পুরোনো প্রযুক্তি আর বাড়তি খরচে অস্তিত্ব সংকটে ঝালকাঠির লবণশিল্প
বছরে উৎপাদন ২৬ হাজার টন
মো. নাঈম হাসান ঈমন, ঝালকাঠি
প্রকাশ: ২৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৫:৩৪ পিএম
ছবি: সংগৃহীত
একসময় ঝালকাঠির নদীবন্দর ঘিরে সকাল থেকে রাত পর্যন্ত চলত লবণের জমজমাট কর্মযজ্ঞ। নদীর ঘাটে আসত কাঁচা লবণের বস্তা। কারখানার চুল্লি, মেশিন আর শ্রমিকের হাঁকডাকে মুখর থাকত পুরো এলাকা। নৌপথে আসা কাঁচা লবণ প্রক্রিয়াজাত হয়ে আবার নৌ ও সড়কপথে ছড়িয়ে পড়ত দেশের বিভিন্ন প্রান্তে।
কক্সবাজারসহ উপকূলীয় অঞ্চল থেকে নৌপথে ঝালকাঠিতে আসত অপরিশোধিত লবণ। ঘাটে ঘাটে নোঙর করত নৌযান। মাথায় বস্তা তুলে শ্রমিকেরা ছুটতেন কারখানা থেকে ঘাটে, ঘাট থেকে আড়তে। লবণ পরিষ্কার, পরিশোধন, আয়োডিন মেশানো, শুকানো ও প্যাকেটজাত করার কাজে ব্যস্ত থাকতেন শত শত শ্রমিক। এরপর নৌ ও সড়কপথে সেই লবণ ছড়িয়ে পড়ত দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে। কালের পরিক্রমায় সেই দৃশ্য অনেকটাই হারিয়ে গেছে। বছরের পর বছর একের পর এক কারখানা বন্ধ হয়ে যাওয়ায় ঝালকাঠির ঐতিহ্যবাহী লবণশিল্পে নেমেছে বড় ধস।
একসময় ছোট-বড় মিলিয়ে ২০টির বেশি লবণকল কারখানা থাকলেও বর্তমানে টিকে আছে মাত্র আটটি। বর্তমানে নিউ ঝালকাঠি সল্ট, এ.আর.এস সল্ট, দি ক্রিসেন্ট সল্ট, লাকী সল্ট ইন্ডাস্ট্রিজ, ধাঁন সিড়ি সল্ট, শরীফ সল্ট ইন্ডাস্ট্রিজ, তাজ সল্ট ক্রাশিং এবং মনিলাখ সল্ট নামের আটটি লবণ মিল চালু রয়েছে। বন্ধ হয়ে গেছে মিতালী, নূর, কুমিল্লা, মদিনা, মিনি ও সুরভী সল্ট ইন্ডাস্ট্রিজসহ আরও অনেক কারখানা। চালু থাকা আটটি মিলের মধ্যে তিনটি আধুনিক পদ্ধতিতে এবং পাঁচটি পুরোনো প্রযুক্তিতে উৎপাদন করছে।
এসব কারখানায় মাসে গড়ে ১ হাজার ৭০০ থেকে ২ হাজার ২০০ টন এবং বছরে প্রায় ২০ হাজার ৪০০ থেকে ২৬ হাজার ৪০০ টন ভোজ্য ও শিল্প লবণ উৎপাদন হচ্ছে। আটটি মিলে প্রায় এক হাজার শ্রমিকের কর্মসংস্থান হয়েছে এবং বছরে প্রায় ২০০ কোটি টাকার বেশি বিক্রি হয়। অর্থাৎ সংখ্যা কমেছে—কিন্তু শিল্পটি পুরোপুরি হারিয়ে যায়নি। বরং পুরোনো ঐতিহ্যকে আঁকড়ে ধরে এখনও উৎপাদন চালিয়ে যাচ্ছেন কয়েকজন উদ্যোক্তা।

ব্রিটিশ আমল থেকে লবণের ব্যবসা
ঝালকাঠির লবণ ব্যবসার ইতিহাস দীর্ঘদিনের। ব্রিটিশ আমল থেকেই ঝালকাঠি ও আশপাশের অঞ্চলে লবণ ব্যবসা চলছে। নদীপথের সুবিধাকে কাজে লাগিয়ে ঝালকাঠি হয়ে ওঠে দক্ষিণাঞ্চলের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যকেন্দ্র। ঝালকাঠি জেলা একসময় ‘দ্বিতীয় কলকাতা’ হিসেবে পরিচিতি ছিল। নদী ছিল এ ব্যবসার প্রাণ। কক্সবাজারসহ উপকূলীয় অঞ্চল থেকে নৌপথে কাঁচা লবণ নিয়ে আসা হতো ঝালকাঠিতে। স্থানীয় কারখানায় তা পরিশোধন ও প্রক্রিয়াজাত করে বরিশাল বিভাগের চাহিদা মিটিয়ে বিভিন্ন অঞ্চলে পাঠানো হতো। একসময় বাসন্ডা নদীর দুই তীরজুড়ে গড়ে উঠেছিল বহু সনাতন পদ্ধতির লবণকল। নৌপথে সহজ যোগাযোগ, নদীবন্দরকেন্দ্রিক আড়ত এবং শ্রমিকের সহজলভ্যতার কারণে লবণশিল্প দ্রুত বিস্তার লাভ করে।
