যে পরিচয়ে হোটেলে ছিল তাজমিন, ভিডিও ফুটেজে যা পাওয়া গেল
কাগজ ডেস্ক
প্রকাশ: ১২ অক্টোবর ২০২৬, ০৯:৪১ এএম
ছবি : সংগৃহীত
কুমিল্লায় ধর্ষণের পর হত্যার শিকার স্কুলছাত্রী জান্নাতুল তাজমীন (১৫) হত্যাকাণ্ডের তদন্তে নতুন তথ্য সামনে এসেছে। ঘটনার আগে কক্সবাজারের একটি আবাসিক হোটেলে ‘রাজুর স্ত্রী’ পরিচয়ে অবস্থান করেছিল সে। হোটেলের রেজিস্টারে তার নাম লেখা হয়েছিল ‘তানজু আক্তার’ এবং বয়স উল্লেখ করা হয়েছিল ১৮ বছর।
হোটেলের রেজিস্টার, সিসিটিভি ফুটেজ এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বক্তব্য থেকে তাজমীনের কক্সবাজার যাত্রা ও বাড়ি ফেরার পথ সম্পর্কে বিভিন্ন তথ্য জানা গেছে। তবে তার কক্সবাজার যাত্রার সঙ্গে হত্যাকাণ্ডে জড়িত থাকার বিষয়টি আলাদা করে তদন্ত করছে পুলিশ।
‘রাজুর স্ত্রী’ পরিচয়ে হোটেলে অবস্থান
হোটেলের রেজিস্টার অনুযায়ী, গত ৬ অক্টোবর সন্ধ্যা ৭টা ২৫ মিনিটে কক্সবাজারের কলাতলীতে কুটুমবাড়ি রোডের শেষ মাথায় অবস্থিত মেঘলা রিসোর্টের ৩০২ নম্বর কক্ষে ওঠে তাজমীন ও রিয়াজ উদ্দিন ওরফে রাজু। সেখানে তাজমীনকে রাজুর স্ত্রী হিসেবে পরিচয় করানো হয়। রেজিস্টারে তার নাম লেখা হয় ‘তানজু আক্তার’ এবং বয়স উল্লেখ করা হয় ১৮ বছর।
হোটেলটির এক কর্মচারী নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, এক রাত থাকার পর ৭ অক্টোবর বেলা ১১টার দিকে তারা হোটেল ছেড়ে চলে যান। রেজিস্টারে রাজুর দুটি মোবাইল নম্বর ও একটি জাতীয় পরিচয়পত্রের (এনআইডি) নম্বরও লেখা ছিল।
সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের ভাষ্য অনুযায়ী, কক্সবাজারের একটি আবাসিক হোটেলে কাজ করেন রাজু। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তাজমীনের সঙ্গে তার পরিচয় ও যোগাযোগ ছিল। তবে তাদের পরিচয় কত দিন আগে হয়েছিল, সে বিষয়ে সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর বক্তব্যে ভিন্নতা রয়েছে।
বাসে তুলে দেন রাজু
রাজুর এক সহকর্মীর দাবি, তাজমীনকে কুমিল্লায় ফেরার জন্য ‘আইকনিক এক্সপ্রেস’ বাসের টিকিট কেটে দেন রাজু। টিকিটের দাম ছিল ৯০০ টাকা। ওই সহকর্মী জানান, তাজমীন হত্যাকাণ্ডের পর রাজু নিজেকে নির্দোষ দাবি করেছেন এবং ঘটনার সঙ্গে নিজের সম্পৃক্ততা নেই বলে জানিয়েছেন।
অন্যদিকে, কক্সবাজারের একটি ট্রাভেল এজেন্সির কর্মী আবদুল্লাহ জানান, ৬ অক্টোবর রাতে তাজমীন ও রাজু তাদের কাউন্টারে গিয়ে পরদিনের বাসের টিকিট বুক করেন। রাজুর ভাষ্য অনুযায়ী, ৭ অক্টোবর দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে তাজমীনকে বাসে তুলে দেন তিনি।
সিসিটিভি ফুটেজে দেখা যায় পদুয়ারবাজারে নামতে
সিসিটিভি ফুটেজ অনুযায়ী, ৭ অক্টোবর রাত পৌনে ১২টার দিকে কক্সবাজার থেকে আসা আইকনিক এক্সপ্রেসের বাস থেকে কুমিল্লার পদুয়ারবাজার বিশ্বরোডের হোটেল নূরজাহানের সামনে নামে তাজমীন।
এরপর শহরের রেসকোর্স এলাকার বাসায় যাওয়ার জন্য একটি সিএনজিচালিত অটোরিকশা ভাড়া করে সে। কিন্তু বাড়িতে আর পৌঁছানো হয়নি তার।
পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, অটোরিকশাচালক মো. সুমন মিয়া (৩৫) তাজমীনকে নির্জন স্থানে নিয়ে ধর্ষণের পর হত্যা করেন। পরদিন ৮ অক্টোবর সকালে কুমিল্লার লালমাই উপজেলার একটি ধানখেত থেকে তার মরদেহ উদ্ধার করা হয়।
এ ঘটনায় করা হত্যা মামলায় সুমনকে চট্টগ্রাম থেকে গ্রেপ্তার করা হয়। পুলিশের দাবি, আদালতে তিনি হত্যার দায় স্বীকার করে জবানবন্দি দিয়েছেন। তার দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে তাজমীনের ব্যবহৃত আইফোনও উদ্ধার করা হয়েছে।
বাড়ি থেকে বের হওয়ার পেছনে কী ঘটেছিল
পরিবারের সদস্যদের ভাষ্য অনুযায়ী, বাড়ি থেকে বের হওয়ার সময় তাজমীন তার মাকে জানিয়েছিল, সে এক বান্ধবীর বাসায় যাচ্ছে। তবে বান্ধবীর নাম ও পরিবারের পরিচয় জানতে চাইলে সে বিস্তারিত কিছু জানায়নি।
তাজমীনের মা কেয়া খাতুন জানান, ৭ অক্টোবর মেয়ের সঙ্গে তার শেষ কথা হয়েছিল। তখন তাজমীন জানিয়েছিল, সে এক বান্ধবীর সঙ্গে আছে। মেয়েকে বান্ধবীর বাড়ি থেকে নিয়ে আসতে চাইলেও সে কার সঙ্গে রয়েছে, সে বিষয়ে স্পষ্ট তথ্য পাননি।
পরিবারের সূত্রে আরও জানা গেছে, ৪ অক্টোবর এক বান্ধবীকে হাতঘড়ি দেওয়া নিয়ে মায়ের সঙ্গে তাজমীনের ঝগড়া হয়। এরপর সে বাড়ি থেকে বের হয়ে প্রথমে ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় এক বান্ধবীর কাছে যায়। পরে রাজুর সঙ্গে যোগাযোগ করে কক্সবাজারের উদ্দেশে রওনা হয়। রাজু বিকাশের মাধ্যমে তাকে ৫০০ টাকা পাঠিয়েছিলেন বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে দাবি করা হয়েছে।
তাজমীনের সঙ্গে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হওয়ার দাবি
রাজুর এক সহকর্মীর ভাষ্য, কুমিল্লায় ফেরার পথে অটোরিকশায় ওঠার পরও তাজমীনের সঙ্গে রাজুর মোবাইল ফোনে কথা হচ্ছিল। তাজমীন অটোরিকশাচালকের তথ্যও রাজুকে জানিয়েছিল বলে তিনি দাবি করেন।
ওই সহকর্মীর দাবি, রাত দেড়টার দিকে তাজমীনের মোবাইলের লাইভ লোকেশন বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর তার সঙ্গে আর যোগাযোগ করা সম্ভব হয়নি। পরদিন টেলিভিশনে তাজমীনের ধর্ষণ ও হত্যার খবর দেখে রাজু স্তম্ভিত হয়ে পড়েন বলে জানান তিনি।
ঘটনার পর থেকে রাজুর মোবাইল ফোন বন্ধ রয়েছে বলে জানিয়েছেন ওই সহকর্মী। তবে রাজুর সঙ্গে তাজমীনের যোগাযোগ এবং ঘটনার সময়কার পরিস্থিতি সম্পর্কে বিস্তারিত জানতে পুলিশ তদন্ত চালাচ্ছে।
লালমাই থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মিজানুর রহমান জানান, মোবাইল ফোনের কললিস্টসহ বিভিন্ন বিষয় খতিয়ে দেখা হচ্ছে। তদন্ত শেষ হলে ঘটনার বাকি তথ্য জানা যাবে।
তাজমীনকে নিয়ে স্মৃতিচারণ শিক্ষকের
তাজমীনের শিক্ষক সাদ বিন এরশাদ জানান, মেয়েটি চঞ্চল স্বভাবের ছিল। মা অসুস্থ থাকলে দুই যমজ ছোট ভাইয়ের দেখাশোনা করত সে। তার বাবা একটি ওষুধ কোম্পানিতে চাকরি করতেন এবং সকালে বাসা থেকে বের হয়ে রাতে ফিরতেন। বাবার সঙ্গে তাজমীনের স্নেহপূর্ণ সম্পর্ক ছিল বলেও জানান তিনি।
তাজমীন হত্যাকাণ্ডে অটোরিকশাচালক সুমনকে গ্রেপ্তার করা হলেও তার কক্সবাজার যাত্রা, রাজুর সঙ্গে যোগাযোগ এবং ঘটনার আগের সময়ের বিভিন্ন বিষয় নিয়ে তদন্ত অব্যাহত রয়েছে।
