চট্টগ্রামে বেড়েছে ডেঙ্গুর প্রকোপ
প্রীতম দাশ, চট্টগ্রাম অফিস
প্রকাশ: ৩০ সেপ্টেম্বর ২০২৪, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
ছবি: সংগৃহীত
সাধারণত বর্ষাপরবর্তী সময় অর্থাৎ আগস্ট থেকে অক্টোবরকে ডেঙ্গুর ‘পিক সিজন’ বলা হলেও গত কয়েক বছর ধরে সারা বছরই ডেঙ্গুতে আক্রান্ত রোগী পাওয়া যাচ্ছে চট্টগ্রামে। এখন চট্টগ্রামে ডেঙ্গু আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা বাড়ছে। চলতি বছর ডেঙ্গু আক্রান্ত হয় মোট ১৪৩৯ জন। এর মধ্যে শুধু সেপ্টেম্বর মাসেই ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়েছেন ৮৪১ জন। সে হিসাবে এ বছরে মোট শনাক্ত হওয়া ডেঙ্গুরোগীর মধ্যে প্রায় ৫০ শতাংশই শনাক্ত হয়েছে সেপ্টেম্বর মাসেই। মূলত চলতি বছরে জানুয়ারি-জুলাই পর্যন্ত ৩৯৬ জন আক্রান্ত হয় ডেঙ্গুতে। এরপর থেকেই লাগামহীন ডেঙ্গুর থাবা। এর পেছনে চলমান অপরিকল্পিত নগরায়ন, মশক নিয়ন্ত্রণে কর্তৃপক্ষের ব্যর্থতা ও স্বাস্থ্য খাতের দুরবস্থাসহ বেশ কিছু কারণ রয়েছে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
এদিকে ডেঙ্গুতে আক্রান্তের হার পুরুষের বেশি হলেও মৃত্যুর হার বেশি নারীর। চট্টগ্রাম জেলা সিভিল সার্জনের কার্যালয় থেকে প্রকাশিত সর্বশেষ প্রতিবেদন অনুযায়ী, চলতি বছর আক্রান্ত ১৪৩৯ জনের মধ্যে পুরুষের সংখ্যা ৭৮১, নারীর সংখ্যা ৩৮৭ এবং শিশু ২৭১ জন। এরমধ্যে মোট ১৫ জনের মৃত্যু হয়েছে। চলতি বছর ডেঙ্গুতে এ পর্যন্ত চট্টগ্রামে ৯ জন নারী মারা গেছেন, পুরুষ মারা গেছেন ৪ জন আর শিশু মারা গেছে ২ জন। মারা যাওয়া নারীদের বেশির ভাগই এক্সপান্ডেড ডেঙ্গু শক সিনড্রোম ও নিম্ন রক্তচাপের সমস্যায় ভুগছিলেন।
চিকিৎসকরা বলছেন, জেনেটিক কারণে নারীদের জটিলতা বেশি দেখা দেয়, যে কারণে ডেঙ্গুতে নারীর মৃত্যুর হার বেশি। এছাড়া গর্ভাবস্থায় ও ঋতু¯্রাবকালে কোনো নারী ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হলে তাদের মৃত্যু ঝুঁকি বেশি থাকে। একই সঙ্গে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কম থাকার পাশাপাশি উদাসীনতা নারীর মৃত্যু বাড়িয়ে দিচ্ছে বলে ধারণা চিকিৎসকদের।
স্বাস্থ্য বিভাগ সূত্র জানায়, চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের ২০টি এলাকায় ডেঙ্গুর জীবাণুবাহী এডিস মশার উপস্থিতি পাওয়া গেছে। এর মধ্যে ৩টি এলাকা ডেঙ্গুর উচ্চ ঝুঁকিতে রয়েছে। এছাড়া চলতি মাসের ২৮ দিনে চট্টগ্রামে যে সংখ্যক ডেঙ্গুরোগী শনাক্ত হয়েছে, তা গত আট মাসের মধ্যে সবচেয়ে বেশি। গত ৯ মাসে ডেঙ্গুতে মোট মৃত্যুর দুই-তৃতীয়াংশ হয়েছে চলতি মাসে।