কমেছে মিল, কমেনি উৎপাদনের গুরুত্ব
ঝালকাঠির লবণশিল্পের অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো—কারখানার সংখ্যা কমলেও এখনও এখানে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ লবণ প্রক্রিয়াজাত হয়। কক্সবাজার থেকে নৌপথে আনা অপরিশোধিত লবণ প্রথমে কারখানায় পরিষ্কার করা হয়। এরপর বিভিন্ন ধাপে তা পরিশোধন, শুকানো ও প্রক্রিয়াজাত করা হয়। খাবার লবণের ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় প্রক্রিয়ার মাধ্যমে আয়োডিন যুক্ত করে প্যাকেটজাত ও বাজারজাত করা হয়।
তবে অধিকাংশ স্থানীয় কারখানায় এখনও পুরোনো প্রযুক্তি ও সনাতন পদ্ধতির ওপর নির্ভরতা রয়েছে। ফলে যেখানে আধুনিক কারখানায় যন্ত্রনির্ভর উৎপাদন হচ্ছে, সেখানে ঝালকাঠির অনেক কারখানায় এখনও শ্রমনির্ভর উৎপাদন প্রক্রিয়া চলছে। মিল মালিকদের ভাষ্য, আধুনিক যন্ত্রপাতি স্থাপনে বড় অঙ্কের বিনিয়োগ প্রয়োজন। কিন্তু ব্যাংকঋণ ও পর্যাপ্ত অর্থায়ন না পাওয়ায় পুরোনো কারখানার আধুনিকায়ন সম্ভব হচ্ছে না। ফলে উৎপাদন ব্যয় বাড়ছে, সময় বেশি লাগছে এবং বড় কোম্পানির সঙ্গে প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়ছেন স্থানীয় উদ্যোক্তারা।

দেশের বিভিন্ন জেলায় যায় ঝালকাঠির লবণ
ঝালকাঠিতে উৎপাদিত লবণ শুধু জেলার বাজারেই বিক্রি হয় না। নৌ ও সড়কপথে বরিশাল বিভাগের বিভিন্ন জেলা ছাড়াও দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে সরবরাহ করা হয়। একসময় বৃহত্তর ফরিদপুর, খুলনা, রাজশাহী, বরগুনা, ভোলা, যশোর, সাতক্ষীরা, কুষ্টিয়া ও নারায়ণগঞ্জসহ ১৭টি জেলা ও বিভিন্ন অঞ্চলে ঝালকাঠির লবণ সরবরাহের কথা ব্যবসায়ীরা জানিয়েছেন। লবণের ব্যবহারও শুধু রান্নাঘরে সীমাবদ্ধ নয়। মাছের ঘের, শুঁটকি, চামড়া প্রক্রিয়াজাতকরণসহ বিভিন্ন শিল্প ও কৃষিকাজে লবণের প্রয়োজন রয়েছে। ফলে এই শিল্পের সঙ্গে মিল মালিক ও শ্রমিকের পাশাপাশি আড়তদার, পরিবহন শ্রমিক, নৌযান মালিক, পাইকার ও খুচরা ব্যবসায়ীরাও জড়িত।
আমদানি ও বড় কোম্পানির সঙ্গে প্রতিযোগিতা
স্থানীয় মিল মালিকদের অভিযোগ, আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর বড় কোম্পানিগুলোর সঙ্গে প্রতিযোগিতা করতে গিয়ে ছোট ও মাঝারি কারখানাগুলো ক্রমেই চাপে পড়ছে।
