানে সব বিভাজন মুছে গিয়ে শুধু আমাদের একটিই পরিচয়- আমরা মানুষ।

লেখক: কবি, গণমাধ্যমকর্মী

সাবস্ক্রাইব ও অনুসরণ করুন

নববর্ষ পালনের গল্পকথা

নববর্ষ পালনের গল্পকথা

চৈত্রসংক্রান্তি ও চড়কপূজা: বাংলার লোকঐতিহ্যের বহুস্রোত ও আত্মপরিচয়ের সন্ধান

চৈত্রসংক্রান্তি ও চড়কপূজা: বাংলার লোকঐতিহ্যের বহুস্রোত ও আত্মপরিচয়ের সন্ধান

নববর্ষ কি একদিন উদযাপনের মধ্যেই সীমাবদ্ধ?

নববর্ষ কি একদিন উদযাপনের মধ্যেই সীমাবদ্ধ?

আধুনিকতার ছোঁয়ায় বদলে যাওয়া বৈশাখ, নাকি ঐতিহ্যের নতুন রূপ?

আধুনিকতার ছোঁয়ায় বদলে যাওয়া বৈশাখ, নাকি ঐতিহ্যের নতুন রূপ?

সব খবর

সম্পাদক : শ্যামল দত্ত

প্রকাশক : সাবের হোসেন চৌধুরী

অনুসরণ করুন

BK Family App