পর্যটন অর্থনীতি: পরিবেশ বিপর্যয়, পরনির্ভরশীলতা ও এক অদৃশ্য বুদবুদ
রাসেল আহমদ
প্রকাশ: ০৫ অক্টোবর ২০২৬, ১০:৫৭ পিএম
ফাইল ছবি
বাংলাদেশ যখন এলডিসি উত্তরণ-পরবর্তী সংকট, উচ্চ মূল্যস্ফীতি এবং বাজেট ঘাটতির মতো কঠিন অর্থনৈতিক বাস্তবতার মুখোমুখি, তখন দেশের সম্ভাব্য অর্থনৈতিক চালিকাশক্তি হিসেবে পর্যটন খাতের ওপর অতি-নির্ভরশীল হওয়ার একটি মানসিকতা স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে।
তবে গভীর অর্থনৈতিক বিশ্লেষণ ও টেকসই উন্নয়নের নিরিখে বিচার করলে পর্যটন শিল্প দেশের মূল অর্থনীতিতে কোনো দীর্ঘমেয়াদি ও সুদৃঢ় প্রবৃদ্ধি আনে না। বরং এটি পরিবেশগত বিপর্যয়, সম্পদ ক্ষয়, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক এবং অর্থনৈতিক ভঙ্গুরতা বাড়িয়ে তোলে। সার্বিক বিবেচনায় এটি একটি নেতিবাচক ও অপচয়মূলক অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড।
পর্যটন খাতের মূল সম্পদ বলা হয় প্রাকৃতিক পরিবেশ- পাহাড়, সমুদ্র, নদী ও বন। অথচ পর্যটনভিত্তিক অবকাঠামো গড়ে তোলার প্রক্রিয়াতেই প্রাকৃতিক সম্পদের সবচেয়ে বেশি অবক্ষয় ঘটে। কক্সবাজারের জীববৈচিত্র্য ধ্বংস, সেন্ট মার্টিন দ্বীপের পরিবেশিক বিপর্যয় কিংবা টাঙ্গুয়ার হাওরে অপরিকল্পিত ভ্রমণ থেকে উৎপন্ন বর্জ্য ও প্রাণ-প্রকৃতির ধ্বংস প্রমাণ করে যে পর্যটন পরিবেশের অপূরণীয় ক্ষতি করে। অর্থনীতিতে একে বলা হয় 'নেগেটিভ এক্সটার্নালিটি'। পরিবেশ সংস্কার ও দূষণ মোকাবিলায় রাষ্ট্রকে যে অদৃশ্য অর্থনৈতিক ব্যয়ভার বহনের দায় নিতে হয়, তা পর্যটন থেকে অর্জিত সাময়িক আয় বা রাজস্বের চেয়ে অনেক বেশি।
পর্যটন অত্যন্ত সংবেদনশীল ও অস্থিতিশীল একটি খাত। প্রাকৃতিক দুর্যোগ, রাজনৈতিক অস্থিরতা, মহামারী কিংবা বৈশ্বিক সংকটে এই খাত সবার আগে ধসে পড়ে। এটি এক ধরনের কৃত্রিম বুদবুদ অর্থনীতি, যার কোনো স্থায়ী উৎপাদনশীলতা নেই। কৃষি বা ভারী শিল্পের মতো উৎপাদনমুখী খাতগুলো স্থায়ী সম্পদ ও প্রযুক্তিগত মূলধন সৃষ্টি করে। পর্যটন সেভাবে প্রকৃত মূল্য সংযোজন করে না; এটি কেবল এক খাতের অর্থ অন্য খাতে স্থানান্তর করে মাত্র।
অস্থিতিশীল এমন একটি ভঙ্গুর খাতের ওপর ভর করে জাতীয় বাজেট বা অর্থনৈতিক পুনর্গঠনের পরিকল্পনা করা নীতিগত দিক থেকে মারাত্মক ঝুঁকিপূর্ণ।
এই খাতে দাবিকৃত বিপুল কর্মসংস্থানের সিংহভাগই আসলে অস্থায়ী, মৌসুমি এবং স্বল্প আয়ের শ্রমনির্ভর। এটি মানবসম্পদের দীর্ঘমেয়াদি প্রাতিষ্ঠানিক দক্ষতা তৈরি করে না।
পাশাপাশি পর্যটন কেন্দ্রগুলোতে সাময়িক কৃত্রিম চাহিদা তৈরি হওয়ায় স্থানীয় পর্যায়ে পণ্য ও সেবার দাম অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যায়। এতে পর্যটন শহরগুলোর সাধারণ ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠী তীব্র মূল্যস্ফীতির শিকার হয়। স্থানীয় অর্থনীতির সার্বিক স্বস্তি ব্যাহত করে এটি মূলত অল্প কিছু ব্যবসায়িক গোষ্ঠীর পকেটে মুনাফা পৌঁছে দেয়।
বাংলাদেশের মতো সীমিত বাজেটের দেশে বিনিয়োগের 'সুযোগ-ব্যয়' বা 'অপরচুনিটি কস্ট' বিবেচনা করা জরুরি। বিলাসবহুল রিসোর্ট, প্রমোদতরি বা এক্সক্লুসিভ ট্যুরিজম জোন তৈরিতে যে বিপুল অর্থ ঢালা হয়, সেই একই মূলধন যদি কৃষি প্রক্রিয়াজাতকরণ, তথ্যপ্রযুক্তি বা কারিগরি শিক্ষায় বিনিয়োগ করা হতো, তবে তা দেশকে উৎপাদনে স্বাবলম্বী করত। এমনকি আন্তর্জাতিক পর্যটক আকর্ষণে কোটি কোটি টাকা খরচ করে বিদেশে 'রোড শো' করা বা বিশেষ ছাড় দিয়ে বিদেশি মূলধন আনা আদতে জাতীয় রাজস্বের অপরিকল্পিত ব্যয় ছাড়া কিছু নয়।
অনিয়ন্ত্রিত পর্যটন কেবল সম্পদের অপচয় ঘটায় না, বরং স্থানীয় সংস্কৃতি ও ভূমির সামাজিক কাঠামোর ওপর বিরূপ প্রভাব ফেলে।
বৃহৎ কর্পোরেট ও বিনিয়োগকারীদের দাপটে স্থানীয় অধিবাসীরা তাদের ভিটেমাটি থেকে স্থানচ্যুত হয়ে পরনির্ভরশীল হয়ে পড়ে।
পর্যটন শিল্পকে জাতীয় অর্থনীতির অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি হিসেবে তুলে ধরা একটি আত্মঘাতী দৃষ্টিভঙ্গি। উদীয়মান অর্থনীতির জন্য প্রয়োজন উৎপাদনে স্বাবলম্বিতা, মৌলিক অবকাঠামো উন্নয়ন এবং টেকসই কর্মসংস্থান। যে খাত প্রকৃতিকে নিঃশেষ করে, অস্থিতিশীল আয় দেয় এবং জাতীয় সম্পদের অপচয় ঘটায়- তাকে অর্থনৈতিক প্রগতির মূলধারা হিসেবে বিবেচনা করার কোনো সুযোগ নেই।
লেখক: ফ্রিল্যান্স সাংবাদিক ও কলামিস্ট