চীন, ভারত ও মিয়ানমারসহ বিভিন্ন দেশ থেকে আমদানি করা শিল্প লবণ ও বিভিন্ন ধরনের সোডিয়ামভিত্তিক লবণের সঙ্গে দেশীয় কারখানার প্রতিযোগিতা চলছে। স্থানীয় উদ্যোক্তাদের অভিযোগ—বড় শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলো বৃহৎ পরিসরে উৎপাদন ও বাজারজাত করতে পারায় তাদের উৎপাদন খরচ তুলনামূলক কম পড়ে। বিপরীতে ছোট কারখানাগুলো পুরোনো প্রযুক্তি, শ্রমনির্ভর উৎপাদন এবং অর্থসংকটের কারণে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে হিমশিম খাচ্ছে।
কাজ কমেছে শ্রমিকদের
লবণের চাহিদা বাড়লেও তার সুফল শ্রমিকদের জীবনে খুব একটা পৌঁছাচ্ছে না। শ্রমিকেরা জানিয়েছেন, ভোর থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত কাজ করেও জীবনযাত্রার ব্যয় মেটাতে তাদের হিমশিম খেতে হচ্ছে। কোরবানির ঈদে মে মাসে লবণের চাহিদা বাড়লেও শ্রমিকদের আয়-জীবনে তার বড় প্রভাব পড়েনি বলেও শ্রমিকেরা অভিযোগ করেন। ওই সময় চামড়া সংরক্ষণ ও প্রক্রিয়াজাতে লবণের ব্যবহার বাড়ায় বাজার ও কারখানায় কর্মচাঞ্চল্যও বেড়েছিল।
শ্রমিক আব্দুল লতিফ বলেন, “আগে কাজ বেশি ছিল, প্রায় প্রতিদিনই কাজ পাওয়া যেত। এখন কাজ কমে যাওয়ায় সপ্তাহে চার-পাঁচ দিন কাজ করেই থাকতে হয়। এতে সংসারের খরচ চালাতে কষ্ট হচ্ছে।”
শ্রমিক রুস্তম আলী বলেন, “আগে লবণের মিলে কাজের চাপ অনেক বেশি ছিল। বছরের বেশিরভাগ সময়ই নিয়মিত কাজ পাওয়া যেত। এখন মিল কমে যাওয়ায় কাজের সুযোগও কমেছে। কোনো সপ্তাহে কয়েকদিন কাজ থাকে, আবার কোনো সময় কাজ না থাকায় বসে থাকতে হয়। আয় কমে যাওয়ায় সংসারের খরচ চালানো কঠিন হয়ে পড়েছে।”
আরেক শ্রমিক রিপন সিকদার বলেন, “আগের তুলনায় কাজ অনেক কমে গেছে। যে টাকা পাই, তা দিয়ে বর্তমানে সংসার চালানো কষ্টকর। আগে নিয়মিত কাজ থাকায় আয়ও মোটামুটি ভালো হতো। এখন কাজ কম থাকায় আয়ও কমে গেছে। বাজারে সবকিছুর দাম বাড়লেও আমাদের আয় সেই তুলনায় বাড়েনি। লবণের মিলগুলো যদি আগের মতো চালু থাকত এবং কাজের সুযোগ বাড়ত, তাহলে আমাদের মতো শ্রমিকদের উপকার হতো।”
ঝালকাঠির লবণশিল্পে একসময় প্রায় দুই হাজার শ্রমিক কাজ করতেন। তবে বর্তমানে প্রায় এক হাজার শ্রমিক কাজ করেন। ব্যবসায়ীদের কেউ কেউ বর্তমানে শ্রমিক ও তাদের পরিবারের সংখ্যা মিলিয়ে প্রায় এক হাজার পরিবারের জীবন-জীবিকা এ শিল্পের সঙ্গে জড়িত বলে জানিয়েছেন। শ্রমিকদের অভিযোগ, আগে বছরের অধিকাংশ সময় কারখানায় নিয়মিত কাজ থাকলেও এখন অনেক সময় সপ্তাহে চার-পাঁচ দিনের বেশি কাজ পাওয়া যায় না। লবণ পরিষ্কার, বস্তা বহন, প্রক্রিয়াজাতকরণ, শুকানো, প্যাকেটজাতকরণ ও পরিবহনের মতো কাজে শ্রমিকেরা যুক্ত থাকেন। কাজের পরিমাণ কমে গেলে সরাসরি কমে যায় তাদের দৈনিক আয়। একজন শ্রমিকের আয় কমার অর্থ শুধু একজন মানুষের আয় কমে যাওয়া নয়—তার ওপর নির্ভরশীল পুরো পরিবারের জীবনযাত্রায় এর প্রভাব পড়ে। তাই মিলগুলো বন্ধ হওয়া মানে শুধু কয়েকটি ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের বন্ধ হয়ে যাওয়া নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে থাকে শ্রমিক, নৌযান চালক, পরিবহন শ্রমিক, আড়তদার ও ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের আয়-রোজগার।
