×

চট্টগ্রাম

টিকাদানের ঘাটতিতে বাড়ছে হাম

Icon

মেঘনা (কুমিল্লা) প্রতিনিধি

প্রকাশ: ০৩ এপ্রিল ২০২৬, ০৪:৪৯ পিএম

টিকাদানের ঘাটতিতে বাড়ছে হাম

ছবি: সংগৃহীত

বাংলাদেশে আবারো বাড়ছে হাম রোগে আক্রান্তের সংখ্যা, যা জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থার জন্য নতুন করে সতর্কবার্তা হয়ে উঠেছে। দেশের বিভিন্ন জেলা ও সদর হাসপাতালগুলোতে জ্বর, ফুসকুড়ি ও শ্বাসতন্ত্রের জটিলতা নিয়ে ভর্তি হচ্ছে শিশু।

চিকিৎসকদের মতে, এ রোগ প্রতিরোধযোগ্য হওয়া সত্ত্বেও টিকাদানে ঘাটতি, সচেতনতার অভাব এবং পুষ্টি হীনতা মিলিয়ে পরিস্থিতি উদ্বেগজনক দিকে যাচ্ছে।

এদিকে, কুমিল্লার মেঘনা উপজেলাতেও হাম রোগের সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়েছে। 

শুক্রবার (৩ এপ্রিল) সকালে উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. সায়মা রহমান বিষয়টি নিশ্চিত করেন।

তিনি জানান, আগের দিন বৃহস্পতিবার উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ৪টি সন্দেহভাজন রোগীর নমুনা সংগ্রহ করা হয়েছে এবং এলাকায় ইতোমধ্যে সংক্রমণ বিস্তারের লক্ষণ স্পষ্টভাবে দেখা যাচ্ছে। এছাড়াও পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে স্বাস্থ্য বিভাগ প্রয়োজনীয় জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থা গ্রহণের চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে এবং আক্রান্তদের চিকিৎসা ও নিবিড় পর্যবেক্ষণের আওতায় আনা হচ্ছে। চট্টগ্রাম বিভাগীয় পরিচালকের নির্দেশনায় শিশুদের রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে শিগগিরই ভিটামিন-এ ক্যাপসুল ক্যাম্পেইন পরিচালনা করা হবে এবং উপজেলা প্রশাসনের সহযোগিতায় তা বাস্তবায়নের প্রস্তুতি চলছে। একই সঙ্গে সচেতনতা বৃদ্ধি ও টিকাদান কার্যক্রম জোরদার করা হচ্ছে।

তিনি আরও জানান, জাতীয় টিকাদান কর্মসূচি অনুযায়ী ৯ মাস বয়সে প্রথম ডোজ এমআর (Measles-Rubella) টিকা এবং ১৫ মাস বয়সে দ্বিতীয় ডোজ এমআর টিকা প্রদান অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হলেও অনেক শিশু এখনো এই টিকা থেকে বঞ্চিত রয়েছে। বিশেষ করে ১৫ মাসের দ্বিতীয় ডোজ না নেওয়ার কারণেই সংক্রমণের ঝুঁকি বাড়ছে এবং অনেক শিশু আক্রান্ত হচ্ছে। ইতোমধ্যে টিকা বঞ্চিত শিশুদের শনাক্ত করে টিকাদানের আওতায় আনার কার্যক্রম চালানো হচ্ছে। অভিভাবকদের প্রতি আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, অবহেলা না করে নির্ধারিত সময় অনুযায়ী শিশুদের টিকা নিশ্চিত করতে হবে, কারণ সময়মতো টিকাদান ও সচেতনতাই একটি শিশুর জীবন রক্ষা পেতে পারে।

হাম একটি তীব্র সংক্রামক ভাইরাসজনিত রোগ, যার জন্য দায়ী মিজেলস ভাইরাস। এটি মূলত শ্বাসতন্ত্রকে আক্রান্ত করে এবং অত্যন্ত দ্রুত ছড়িয়ে পড়ার ক্ষমতা রাখে। একজন আক্রান্ত ব্যক্তি কাশি বা হাঁচি দিলে বাতাসে ছড়িয়ে পড়া ক্ষুদ্র কণার মাধ্যমে আশপাশের মানুষ সহজেই সংক্রমিত হতে পারে। গবেষণায় দেখা গেছে, একজন আক্রান্ত ব্যক্তি গড়ে ১২ থেকে ১৮ জন সুস্থ মানুষকে সংক্রমিত করতে পারে, যা একে বিশ্বের অন্যতম সংক্রামক রোগে পরিণত করেছে।

