‘নিপীড়িত’ ইরানই এখন ইতিহাসের দোরগোড়ায়
স্পোর্টস ডেস্ক
প্রকাশ: ২২ জুন ২০২৬, ০২:৪২ পিএম
ছবি: সংগৃহীত
বিশ্বকাপে ইরানের গল্পটা শুধু ফুটবল নয়। এটি ভ্রমণ বিধিনিষেধ, রাজনৈতিক টানাপোড়েন, মানসিক চাপ, বিভক্ত সমর্থক আর মাঠে অবিশ্বাস্য জেদের গল্প। যে দল নিজেদের কঠিন পরিস্থিতির কথা বারবার বলেছে, সেই ইরানই এখন ইতিহাসের দরজায় দাঁড়িয়ে।
লস অ্যাঞ্জেলেসের সোফাই স্টেডিয়ামে বেলজিয়ামের সঙ্গে ০-০ ড্র করে গ্রুপ ‘জি’-তে টিকে থাকার আশা জোরালো করেছে ইরান। দুই ম্যাচে দুই ড্র, নিউজিল্যান্ডের সঙ্গে ২-২, বেলজিয়ামের সঙ্গে ০-০। পয়েন্ট ২। কিন্তু সংখ্যার বাইরে এই ফলের মূল্য আরও বড়। কারণ ইরান এর আগে কখনো বিশ্বকাপের নকআউট পর্বে উঠতে পারেনি। এবার শেষ ম্যাচে মিসরকে হারাতে পারলেই সেই ইতিহাস বদলে যাবে।
এই পথটা তাদের জন্য স্বাভাবিক ছিল না। যুক্তরাষ্ট্রে থাকার বিধিনিষেধের কারণে ইরান দল বেস করেছে মেক্সিকোর তিহুয়ানায়। ম্যাচ খেলতে সীমিত সময়ের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রে ঢোকা, খেলা শেষে আবার তিহুয়ানায় ফেরা, এই ক্লান্তিকর রুটিনই তাদের বিশ্বকাপ বাস্তবতা। অন্য দল যখন স্থায়ী বেসে প্রস্তুতি নিচ্ছে, ইরানের প্রস্তুতি বারবার ভেঙেছে ভ্রমণ ও অনুমতির জটিলতায়।
কোচ আমির গালেনোই আগেই ক্ষোভ জানিয়ে বলেছিলেন, তার দল এমন চ্যালেঞ্জের মুখে পড়ছে, যা অন্য কোনো দলকে সহ্য করতে হচ্ছে না। বেলজিয়াম ম্যাচের আগেও অনিশ্চয়তা ছিল তারা কখন লস অ্যাঞ্জেলেসে যেতে পারবে। ইরানের চাওয়া ছিল আরও আগে পৌঁছে পূর্ণ প্রস্তুতি নেওয়া। শেষ পর্যন্ত তারা ম্যাচের আগের দিন ভ্রমণ করে, আর কোচের দাবি, পূর্ণ অনুশীলনের সুযোগও ঠিকমতো পায়নি।
প্রথম ম্যাচের পর এসব অভিযোগ অনেকের কাছে অজুহাতের মতো শোনাতে পারত। নিউজিল্যান্ডের সঙ্গে ২-২ ড্রয়ের পর মনে হচ্ছিল ইরানের বিশ্বকাপ হয়তো চাপের নিচে ভেঙে পড়বে। কিন্তু বেলজিয়ামের বিপক্ষে তারা ভিন্ন উত্তর দিল। অভিযোগের বদলে মাঠে দিল লড়াইয়ের ভাষা।
আলিরেজা জাহানবখশ ম্যাচের পর বলেছিলেন, কঠিন পরিস্থিতিতে ইরানিরা আরও ভালো পারফর্ম করে। বেলজিয়ামের বিপক্ষে সেটিই দেখা গেল। কেভিন ডি ব্রুইনা, লিয়ান্দ্রো ট্রসার্ড, রোমেলু লুকাকুদের সামনে ইরান ভেঙে পড়েনি। বরং বেলজিয়ামকে অস্বস্তিতে রেখেছে। সেট পিস থেকে গোলও করেছিল, যা ভিএআর দেখে অফসাইডে বাতিল হয়।
ইরানের সবচেয়ে বড় নায়ক ছিলেন আলিরেজা বেইরানভান্দ। দ্বিতীয়ার্ধে ম্যাক্সিম দে কুইপারের শট ঠেকিয়ে তিনি যে সেভটি করেন, সেটি এই বিশ্বকাপের অন্যতম আলোচিত মুহূর্ত হয়ে থাকবে। ডি ব্রুইনার পাসের পর দে কুইপার প্রায় খালি গোলে শট নেওয়ার অবস্থায় ছিলেন। বেইরানভান্দ তখন প্রায় মাটিতে পড়ে। তবু হাত বাড়িয়ে বল ঠেকিয়ে দেন তিনি। সেই সেভ শুধু ম্যাচ বাঁচায়নি, ইরানের ইতিহাসের স্বপ্নও বাঁচিয়ে রেখেছে।
