ভূমধ্যসাগরে প্রাণ হারানো সুনামগঞ্জের ১০ যুবকের বাড়িতে মাতম
সাজ্জাদ হোসেন শাহ্, সুনামগঞ্জ প্রতিনিধি
প্রকাশ: ২৯ মার্চ ২০২৬, ১১:২৬ পিএম
ছবি: সংগৃহীত
অবৈধভাবে লিবিয়া থেকে ইউরোপে যাওয়ার পথে ভূমধ্যসাগরে নৌকায় যে ১৮ জন বাংলাদেশি মারা গেছে, তাদের মধ্যে ১০ জন সুনামগঞ্জের বাসিন্দা। এ ঘটনায় নিহতদের পরিবারের চলছে শোকের মাতম, এলাকায় নেমে এসেছে শোকের ছায়া।
নিহতদের পারিবারিক সূত্রে জানা যায়, নিহতরা লিবিয়া থেকে সাগর পাড়ি দিয়ে নৌকায় করে গ্রিসে যাওয়ার উদ্দেশ্যে রওয়ানা করে। অথৈ সাগরে পথ হারিয়ে খাবার ও বিশুদ্ধ পানির অভাবে, অন্তত ২২ অভিবাসন প্রত্যাশীর মৃত্যু হয়েছে। এদের মধ্যে সুনামগঞ্জের অন্তত ১০ জন রয়েছেন।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, উন্নত জীবনের আশায় প্রবাসে যাওয়ার স্বপ্ন হাওর অঞ্চলের অনেক যুবকদের। তবে সেই প্রবাসের স্বপ্ন পূরণ করতে, মাধ্যম হিসেবে অনেকেই বেছে নিয়েছেন দালাল অর্থাৎ মানবপাচারকারী। এসব দালালের খপ্পরে পড়ে, উন্নত জীবন তো দূরের কথা গন্তব্যে পৌঁছতে গিয়ে কেউ কেউ পড়েছেন মাফিয়া চক্রের পাল্লায়। কেউবা কফিনবন্দি হয়ে ফিরেছেন দেশে, আবার কেউবা চিরতরে হারিয়ে যাচ্ছেন সমুদ্রের অথৈ গভীরে।
সুনামগঞ্জের দিরাই উপজেলার কুলঞ্জ ইউনিয়নের তারাপাশা গ্রামের ৭০ বছরের বৃদ্ধ আব্দুল গনি। তার ৩ ছেলে এবং ৪ মেয়েকে নিয়ে সাজানো গোছানো সংসার। এদিকে গণির ছোট ছেলের বায়না পরিবারের আর্থিক সচ্ছলতা ফেরাতে দূর প্রবাসে পাড়ি দেবে সে। নিরুপায় হয়ে বৃদ্ধ গণি ধারদেনা, জায়গাজমি বিক্রি করে, ১২ লাখ টাকা দিয়ে দালালের মাধ্যমে ছেলেকে গ্রিসে পাঠালেও সেই ছেলের মৃত্যু হয় সমুদ্রের মধ্যে। সেই শোকে কাতর হয়ে, মোবাইল হাতে নিয়ে বাড়ির সামনে বসে অঝোরে কাঁদছেন বৃদ্ধ আব্দুল গণি।
আব্দুল গনি জানান, আমরা গতকাল শনিবার রাতে (২৮ মার্চ) খবর পেয়েছি, আমাদের ছেলে আর বেঁচে নেই তিনি বলেন, জায়গাজমি বিক্রি করে টাকা দিলাম। দালালকে অনেক অনুরোধ করলাম ছেলেকে যেন ভালো মতে পৌঁছে দেয়। কিন্তু সেটা আর হলো না। এখন একটাই চাওয়া শেষবারের মতো ছেলের নিথর দেহটা দেখতে চাই।
একই গ্রামের আরও দুই যুবক, আবু সর্দারের ছেলে মো. নুরুজ্জামান সর্দার ময়না (৩২), মৃত ক্বারী ইসলাম উদ্দীনের ছেলে মো. সাহান এহিয়া (২২) সহ, একই উপজেলার ৫ যুবকের মৃত্যু হয়।
একটি সূত্রে জানা যায়, অবৈধভাবে স্বপ্নের দেশ গ্রিস যাওয়ার পথে সাগরের পথ ভুলে খাবার ও বিশুদ্ধ পানির অভাবে একে একে মৃত্যু হয়, সুনামগঞ্জের দিরাইয়ের ৫, জগন্নাথপুরে ৪ ও দোয়ারা বাজারের ১ যুবকসহ ৩ উপজেলার ১০ যুবকের।
দিরাই উপজেলার নিহত এক যুবকের, মামা মো. আরশাদ আলী বলেন, সংসারের হাল ধরতে দালালের মাধ্যমে আমার ভাগনে গ্রিসের পথে রওনা দিয়েছিল। কিন্তু সেটা আর হলো না। গ্রিসে যাওয়ার আগেই তার মৃত্যু হলো।
নিহত মো. নুরুজ্জামান সর্দার ময়নার আত্মীয় রাহুল মিয়া বলেন, দালালকে ১২ টাকা ঋণ করে দিয়ে আমাদের সন্তানদের মরতে হলো। আমরা এখন কী নিয়ে বাঁচবো? দ্রুত দালালদের আইনের আওতায় এনে, সর্বোচ্চ শাস্তির দাবি জানাচ্ছি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কাছে।
দিরাই উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সনজীব সরকার বলেন, বিষয়টি জেলা প্রশাসক মহোদয়কে জানানো হয়েছে।
