রাঙ্গামাটির পাহাড়ধস ট্র্যাজেডি: স্বজনহারাদের কান্না থামেনি
এখনো ঝুঁকিতে হাজারো মানুষ
নন্দন দেবনাথ, রাঙ্গামাটি প্রতিনিধি
প্রকাশ: ১৩ জুন ২০২৬, ০৩:৩৮ পিএম
ফাইল ছবি
রাঙ্গামাটির ভয়াবহ পাহাড়ধসের মর্মান্তিক ঘটনার নয় বছর পূর্ণ হলো আজ। ২০১৭ সালের ১৩ জুন টানা তিন দিনের ভারী বৃষ্টি ও বজ্রপাতের কারণে স্মরণকালের ভয়াবহ পাহাড়ধসের ঘটনা ঘটে। বছর ঘুরে দিনটি ফিরে এলে রাঙ্গামাটিবাসীর মনে ভেসে ওঠে আতঙ্কের সেই ভয়াল স্মৃতি। স্বজন হারানো মানুষের কান্নাও থামেনি আজও।
ভারী বর্ষণ ও বজ্রপাতের ফলে পাহাড়ধসে মাটিচাপা পড়ে একদিনেই সেনাসদস্যসহ নারী, পুরুষ ও শিশুসহ ১২০ জন প্রাণ হারান। এর মধ্যে শহরের মানিকছড়ি এলাকায় একটি সেনা ক্যাম্পের নিচে রাঙ্গামাটি-চট্টগ্রাম সড়কে ধসে পড়া মাটি সরাতে গিয়ে পুনরায় পাহাড়ধসের শিকার হয়ে দুই কর্মকর্তাসহ পাঁচ সেনাসদস্য নিহত হন।
নিহত সেনাসদস্যরা হলেন মেজর মোহাম্মদ মাহফুজুল হক, ক্যাপ্টেন মো. তানভীর সালাম শান্ত, করপোরাল মোহাম্মদ আজিজুল হক, সৈনিক মো. শাহিন আলম এবং সৈনিক মো. আজিজুর রহমান।
জেলা প্রশাসনের হিসাব অনুযায়ী, রাঙ্গামাটি সদরে ৬৬ জন, জুরাছড়িতে ৬ জন, বিলাইছড়িতে ২ জন, কাপ্তাইয়ে ১৮ জন এবং কাউখালীতে ২১ জনের মরদেহ উদ্ধার করা হয়। উদ্ধার হওয়া ১১৩ জনের মধ্যে ৩৩ শিশু, ৩২ নারী ও ৪৮ জন পুরুষ ছিলেন।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ২০১৭ সালের ১৩ জুনের পাহাড়ধস ছিল দেশের ইতিহাসে অন্যতম ভয়াবহ প্রাকৃতিক বিপর্যয়। এতে ব্যাপক প্রাণহানির পাশাপাশি অবকাঠামোরও মারাত্মক ক্ষতি হয়। বসতবাড়িযুক্ত পাহাড়ের পাশাপাশি বনাঞ্চল ও গাছপালায় আচ্ছাদিত পাহাড়ও ধসে পড়ে। পাহাড়ধসের ব্যাপ্তি, বিস্তৃতি ও গভীরতা ছিল অত্যন্ত বড়।
ফায়ার সার্ভিসের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩ সালে ৩৫টি পাহাড়ধসের ঘটনায় ১৫ জন নিহত ও ২৩৪ জন আহত হন। ২০২২ সালে ১০টি ঘটনায় পাঁচজন নিহত ও ১০ জন আহত হন। ২০২১ সালে ১০টি ঘটনায় ছয়জন নিহত ও ৩৪ জন আহত হন। ২০২০ সালে ১৩টি ঘটনায় ১৪ জন নিহত ও ১৮ জন আহত হন। ২০১৯ সালে ১৭টি ঘটনায় ১৩ জন নিহত ও ২৮ জন আহত হন। ২০১৮ সালে ২১টি ঘটনায় ৪৫ জন নিহত ও ৩২ জন আহত হন। ২০১৭ সালে ৫২টি ঘটনায় ৯১ জন নিহত ও ৫২ জন আহত হন। ২০১৬ সালে ১১টি ঘটনায় সাতজন নিহত ও ২০ জন আহত হন। ২০১৫ সালে ২৩টি ঘটনায় ৩৯ জন নিহত ও ৩১ জন আহত হন।