জ্বালানি ও পরিবহন ব্যয়ে চাপে উদ্যোক্তারা
লবণশিল্পের জন্য কাঁচামাল পরিবহন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ঐতিহ্যগতভাবে নদীপথে কক্সবাজারসহ উপকূলীয় অঞ্চল থেকে কাঁচা লবণ ঝালকাঠিতে আসত। নদীপথের যোগাযোগ একসময় এই শিল্পের অন্যতম শক্তি ছিল। কিন্তু বর্তমানে পরিবহন ব্যয়, নৌপথের নানা সীমাবদ্ধতা এবং সড়কপথে অতিরিক্ত খরচ—সব মিলিয়ে উৎপাদন ব্যয়ের ওপর চাপ পড়ছে বলে ব্যবসায়ীরা জানিয়েছেন।
মেসার্স নিউ ঝালকাঠি সল্ট মিল মালিক আবু বক্বর সিদ্দিক বলেন, “আগে সনাতন পদ্ধতিতে লবণ পরিশোধন করা হতো। এতে খরচ বেশি পড়ত। বর্তমানে আধুনিক মেশিনের মাধ্যমে পরিশোধন করায় খরচ কিছুটা কম হয়। কিন্তু বর্তমানে তেলের দাম বৃদ্ধি পাওয়ায় আবার খরচ বেড়ে গেছে। আমাদের লবণ যে পরিমাণে পরিশোধন করা হয়, তাতে চাহিদা মেটানো সম্ভব। কোনো সমস্যা হয় না। কারও প্রয়োজন হলে আমাদের অর্ডার দিয়ে ৫ থেকে ৭ দিন সময় দিলে ৬ হাজার টনের বেশি লবণ দেওয়া সম্ভব।”
আরেক মেসার্স তাজ সল্ট ইন্ডাস্ট্রিজের মিল মালিক মো. ইলিয়াছ বলেন, “বর্তমানে অবস্থা তেমন ভালো না। বেচাকেনা কম। সনাতন পদ্ধতিতে লবণ পরিশোধন করতে খরচ বেশি হয়। তারপর আবার তেলের দাম বৃদ্ধি পাওয়ায় কক্সবাজার থেকে লবণ আনতে খরচ বেশি পড়ে। এরপর খুলনা আর ঢাকার চাপে আগের তুলনায় তেমন বিক্রি করতে পারি না।”
কম দামে স্থানীয় লবণ, তবু বাজারে চাপ
স্থানীয় ব্যবসায়ীদের দাবি, বড় কোম্পানির প্যাকেটজাত লবণ বাজারে প্রায় ৪৫ থেকে ৫০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হলেও স্থানীয় কারখানায় উৎপাদিত লবণ তুলনামূলক কম দামে বাজারজাত করা সম্ভব হয়। বিভিন্ন সময়ে স্থানীয় লবণের দাম প্রায় ২৫ টাকা কেজির কাছাকাছি থাকার কথাও ব্যবসায়ীরা জানিয়েছেন। তবে বাজারদর সময়, মান, প্যাকেটজাতকরণ, পরিবহন ও বিক্রয়স্থলভেদে পরিবর্তিত হয়। তাই নির্দিষ্ট একটি দামকে সার্বিক বাজারদর হিসেবে বিবেচনা করা ঠিক হবে না।
ব্যবসায়ীরা জানান, দেশের বিভিন্ন এলাকার দোকানিরা এসে পাইকারি দরে লবণ কিনে নিয়ে যান। বর্তমানে প্রতি কেজি ভোজ্য লবণ পাইকারি বাজারে ১০ টাকা এবং খুচরা বাজারে ১৮ থেকে ২০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। যেখানে উন্নত কোম্পানির প্রতি কেজি ভোজ্য লবণ ৪৫ থেকে ৫০ টাকা দরে বিক্রি করা হচ্ছে। দেশীয় পদ্ধতিতে উৎপাদিত লবণের দাম ক্রেতাদের ক্রয়সীমার মধ্যে থাকায় এর এখনও বেশ চাহিদা রয়েছে। কিন্তু দেশে অনেকগুলো আধুনিক লবণ তৈরির কারখানা হওয়ায় দেশীয় লবণের চাহিদা দিন দিন কমে যাচ্ছে। বড় মিল মালিকদের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে লবণ উৎপাদনে টিকে থাকতে সরকারি কোনো সুবিধা না পাওয়ার কথাও জানিয়েছেন লবণ কারখানা মালিকেরা।
