দুই দিনব্যাপী তরুণ নারী সম্মেলন
আগামীর বাংলাদেশকে নেতৃত্ব দেয়ার শপথ নিলেন এক ঝাঁক তরুণ নারী
কাগজ প্রতিবেদক
প্রকাশ: ১৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৫:২৭ পিএম
ছবি: সংগৃহীত
বলা হয়, তরুণরা রাজনীতিতে আসতে চান না। কারণ সেই পরিবেশ নেই। সমাজে ভ্রান্ত ধারণা আছে- নারীদের নেতৃত্ব দেয়ার মত যোগ্যতা নেই। তাই নেতৃত্বেও পিছিয়ে রাখা হতো নারীদের। এমন সব ভ্রান্ত ধারণা ও প্রতিকূলতা পেরিয়ে এক ঝাঁক তরুণ নারী শপথ নিলেন আগামীর বাংলাদেশকে নেতৃত্ব দেয়ার। তাদের চোখে মুখে স্পষ্টই সেই দৃঢ়তা। বক্তব্যে যেমন উঠে এসেছে নানা বঞ্চনা ও বৈষম্যের কথা, তেমনি সাহস ও অদম্য ইচ্ছা নিয়ে সেই বৈষম্যকে তারা পেছনে ফেলে এগিয়ে চলছেন। হাতে হাত রেখে ও কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে তাদের নেতৃত্বেই আগামীর বাংলাদেশ হবে সমতার। নিজেদেরকে সেভাবেই প্রস্তুত করেছেন তারা।
আমরা টুটাবো তিমির রাত বাঁধার বিন্ধ্যাচল প্রতিপাদ্য নিয়ে মানিকগঞ্জের কৈট্টায় প্রশিকা মানবিক উন্নয়ন কেন্দ্রে আয়োজিত দুই দিনব্যাপী তরুণ নারী সম্মেলনে সেই প্রত্যয়ের কথাই জানিয়েছেন তরুণ নারীরা। তরুণ নারীদের এই প্রত্যয়ের সঙ্গে একাত্মতা প্রকাশ করেছেন সম্মেলনে অংশ নেয়া অতিথিরা।
নরওয়ে দূতাবাস ও ইউএন উইমেনের সহযোগিতায় নারীপক্ষ আয়োজিত এ সম্মেলন শুরু হয়েছে বৃহস্পতিবার (১৭ সেপ্টেম্বর)। জাতীয় সংগীত ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে সম্মেলন শুরু হয়। উদ্বোধন করেন ইউএন উইমেনের প্রতিনিধি গীতাঞ্জলী সিং। স্বাগত বক্তব্য দেন নারীপক্ষের সভাপতি কে এ জাহান রুমী। সম্মেলনের উদ্দেশ্য, প্রকল্প পরিচিতি এবং নেতৃত্ব ও নারীর রাজনৈতিক অংশগ্রহণে নারীপক্ষের অবস্থান তুলে ধরেন সংগঠনটির সদস্য মাহীন খান।
আজ শুক্রবার (১৮ সেপ্টেম্বর) সম্মেলন শেষ হয়। দেশের ঢাকা, রাজশাহী ও বৃহত্তর চট্টগ্রাম বিভাগের বিভিন্ন এলাকা থেকে আসা তরুণ নারীরা এই আয়োজনে অংশ নেয়।
গীতাঞ্জলী সিং বলেন, বাংলাদেশে শক্তিশালী নারী আন্দোলন রয়েছে। তবে আন্দোলন যেভাবে চলছে এভাবে চললে হবে না। বিভিন্ন আন্দোলনে নারী অংশগ্রহণ উল্লেখযোগ্য সংখ্যক হলেও সিদ্ধান্ত গ্রহণের জায়গায় নারীদের উপস্থিতি এখনো অনেক কম। কাঠামোগত পরিবর্তন দরকার। যেহেতু জনসংখ্যার দিক থেকে নারী ও পুরুষ সমান সমান। তাই আমরা সমান সমান অধিকার চাই। তরুণ নারীদের ওপর বিনিয়োগকে শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান ও আরো অন্তর্ভুক্তিমূলক গণতন্ত্রে বিনিয়োগ হিসেবে উল্লেখ করে তিনি তরুণ নারী নেতৃত্বকে এগিয়ে নিতে আন্তঃদলীয় ও আন্তঃপ্রজন্ম নেটওয়ার্ক গড়ে তোলার আহ্বান জানান।
