রিপাবলিকানদের কাছ থেকে নর্থ ক্যারোলাইনা আসন ছিনিয়ে নিলো ডেমোক্র্যাটরা
আন্তর্জাতিক ডেস্ক
প্রকাশ: ০৪ নভেম্বর ২০২৬, ০৮:৫০ এএম
ছবি: সংগৃহীত
যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনে বড় ধরনের চমক দেখিয়েছে ডেমোক্রেটিক পার্টি। রিপাবলিকানদের দখলে থাকা নর্থ ক্যারোলাইনা অঙ্গরাজ্যের একটি গুরুত্বপূর্ণ সিনেট আসন ছিনিয়ে নিয়েছেন ডেমোক্র্যাট প্রার্থী রয় কুপার। প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সমর্থনপুষ্ট রিপাবলিকান প্রার্থী মাইকেল হোয়াটলিকে পরাজিত করে এ জয় পেয়েছেন সাবেক গভর্নর কুপার। এই বিজয়কে শুধু একটি আসন পুনরুদ্ধার নয়, বরং জাতীয় রাজনীতিতে রিপাবলিকানদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ সতর্কবার্তা হিসেবে দেখা হচ্ছে।
এদিকে, যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনে বেশ কয়েকটি অঙ্গরাজ্যে ভোটগ্রহণ শেষ হয়েছে। বুথ ফেরত জরিপে দেখা যাচ্ছে অর্থনীতি নিয়ে অধিকাংশ ভোটার অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন।
মঙ্গলবার (৩ নভেম্বর) অনুষ্ঠিত নির্বাচনে রয় কুপারের জয় ডেমোক্র্যাটদের সিনেটের নিয়ন্ত্রণ পুনরুদ্ধারের লড়াইয়ে নতুন আশার সঞ্চার করেছে। বিশেষ করে ট্রাম্প প্রশাসনের দ্বিতীয় মেয়াদে জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি, জ্বালানি ও খাদ্যের উচ্চমূল্য এবং সরকারের বিভিন্ন নীতির বিরুদ্ধে জনঅসন্তোষ নির্বাচনে বড় প্রভাব ফেলেছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকেরা। খবর রয়টার্স ও অ্যাসোসিয়েটেড প্রেসের।
কে এই রয় কুপার
নর্থ ক্যারোলাইনার রাজনীতিতে বেশ পরিচিত মুখ রয় কুপার। ৬৯ বছর বয়সী এই ডেমোক্র্যাট নেতা অঙ্গরাজ্যটির সাবেক দুই মেয়াদের গভর্নর। দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা এবং অঙ্গরাজ্যজুড়ে পরিচিতির কারণে নির্বাচনী প্রচারে শুরু থেকেই এগিয়ে ছিলেন তিনি।
অন্যদিকে তার প্রতিদ্বন্দ্বী মাইকেল হোয়াটলি ছিলেন রিপাবলিকান ন্যাশনাল কমিটির (আরএনসি) সাবেক চেয়ারম্যান। নির্বাচিত জনপ্রতিনিধি হিসেবে তার পূর্ব অভিজ্ঞতা না থাকলেও রিপাবলিকান দলের সাংগঠনিক কাঠামো এবং প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সরাসরি সমর্থন ছিল তার বড় শক্তি।
তবে নির্বাচনী প্রচারের শেষ পর্যায়ে ট্রাম্পের সঙ্গে হোয়াটলির ঘনিষ্ঠতা তার জন্য রাজনৈতিক চাপ তৈরি করে। অনেক ভোটারের কাছে তিনি ট্রাম্প প্রশাসনের নীতির প্রতি অতিরিক্ত অনুগত প্রার্থী হিসেবে বিবেচিত হন। বিপরীতে কুপার নিজেকে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় কমানো এবং অঙ্গরাজ্যের স্বার্থে স্বাধীনভাবে কাজ করতে আগ্রহী নেতা হিসেবে তুলে ধরেন।
অ্যাসোসিয়েটেড প্রেসের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, কুপারের এই জয় তাকে নর্থ ক্যারোলাইনা থেকে ২০০৮ সালের পর প্রথম নির্বাচিত ডেমোক্র্যাট সিনেটর হওয়ার সুযোগ করে দিয়েছে।
কেন গুরুত্বপূর্ণ এই জয়
নর্থ ক্যারোলাইনা যুক্তরাষ্ট্রের রাজনীতিতে একটি গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গরাজ্য। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে জাতীয় নির্বাচনে অঙ্গরাজ্যটি বেশির ভাগ ক্ষেত্রে রিপাবলিকানদের সমর্থন দিয়ে এসেছে। ২০২৪ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনেও ট্রাম্প সেখানে জয় পেয়েছিলেন।
এমন একটি অঙ্গরাজ্যে রিপাবলিকানদের কাছ থেকে সিনেট আসন কেড়ে নেওয়া ডেমোক্র্যাটদের জন্য তাৎপর্যপূর্ণ। কারণ, এটি প্রমাণ করে যে রিপাবলিকানদের শক্তিশালী নির্বাচনী ঘাঁটিতেও ভোটারদের মনোভাব পরিবর্তিত হতে পারে।
এবারের নির্বাচনে জীবনযাত্রার ব্যয় ছিল অন্যতম প্রধান ইস্যু। খাদ্যপণ্য, জ্বালানি ও আবাসন ব্যয়ের ঊর্ধ্বগতি নিয়ে ভোটারদের মধ্যে অসন্তোষ তৈরি হয়েছে। পাশাপাশি ইরান যুদ্ধের প্রভাব এবং ট্রাম্প প্রশাসনের বিভিন্ন সিদ্ধান্ত নিয়েও উদ্বেগ ছিল।