বেলজিয়ামের নাথান এনগয় লাল কার্ড দেখার পর ইরানের সামনে জয়ের সুযোগও ছিল। তারেমিকে শেষ ডিফেন্ডার হিসেবে ফেলে দেওয়ায় এনগয়কে মাঠ ছাড়তে হয়। শেষ ভাগে ইরান চাইলে আরও ঝুঁকি নিতে পারত। কিছু খেলোয়াড়ের মধ্যে জিততে না পারার আক্ষেপও ছিল। কিন্তু বাস্তবতা হলো, বেলজিয়ামের মতো দলের বিপক্ষে এই এক পয়েন্টও ইরানের জন্য বড় অর্জন।
মাঠের বাইরে পরিস্থিতি আরও জটিল। ইরানের সমর্থকভিত্তিও একরকম নয়। দেশের রাজনৈতিক বাস্তবতা, প্রবাসী ইরানিদের ভিন্ন মত, জাতীয় দল নিয়ে বিতর্ক, সবকিছুই দলকে ঘিরে আছে। লস অ্যাঞ্জেলেসে ইরানের ম্যাচ ঘিরে প্রতিবাদও হয়েছে। কেউ কেউ জাতীয় দলের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছেন, আবার বড় অংশের সমর্থক মাঠে দাঁড়িয়ে টিম মেল্লিকে সমর্থনও করেছেন।
ইরান খেলোয়াড়দের বার্তা পরিষ্কার, তারা সব ইরানির জন্য খেলছে। দেশে থাকা, দেশের বাইরে থাকা, ভিন্ন মত, ভিন্ন রাজনৈতিক অবস্থান, সবাইকে এক করার চেষ্টা করছে মাঠের পারফরম্যান্স দিয়ে। জাহানবখশদের কাছে এটাই সবচেয়ে বড় দায়িত্ব। ভালো খেললে, লড়লে, দেশকে গর্বিত করতে পারলে অন্তত ৯০ মিনিটের জন্য মানুষ এক জায়গায় দাঁড়াতে পারে।
লস অ্যাঞ্জেলেস ছাড়ার আগে ইরান দল ড্রেসিংরুমে একটি হাতে লেখা বার্তাও রেখে গেছে। সেখানে তারা লস অ্যাঞ্জেলেসকে আতিথেয়তার জন্য ধন্যবাদ জানিয়েছে। লিখেছে, তারা এসেছে গর্ব নিয়ে, প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছে সম্মান নিয়ে এবং ফিরছে মর্যাদা নিয়ে। সেই বার্তায় ছিল শান্তি, সম্মান ও বন্ধুত্বের আহ্বান।
তিহুয়ানার মানুষকেও ধন্যবাদ জানিয়েছেন ইরান খেলোয়াড়রা। মেক্সিকোর এই শহরই এখন তাদের অস্থায়ী ঘর। স্থানীয় সমর্থন ও উষ্ণতা খেলোয়াড়দের ক্লান্তির মধ্যেও শক্তি দিচ্ছে। ভ্রমণ-জটিলতায় আটকে থাকা দলটি অন্তত মানুষের ভালোবাসায় একটি আশ্রয় পেয়েছে।
এখন সামনে মিসর। গ্রুপ ‘জি’-এর শেষ ম্যাচটি ইরানের জন্য ইতিহাসের ম্যাচ। মিসর নিউজিল্যান্ডকে ৩-১ গোলে হারিয়ে ৪ পয়েন্টে উঠে গেছে। ইরানের পয়েন্ট ২, বেলজিয়ামেরও ২, নিউজিল্যান্ডের ১। তাই মিসরকে হারাতে পারলে ইরান ৫ পয়েন্টে উঠে যাবে এবং প্রথমবারের মতো বিশ্বকাপের নকআউটে জায়গা করে নেবে। ড্র করলে হিসাব ঝুলে যাবে, তখন বেলজিয়াম-নিউজিল্যান্ড ম্যাচ ও সেরা তৃতীয় দলের সমীকরণের দিকে তাকাতে হবে।
ইরান এর আগে বহুবার খুব কাছে গিয়েও বিশ্বকাপের গ্রুপ পর্ব পেরোতে পারেনি। এবারও পরিস্থিতি কঠিন। কিন্তু এই দল যেন কঠিন পরিস্থিতিতেই নিজের চরিত্র খুঁজে পায়। তিহুয়ানা থেকে লস অ্যাঞ্জেলেস, অভিযোগ থেকে জেদ, ভ্রমণ-ক্লান্তি থেকে বেলজিয়ামকে আটকে দেওয়া, সব মিলিয়ে ইরানের বিশ্বকাপ এখন এক বিরল গল্প।
যে দল চাপের ভেতর থেকেও ভাঙেনি, তারা এখন করুণা নয়, সম্মান আদায় করছে। মাঠে তারা প্রমাণ করেছে, অস্বাভাবিক পরিস্থিতি তাদের থামাতে পারেনি। বরং আরও এক করেছে। আর সেই ঐক্য নিয়েই তারা যাচ্ছে মিসর ম্যাচে, নিজেদের বিশ্বকাপ ইতিহাসের সবচেয়ে বড় দরজার সামনে দাঁড়িয়ে।