কে এ জাহান রুমী বলেন, বাংলাদেশের সমাজ ও রাষ্ট্রের ভবিষ্যৎ নির্মাণে তরুণদের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। ন্যায়ভিত্তিক ভবিষ্যৎ নির্মাণে তরুণ নারীদের কণ্ঠ, নেতৃত্ব ও সিদ্ধান্ত গ্রহণে অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা প্রয়োজন। নারীরা যেন অন্য নারীর অধিকার নিয়ে নেতৃত্বে আসতে এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণের জায়গায় নিজেদের অবস্থান তৈরি করতে পারেন, সেই সুযোগ তৈরি করতে হবে।
মাহীন সুলতানা বলেন, জনজীবনে নারীর অংশগ্রহণ বাড়লেও সিদ্ধান্ত গ্রহণের পর্যায়ে তাদের প্রতিনিধিত্ব এখনও কম। জুলাইয়ের আন্দোলনে তরুণ নারীদের ব্যাপক অংশগ্রহণ থাকলেও পরবর্তী রাজনৈতিক প্রক্রিয়ায় তাঁদের ধরে রাখা যায়নি।
সম্মেলনে মূল অধিবেশনে 'জনজীবনে নারী নেতৃত্ব অংশগ্রহণ থেকে প্রভাব বিস্তার' শীর্ষক আলোচনায় অংশ নেন সংসদ সদস্য ড. নীলুফা চৌধুরী মনি, সংসদ সদস্য নুসরাত তাবাসসুম, সাংস্কৃতিক কর্মী বিথী ঘোষ, বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির প্রেসিডিয়াম সদস্য জলি তালুকদার, নেত্রকোনা বিশ্ববিদ্যালয়ের উন্নয়ন অধ্যয়ন বিভাগের প্রভাষক তাপসীদের প্রাপ্তি।
আরও পড়ুন: বৈশাখী ভাতা নিয়ে সরকারি চাকরিজীবীদের জন্য বড় দুঃসংবাদ
এই পর্বে বক্তারা বলেন, পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্র- প্রতিটি ক্ষেত্রে পুরুষতান্ত্রিক কাঠামো বিদ্যমান। বিভিন্ন ক্ষেত্রে নারীর উপস্থিতি লক্ষ্য করা গেলেও সিদ্ধান্ত গ্ৰহণের ক্ষেত্রে নারীরা এখনো অনেক পিছিয়ে। নারী-পুরুষের সমতা প্রতিষ্ঠায় সমাজে বিদ্যমান বৈষম্য মূলক কাঠামোগত পরিবর্তন যেমন জরুরি তেমনি চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করে নিজেকে ভালোবেসে নারীকে সামনেও এগিয়ে যেতে হবে।
নিলুফার চৌধুরী মনি বলেন, বছরের পর বছর রাজনীতিতে সক্রিয় থাকার পরও নারীদের প্রথম সারির নাগরিক হিসেবে নিজেদের প্রতিষ্ঠা করতে লড়াই করতে হচ্ছে। ২০২৬ সালেও একজন নারীকে তার যোগ্যতা ও সিদ্ধান্ত নেয়ার সক্ষমতা প্রমাণ করতে হচ্ছে।