চলতি মাসে আক্রান্ত রোগীদের তথ্য বিশ্লেষণ করে সিটি করপোরেশনের যেসব এলাকায় ডেঙ্গুর জীবাণুবাহিত এডিস মশার উপদ্রব বেড়েছে, তার মধ্যে ১০টি এলাকা উল্লেখযোগ্য। সেগুলো হলো- বাকলিয়া, কোতোয়ালি, বায়েজিদ বোস্তামি, খুলশী, পাহাড়তলী, বন্দর, হালিশহর, পতেঙ্গা, চকবাজার, চান্দগাঁও এলাকা। এর মধ্যে নগরের বাকলিয়া, কোতোয়ালি ও বায়েজিদ এলাকাকে ডেঙ্গুর জন্য অত্যধিক ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করেছে সিভিল সার্জন অফিস। চলতি বছরের শুরু থেকেই চট্টগ্রামে ডেঙ্গু আক্রান্ত রোগী শনাক্ত হলেও গত জুলাই থেকে হাসপাতালে ডেঙ্গুরোগী বাড়তে থাকায় উদ্বেগে রয়েছেন স্বাস্থ্য সংশ্লিষ্টরা।
এদিকে চট্টগ্রামে নগরের পাশাপাশি উপজেলায়ও বাড়ছে ডেঙ্গুরোগীর সংখ্যা। সিভিল সার্জন কার্যালয়ের প্রতিবেদন অনুসারে, চলতি বছর শনাক্ত হওয়া রোগীদের মধ্যে নগরের বাসিন্দা ৮৫৪ জন, আর বিভিন্ন উপজেলার বাসিন্দা ৫৮৫ জন। ১৫ উপজেলার মধ্যে সবচেয়ে বেশি রোগী পাওয়া গেছে লোহাগাড়া ও সাতকানিয়া দুই উপজেলায়।
ডেঙ্গুর প্রকোপ বৃদ্ধির বিষয়ে কীটতত্ত্ববিদ এনতেজার ফেরদৌস বলেন, অনিয়মিত বৃষ্টি ডেঙ্গু বাড়ায়। মানুষ সচেতন হলে ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণ করা সহজ, কিন্তু মানুষ মোটেও সচেতন না। যেহেতু স্বচ্ছ পানিতে এডিসের জন্ম তাই এক্ষত্রে সবাইকে সচেতন হতে হবে। সচেতনতার কোনো বিকল্প নেই। এর বাইরে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে যথাযথ ব্যবস্থা নিতে হবে। নতুবা আক্রান্ত ও মৃত্যু হার বাড়তে পারে। তিনি আরো বলেন, বর্তমানে যেসব এলাকা থেকে বেশি রোগী আসছে, তার মধ্যে জলাবদ্ধতাপ্রবণ এলাকাই বেশি। কারণ ফুলের টব, গাছের টব, টায়ার, বোতলে পানি জমে থাকলেই এডিস মশা জন্ম নেবে। তবে নিম্নাঞ্চলে যেহেতু পানি বেশি জমে থাকে, সেখানে বেশি হচ্ছে।
চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল তসলিম উদ্দিন খান বলেন, ‘এই সিজনে এমনিতেই ডেঙ্গুর প্রকোপ থাকে। তার উপর সিটি করপোরেশন বা প্রশাসন ব্যবস্থা না নিলে ডেঙ্গু বাড়বে। বর্তমানে যারা চিকিৎসাধীন আছে তাদের মধ্যেও তেমন কোনো জটিল রোগী নেই। মানুষ যদি সচেতন থাকে তাহলে সংক্রমণ কমিয়ে আনা সম্ভব। এর বাইরে জ্বরে আক্রান্ত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে চিকিৎসকের শরণাপন্ন হলে অনেকক্ষেত্রে মৃত্যুহারও কমিয়ে আনা সম্ভব হতো।
চট্টগ্রামের সিভিল সার্জন ডা. জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী বলেন, ‘রোগীদের তথ্য বিশ্লেষণ করে আমরা নগরের বেশ কয়েকটি এলাকাকে চিহ্নিত করেছি। সেখানে এডিস মশার লার্ভার সার্ভে চলছে। বিষয়টি আমরা সিটি করপোরেশনকেও জানিয়েছি। এছাড়া জনসচেতনতা বৃদ্ধিতে নানামুখী পদক্ষেপ নেয়া হয়েছে।’