সহজ শর্তে ঋণের দাবি
মিল মালিকদের সবচেয়ে বড় দাবিগুলোর একটি সহজ শর্তে ব্যাংকঋণ। তাদের বক্তব্য, আধুনিক মেশিন, সেন্ট্রিফিউজ, প্যাকেটজাতকরণ ইউনিট ও অন্যান্য প্রযুক্তি স্থাপন করতে বড় অঙ্কের অর্থ প্রয়োজন। কিন্তু ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের অনেকেই প্রয়োজনীয় অর্থায়ন পাচ্ছেন না। ফলে পুরোনো যন্ত্রপাতি দিয়েই উৎপাদন চালিয়ে যেতে হচ্ছে। এতে একই সঙ্গে তিনটি সমস্যা তৈরি হচ্ছে—উৎপাদন সময় বাড়ছে, শ্রম ব্যয় বাড়ছে এবং পণ্যের প্রতিযোগিতামূলক সক্ষমতা কমছে।
একটি শিল্পের সঙ্গে জড়িয়ে বহু মানুষের জীবন
ঝালকাঠির লবণশিল্পকে শুধু কয়েকটি কারখানার ব্যবসা হিসেবে দেখলে এর প্রকৃত গুরুত্ব বোঝা যাবে না। একটি লবণের বস্তা কক্সবাজার থেকে নৌপথে ঝালকাঠিতে আসার পর এর সঙ্গে যুক্ত হয় নৌযান মালিক, মাঝি, ঘাট শ্রমিক, কারখানা শ্রমিক, মেশিন অপারেটর, প্যাকেটজাতকারী, আড়তদার, পরিবহন শ্রমিক, পাইকার ও খুচরা ব্যবসায়ী।
অর্থাৎ একটি শিল্পের সঙ্গে তৈরি হয় একটি পূর্ণাঙ্গ অর্থনৈতিক চক্র। এই চক্রে কারখানা কমে গেলে কর্মসংস্থান কমে। উৎপাদন কমলে আড়ত ও পরিবহন ব্যবসায়ও প্রভাব পড়ে। আর শ্রমিকের আয় কমলে স্থানীয় বাজারেও তার প্রভাব পড়ে।ঝালকাঠির লবণশিল্পের সবচেয়ে বড় শক্তি তার দীর্ঘ ঐতিহ্য, দক্ষ শ্রমিক, নদীপথের ঐতিহাসিক সুবিধা এবং দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে বাজারজাতকরণের অভিজ্ঞতা।
অন্যদিকে সবচেয়ে বড় দুর্বলতা পুরোনো প্রযুক্তি, পর্যাপ্ত বিনিয়োগের অভাব, উৎপাদন ব্যয়, পরিবহন সমস্যা, শ্রমিকের অনিশ্চিত আয় এবং বড় কোম্পানির সঙ্গে প্রতিযোগিতা।
বিসিকের সহযোগিতার আশ্বাস
ঝালকাঠি বিসিক জেলা কার্যালয়ের উপব্যবস্থাপক মো. আল আমিন বলেন, “জেলার লবণ কারখানার উদ্যোক্তারা পুরোনো যন্ত্রপাতি ও যানবাহন যোগাযোগব্যবস্থার কারণে সমস্যায় পড়ছেন। শিল্পটি যাতে হারিয়ে না যায়, সে জন্য আর্থিক ও যোগাযোগব্যবস্থার উন্নয়নে সহযোগিতার বিষয়ে উদ্যোগ নেওয়া হবে।”
তিনি আরও বলেন, “লবণের মান বজায় রাখতে নিয়মিত কারখানা পরিদর্শন করা হয়। সনাতন পদ্ধতির মিলগুলো আধুনিকায়নের উদ্যোগ নেওয়া হলে সরকারের পক্ষ থেকে প্রয়োজনীয় সহযোগিতা করা হবে। বর্তমানে কারখানাগুলোতে যে পরিমাণে লবণ বাজারজাত করা হয়, তাতে শুধু জেলার চাহিদা নয়, পুরো বরিশাল বিভাগের চাহিদা মিটিয়ে বিভিন্ন জেলায় পাঠানো হয়।”