কুপার এসব ইস্যুকে সামনে রেখে প্রচার চালান। তিনি গ্যাসোলিন ও নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম কমানো, স্বাস্থ্যসেবার ব্যয় নিয়ন্ত্রণ এবং আবাসন খরচ কমানোর প্রতিশ্রুতি দেন। একই সঙ্গে ওয়াশিংটনের দলীয় রাজনীতির বাইরে গিয়ে অঙ্গরাজ্যের মানুষের স্বার্থে কাজ করার অঙ্গীকার করেন।
তার প্রচারে কৃষ্ণাঙ্গ, তরুণ ও উদারপন্থি ভোটারদের পাশাপাশি স্বতন্ত্র এবং গ্রামীণ এলাকার কিছু রক্ষণশীল ভোটারের সমর্থনও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
সিনেটের নিয়ন্ত্রণ পুনরুদ্ধারের স্বপ্ন
রয় কুপারের বিজয় ডেমোক্র্যাটদের জন্য বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে যুক্তরাষ্ট্রের সিনেটে সংখ্যাগরিষ্ঠতা পুনরুদ্ধারের হিসাব-নিকাশে।
নির্বাচনের আগে সিনেটে রিপাবলিকানদের আসন ছিল ৫৩টি এবং ডেমোক্র্যাটদের ৪৭টি। সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জনের জন্য ডেমোক্র্যাটদের নিট চারটি আসন বাড়াতে হবে। ফলে নর্থ ক্যারোলাইনার এই জয় তাদের লক্ষ্যের পথে একটি গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি।
তবে একটি আসন পুনরুদ্ধার করলেই সিনেটের নিয়ন্ত্রণ নিশ্চিত হচ্ছে না। আরও কয়েকটি প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ অঙ্গরাজ্যে রিপাবলিকানদের হারাতে হবে ডেমোক্র্যাটদের।
এবারের নির্বাচনে ডেমোক্র্যাটদের জন্য আশাব্যঞ্জক আরও কিছু ফল এসেছে। জর্জিয়ায় ডেমোক্র্যাট সিনেটর জন অসফ পুনর্নির্বাচিত হয়েছেন। নিউ হ্যাম্পশায়ারেও সিনেট নির্বাচনে জয় পেয়েছেন ডেমোক্র্যাট প্রার্থী ক্রিস পাপাস। ফলে রিপাবলিকানদের সংখ্যাগরিষ্ঠতা ধরে রাখার চ্যালেঞ্জ আরও বেড়েছে।
ট্রাম্পের জন্য রাজনৈতিক বার্তা
নর্থ ক্যারোলাইনার ফলাফল প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের জন্যও গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক বার্তা বহন করছে। কারণ, হোয়াটলি শুধু রিপাবলিকান প্রার্থীই ছিলেন না, তার নির্বাচনী প্রচারে ট্রাম্পের সরাসরি সমর্থনও ছিল।
ট্রাম্প ২০২৪ সালে হোয়াটলিকে রিপাবলিকান ন্যাশনাল কমিটির নেতৃত্বে এনেছিলেন। ফলে হোয়াটলির পরাজয়কে ট্রাম্পের রাজনৈতিক প্রভাব ও জনপ্রিয়তার একটি পরীক্ষার ফল হিসেবেও দেখা হচ্ছে।
বিশেষ করে নির্বাচনে মূল্যস্ফীতি, জ্বালানি ব্যয় এবং ইরান যুদ্ধের মতো বিষয়গুলো গুরুত্ব পাওয়ায় ট্রাম্প প্রশাসনের নীতির প্রতি ভোটারদের মনোভাব নিয়ে নতুন করে আলোচনা তৈরি হয়েছে।
রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, কুপারের জনপ্রিয়তা, স্বতন্ত্র ভোটারদের সমর্থন এবং ট্রাম্পের প্রতি অসন্তোষ তার জয়ের পেছনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে।
প্রতিনিধি পরিষদেও ডেমোক্র্যাটদের অগ্রগতি
নর্থ ক্যারোলাইনায় ডেমোক্র্যাটদের সাফল্য শুধু সিনেটেই সীমাবদ্ধ থাকেনি। অঙ্গরাজ্যটির পশ্চিমাঞ্চলের একটি কংগ্রেসনাল আসনেও জয় পেয়েছেন ডেমোক্র্যাট প্রার্থী জেমি আগার। এর মধ্য দিয়ে রিপাবলিকানদের দখলে থাকা আরেকটি আসন নিজেদের করে নিয়েছে দলটি।
এদিকে প্রতিনিধি পরিষদের আসনগুলো নিয়েও দুই দলের মধ্যে তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতা চলছে। যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিনিধি পরিষদের মোট ৪৩৫টি আসনের সব কটিতেই এবার নির্বাচন অনুষ্ঠিত হচ্ছে। সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেতে প্রয়োজন ২১৮টি আসন।
ডেমোক্র্যাটদের লক্ষ্য প্রতিনিধি পরিষদের নিয়ন্ত্রণ পুনরুদ্ধার করা। অন্যদিকে রিপাবলিকানরা প্রেসিডেন্টের দল হিসেবে কংগ্রেসের দুই কক্ষেই নিজেদের সংখ্যাগরিষ্ঠতা ধরে রাখতে চাইছে।
নর্থ ক্যারোলাইনার ফলাফল তাই ডেমোক্র্যাটদের জন্য আশাব্যঞ্জক হলেও জাতীয় পর্যায়ে ক্ষমতার ভারসাম্য পরিবর্তনের জন্য আরও কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ আসনে জয় প্রয়োজন।