রোগটির উপসর্গ সাধারণত সংক্রমণের ১০ থেকে ১৪ দিনের মধ্যে প্রকাশ পায়। শুরুতে ১০১ থেকে ১০৪ ডিগ্রি ফারেনহাইট পর্যন্ত জ্বর, নাক দিয়ে পানি পড়া, কাশি, চোখ লাল হয়ে যাওয়া ও আলোর প্রতি সংবেদনশীলতা দেখা দেয়। এরপর মুখের ভেতরে গালের পাশে ক্ষুদ্র সাদা দাগ বা কপলিক স্পট দেখা যায়, যা হাম রোগের একটি বিশেষ লক্ষণ। দুই থেকে তিন দিনের মধ্যে ত্বকে লালচে ম্যাকুলোপ্যাপুলার র‍্যাশ দেখা দেয়, যা প্রথমে মুখে শুরু হয়ে ধীরে ধীরে ঘাড়, বুক, পিঠ এবং পরে সারা শরীরে ছড়িয়ে পড়ে। অনেক ক্ষেত্রে রোগের তীব্রতা বাড়লে নিউমোনিয়া, ডায়রিয়া, কানের সংক্রমণ, এমনকি এনসেফালাইটিসের মতো জটিলতা দেখা দিতে পারে। বিশেষ করে পাঁচ বছরের নিচের শিশু এবং অপুষ্টিতে ভোগা শিশুদের ক্ষেত্রে মৃত্যু ঝুঁকি বেশি।

হাম রোগের পেছনে সবচেয়ে বড় কারণ হলো টিকাদানের ঘাটতি। জাতীয় টিকাদান কর্মসূচির আওতায় এমআর টিকা দুটি ডোজে দেওয়া হয়, যা অধিকাংশ ক্ষেত্রে কার্যকর সুরক্ষা দেয়। কিন্তু যেসব শিশু সময়মতো টিকা পায় না বা টিকাদান কার্যক্রম থেকে বাদ পড়ে যায়, তারা সংক্রমণের উচ্চ ঝুঁকিতে থাকে। শহরের বস্তি এলাকা, দুর্গম গ্রামাঞ্চল এবং প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর মধ্যে এ সমস্যা বেশি দেখা যায়। পাশাপাশি ভিটামিন ‘এ’-এর ঘাটতি থাকলে রোগটি মারাত্মক আকার ধারণ করতে পারে, কারণ এটি রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা দুর্বল করে দেয়।

হাম যে ছোঁয়াচে রোগ, তা নিয়ে কোনো সন্দেহ নেই। আক্রান্ত ব্যক্তি উপসর্গ প্রকাশের চার দিন আগে থেকে এবং ফুসকুড়ি ওঠার চার দিন পর পর্যন্ত অন্যদের সংক্রমিত করতে পারে। এ কারণে রোগটি দ্রুত মহামারি আকার ধারণ করতে পারে, বিশেষ করে যেখানে জনঘনত্ব বেশি এবং স্বাস্থ্যবিধি মানা হয় না।

প্রতিরোধের ক্ষেত্রে সবচেয়ে কার্যকর পদ্ধতি হলো টিকাদান নিশ্চিত করা। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সুপারিশ অনুযায়ী, কমপক্ষে ৯৫ শতাংশ শিশুকে টিকার আওতায় আনতে পারলে এই রোগ নির্মূল করা সম্ভব। এছাড়া আক্রান্ত ব্যক্তিকে আলাদা রাখা, ঘরের বায়ু চলাচল নিশ্চিত করা, নিয়মিত হাত ধোয়া এবং কাশি-হাঁচির শিষ্টাচার মেনে চলা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আক্রান্ত শিশুকে ভিটামিন ‘এ’ ক্যাপসুল প্রদান করলে জটিলতা ও মৃত্যু ঝুঁকি উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যায় বলে বিভিন্ন গবেষণায় প্রমাণিত হয়েছে।