নারী সংস্কার কমিশন নির্বাচনে প্রতিটি দল থেকে ৫ শতাংশ নারী মনোনয়নের সুপারিশ করেছিল। কিন্তু তা মানা হয়নি। একজন এমপির স্ত্রী-মেয়ে যত তাড়াতাড়ি এমপি মনোনয়ন পান তৃণমূল থেকে উঠে আসা একজন সাধারণ নারী তত সহজে তা পান না। বর্তমান সরকারে তিনজন নারী মন্ত্রী/প্রতিমন্ত্রী দেয়া হয়েছে। এক্ষেত্রেও দেখা গেছে তাদের পেছনে রয়েছে বাবা বা স্বামী অর্থাৎ পোষ্যকোটা ।
বিরোধী দলের প্রতি ইঙ্গিত করে তিনি বলেন, যারা ধর্মের দোহাই দিয়ে রাজনীতি করে তারাতো নারীদের মনোনয়নই দেয়নি। তখন তারা বলেছিলো, নারীদের অভিজ্ঞতা নেই। তবে যেসব পুরুষদের মনোনয়ন দেয়া হয়েছে তাদেরও কিন্তু অভিজ্ঞতা ছিল না। রাজনীতিতে যতক্ষণ পর্যন্ত নারীর ক্ষমতায়ন হবে না ততদিন অর্থনীতি সহ অন্যান্য ক্ষেত্রে নারীর ক্ষমতায়ন সম্ভব নয়।
জলি তালুকদার বলেন, পরিবার-সমাজ এবং রাষ্ট্র কাঠামো, রাষ্ট্র থেকে শুরু করে সংসদ- প্রত্যেকটি ক্ষেত্রে পুরুষতান্ত্রিক কাঠামো বিরাজ করছে। সেখানে পুরুষতান্ত্রিকতা বিরাজ করছে। গার্মেন্টস থেকে শুরু করে বিভিন্ন কারখানায় নারী শ্রমিকের সংখ্যা বেশি হলেও ট্রেড ইউনিয়নে নারীর উপস্থিতি খুব একটা নেই। নারীরা নানা চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করে এগিয়ে চলছে।
বিথী ঘোষ বলেন, সাংস্কৃতিক অঙ্গনেও অনেক নারী। কিন্তু নির্দেশনা বা সিদ্ধান্ত নেয়ার ক্ষেত্রে দেখা যায় পুরুষই নিচ্ছেন। আমাদের সমাজের পুরুষতান্ত্রিক কাঠামোর মধ্যে নারীর কন্ঠকে চেপে ধরে রাখা হয়েছে। একজন নারী ও শিশুর জন্য যখন বাংলাদেশ নিরাপদ ও সুন্দর হবে কেবল তখনই বাংলাদেশ নিরাপদ ও সুন্দর হবে।
তাপসী দে বলেন, পুরুষতান্ত্রিক এই সমাজে নারীর সঙ্গে সব সময় দ্বিতীয় শ্রেণীর নাগরিক হিসেবে আচরণ করা হয়। পরিবার, দলীয় বা রাষ্ট্রীয় ক্ষেত্রে সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে নারীর উপস্থিতি অনেক কম।
আন্তঃবিভাগীয় অভিজ্ঞতা বিনিময় পর্বে তরুণ নারীদের জনজীবনে নেত্রী হিসেবে যাত্রার বিস্তারিত তথ্য তুলে ধরেন তরুণ নারী নেত্রীরা। নারী পক্ষের সদস্য সামিয়া আফরিনের সঞ্চালনায় অভিজ্ঞতা বিনিময় পর্বের পর প্রতিফলন পর্বে আলোচনায় অংশ নেন বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের সাংগঠনিক সম্পাদক উম্মে সালমা, লেখক ও মানবাধিকার কর্মী ইলোরা দেওয়ান, ইউএন ওম্যান বাংলাদেশের কর্মসূচি ব্যবস্থাপক তপতী সাহা।