টানা তিন দিনের প্রবল বর্ষণে রাঙ্গামাটিতে এত প্রাণহানি, ঘরবাড়ি ধ্বংস, সড়ক যোগাযোগ ও বিদ্যুৎ ব্যবস্থার এমন বিপর্যয় ঘটবে, তা কেউ কল্পনাও করেননি। মুহূর্তেই পর্যটননগরী রাঙ্গামাটি দেশের অন্যান্য অঞ্চল থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। সেনাবাহিনী এবং সড়ক ও জনপথ বিভাগের সহায়তায় নয় দিন পর সারা দেশের সঙ্গে রাঙ্গামাটির সড়ক যোগাযোগ আংশিকভাবে স্বাভাবিক হয়।
১৩ জুন রাত থেকেই বজ্রপাতসহ শুরু হয় প্রবল বর্ষণ। আতঙ্কের মধ্যে রাত কাটাতে হয় রাঙ্গামাটির মানুষকে। ভোর হওয়ার পর শহরের ভেদভেদী, মোনতলা, রাঙ্গাপানি, শিমুলতলি, মুসলিমপাড়া, লোকনাথ মন্দির এলাকা, সদর উপজেলার মগবান ও সাপছড়ি ইউনিয়নসহ পাঁচটি উপজেলার বিভিন্ন স্থানে পাহাড়ধসে হতাহত ও ক্ষয়ক্ষতির খবর আসতে থাকে। রাঙ্গামাটির ইতিহাসে আর কোনো দুর্যোগে এত প্রাণহানি ঘটেনি।
পাহাড়ধসে চট্টগ্রাম-রাঙ্গামাটি সড়কের শালবন এলাকায় প্রায় ১০০ মিটার সড়ক বিলীন হয়ে যায়। ফলে টানা নয় দিন দেশের অন্যান্য স্থানের সঙ্গে রাঙ্গামাটির সড়ক যোগাযোগ বন্ধ ছিল। বিভিন্ন আন্তঃসড়কের ১৪৫টি স্থানে ভাঙন দেখা দেয়। রাঙ্গামাটি-চট্টগ্রাম সড়কের পাশাপাশি রাঙ্গামাটি-খাগড়াছড়ি-বান্দরবান, রাঙ্গামাটি-বড়ইছড়ি এবং রাঙ্গামাটি-কাপ্তাই সড়ক যোগাযোগও বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়।
এ ছাড়া বৈদ্যুতিক গ্রিড লাইনের খুঁটি ও তারের ব্যাপক ক্ষতি হয়। এতে শহরে তিন দিন বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ থাকে। বিশুদ্ধ পানির সংকটও চরম আকার ধারণ করে।
সেনাবাহিনী, সড়ক বিভাগ এবং বিদ্যুৎ বিভাগের কর্মীদের দ্রুত প্রচেষ্টায় তিন দিনের মাথায় বিদ্যুৎ সরবরাহ এবং ১০ দিনের মধ্যে রাঙ্গামাটি-চট্টগ্রাম সড়ক যোগাযোগ পুনঃস্থাপন করা সম্ভব হয়। সড়ক যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন থাকায় প্রশাসন কাপ্তাই-রাঙ্গামাটি নৌপথে লঞ্চের মাধ্যমে পানি, জ্বালানি তেল, পণ্য পরিবহন এবং যাত্রী চলাচলের ব্যবস্থা করে।
তবে নয় বছর পরও রাঙ্গামাটির বিভিন্ন এলাকায় বহু মানুষ পাহাড়ধসের ঝুঁকিতে বসবাস করছেন। বর্ষা এলেই ফিরে আসে ২০১৭ সালের সেই বিভীষিকাময় স্মৃতি ও নতুন শঙ্কা।