অনেকেই মনে করেন হাম শুধুই শিশুদের রোগ, তবে বাস্তবে তা নয়। যেসব প্রাপ্তবয়স্ক ব্যক্তি শৈশবে টিকা নেয়নি বা আগে কখনো আক্রান্ত হয়নি, তাদেরও এই রোগ হতে পারে। বড়দের ক্ষেত্রে উপসর্গ অনেক সময় আরও তীব্র হয় এবং জটিলতার ঝুঁকিও বেশি থাকে, বিশেষ করে গর্ভবতী নারীদের ক্ষেত্রে এটি গুরুতর সমস্যা তৈরি করতে পারে।

বর্তমান পরিস্থিতিতে প্রাথমিক বিদ্যালয় বন্ধ রাখা উচিত কি না, তা নির্ভর করে সংক্রমণের মাত্রা ও বিস্তারের ওপর। জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, হঠাৎ করে সব শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ না করে প্রথমে আক্রান্ত শিক্ষার্থীদের শনাক্ত ও পৃথকীকরণ, স্কুলে টিকাদান কার্যক্রম জোরদার, স্বাস্থ্যবিধি নিশ্চিতকরণ এবং অভিভাবকদের সচেতন করা জরুরি। তবে কোনো এলাকায় যদি ব্যাপক সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়ে, তখন সাময়িকভাবে শিক্ষা কার্যক্রম স্থগিত রাখার সিদ্ধান্ত নেওয়া যেতে পারে, যাতে সংক্রমণের শৃঙ্খল ভাঙা যায়।

এই মুহূর্তে সরকারের করণীয় বহুমাত্রিক। প্রথমত, জরুরি ভিত্তিতে জাতীয় পর্যায়ে বিশেষ টিকাদান ক্যাম্পেইন চালু করে টিকা বিহীন শিশুদের আওতায় আনতে হবে। দ্বিতীয়ত, রোগ শনাক্তকরণ ও রিপোর্টিং ব্যবস্থা শক্তিশালী করতে হবে, যাতে দ্রুত সংক্রমণের হটস্পট চিহ্নিত করা যায়। তৃতীয়ত, হাসপাতালগুলোতে পর্যাপ্ত শয্যা, ওষুধ, অক্সিজেন ও প্রশিক্ষিত জনবল নিশ্চিত করতে হবে। পাশাপাশি গণমাধ্যমের মাধ্যমে সচেতনতা বৃদ্ধি, স্কুল ভিত্তিক স্বাস্থ্য শিক্ষা এবং স্থানীয় প্রশাসনের সক্রিয় অংশগ্রহণ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

একসময় প্রায় নির্মূলের পথে থাকা হাম রোগের পুনরুত্থান আমাদের স্বাস্থ্য ব্যবস্থার একটি বড় দুর্বলতার দিক তুলে ধরছে। টিকাদান ব্যবস্থায় সামান্য শৈথিল্য, জনসচেতনতার অভাব এবং সমন্বয়ের ঘাটতি কীভাবে একটি প্রতিরোধ যোগ্য রোগকে আবার ভয়াবহ করে তুলতে পারে, তারই বাস্তব উদাহরণ বর্তমান পরিস্থিতি। এখনই সরকারের সমন্বিত ও কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া না হলে এর প্রভাব আরও বিস্তৃত ও মারাত্মক হয়ে উঠতে পারে।

সাবস্ক্রাইব ও অনুসরণ করুন

অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টাদের দুর্নীতি তদন্ত ও বিচারের দাবি

অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টাদের দুর্নীতি তদন্ত ও বিচারের দাবি

শত্রুতার জেরে ২৪ একর তরমুজ ধ্বংস করল সন্ত্রাসীরা

শত্রুতার জেরে ২৪ একর তরমুজ ধ্বংস করল সন্ত্রাসীরা

দ্বিতীয় মার্কিন এফ-৩৫ যুদ্ধবিমান ভূপাতিতের দাবি ইরানের

দ্বিতীয় মার্কিন এফ-৩৫ যুদ্ধবিমান ভূপাতিতের দাবি ইরানের

মার্চে বিশ্বজুড়ে খাদ্যের দাম আড়াই শতাংশ বেড়েছে

মার্চে বিশ্বজুড়ে খাদ্যের দাম আড়াই শতাংশ বেড়েছে

সব খবর

সম্পাদক : শ্যামল দত্ত

প্রকাশক : সাবের হোসেন চৌধুরী

অনুসরণ করুন

BK Family App