উম্মে সালমা বলেন, নারীর সামনে অনেক বাধা যেমন আছে তেমনি সেই বাধা ডিঙানোর ক্ষমতাও নারীর আছে। সিডও সনদের যে দুইটি ধারায় সরকার এখনো পর্যন্ত আপত্তি রেখে দিয়েছে সেই সংরক্ষণ প্রত্যাহারের আমরা দাবি জানিয়ে আসছি। কিন্তু সরকারের সঙ্গে আমরা এ বিষয়ে পেরে উঠছি না। তবে আমাদের আন্দোলন অব্যাহত থাকবে।
তপতী সাহা বলেন, সব নারীবাদী আন্দোলন হলো, সমন্বিত রূপ। নারীবাদী আন্দোলন 'আমি' থেকে 'আমরা' হয়ে উঠতে শেখায়। ঘৃণা থেকে ভালো কিছু সৃষ্টি হয় না। সমাজে পুরুষদের যে বিষাক্ত আচরণ আছে, তা যেন আমরা আত্মস্থ না করি। নারী আন্দোলন কখনোই পুরুষের বিরুদ্ধে নয় পুরুষতান্ত্রিকতার বিরুদ্ধে।
শুক্রবার সকালে মূল অধিবেশন শুরু হয় 'তরুণ নারী নেতৃত্ব বিকাশে রাজনীতি' শীর্ষক আলোচনা দিয়ে। এছাড়া তরুণ নারীর জোরালো কন্ঠশ্বর তৈরি শীর্ষক পর্বে ঢাকার রাজশাহী ও চট্টগ্রাম বিভাগ থেকে সম্মেলনে অংশ নেয়া তরুণ নারী নেত্রীরা তাদের মতামত তুলে ধরেন। এছাড়াও দলীয় কাজ, সম্মিলিত প্রতিশ্রুতি ও কর্মপরিকল্পনা দলীয় উপস্থাপনাসহ বেশ কয়েকটি পর্ব অনুষ্ঠিত হয়। আর সমাপনী পর্বে ধন্যবাদ জ্ঞাপনের মধ্য দিয়ে শেষ হয় দুই দিনব্যাপী এই তরুণ নারী সম্মেলন।
প্রসঙ্গত, নারীর প্রতি বৈষম্য অবিচার ও সহিংসতার বিরুদ্ধে এবং নারীর মানবাধিকার প্রতিষ্ঠার পক্ষে সামাজিক শক্তি গড়ে তোলার লক্ষ্যে একটি সদস্যভিত্তিক নারী সংগঠন হিসেবে ১৯৮৩ সালের নারীপক্ষ প্রতিষ্ঠিত হয়। নারীপক্ষ ২০২৫ সালের নভেম্বর মাস থেকে ইউএন উইমেনের সহযোগিতায় জনজীবনে নারীর নেতৃত্ব বিকাশ প্রকল্প বাংলাদেশের তিনটি বিভাগ ঢাকা রাজশাহী এবং চট্টগ্রামের বাস্তবায়ন করে আসছে। এ প্রকল্পের লক্ষ্য হল নারীবান্ধব রাজনৈতিক নেতৃত্ব গড়ে তোলার জন্য নারীদের ও কিশোরীদের একটি সক্ষম দল তৈরি করা। যাতে তারা দক্ষ নেতৃত্বের মাধ্যমে ন্যায্য ও অন্তর্ভুক্তিমূলক রাজনৈতিক রূপান্তর অর্থনৈতিক ক্ষমতায়ন এবং জনজীবনে অংশগ্রহণের সুযোগ সৃষ্টি করতে পারে। বিশেষ করে প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর নারীদের সক্রিয় অংশগ্রহণ নিশ্চিত করাই এর অন্যতম উদ্দেশ্য। এই উদ্যোগটি নরওয়ে সরকারের অর্থায়নে ইউএন উইমেনের- উইমেন লিড নারীর রাজনৈতিক অংশগ্রহণ ও নেতৃত্ব শক্তিশালীকরণ প্রকল্পের মাধ্যমে বাস্তবায়িত।
