কাজ শুরু করছে সরকার
সংখ্যালঘুদের প্রতি অভয়বার্তা
কাগজ প্রতিবেদক
প্রকাশ: ১৪ আগস্ট ২০২৪, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
ছবি : ভোরের কাগজ
বাংলাদেশে সংখ্যালঘুদের ওপর যাতে হামলা না হয় তা নিয়ে আগেই কড়া বার্তা দিয়েছিলেন অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূস। এবার তিনি নিজেই গেলেন ঢাকেশ্বরী মন্দিরে। শুধু গেলেনই না, সংখ্যালঘু নেতাদের সঙ্গে প্রথম ঢাকেশ্বরী মন্দিরে ও পরে তার কার্যালয় ‘যমুনা’য় বৈঠকও করলেন প্রধান উপদেষ্টা। প্রসঙ্গত, গত ৫ আগস্ট সরকার বদল হওয়ার পর সংখ্যালঘুদের ওপর যে আক্রমণ নেমে এসেছিল তার প্রতিবাদে গত কয়েকদিন ধরে বিক্ষোভ করছিলেন তারা। এ অবস্থায় গতকাল প্রধান উপদেষ্টার ঢাকেশ্বরী মন্দির পরিদর্শন ও তার বাসভবনে বৈঠকের ফলে সংখ্যালঘুদের মন থেকে ভয় দূর হওয়ার ক্ষেত্র তৈরি হচ্ছে। পাশাপাশি অন্তর্বর্তী সরকারের এমন কাজে একটা সম্প্রীতির বার্তা যাবে বলেও মনে করা হচ্ছে।
সংশ্লিষ্টরা বলেছেন, রাজধানীর ঢাকেশ্বরী মন্দির গোটা পৃথিবীর কাছেই অত্যন্ত পরিচিত নাম। হঠাৎ করে গতকাল মঙ্গলবার সেই প্রাচীন মন্দিরে যান অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস। সেখানে ঘণ্টাখানেক সংখ্যালঘু নেতাদের কথা শুনেন তিনি। এরপর প্রায় ৪ মিনিটের একটি বক্তৃতা রাখেন। এ সময় প্রধান উপদেষ্টার সঙ্গে আইন, বিচার ও সংসদবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা ড. আসিফ নজরুল ও ধর্মবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা ড. আ. ফ. ম. খালিদ হোসেন ও প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী আলী ইমাম মজুমদার এবং আইজিপি মো. ময়নুল ইসলাম উপস্থিত ছিলেন। প্রসঙ্গত, এই স্থানটিকে হিন্দুদের অন্যতম শাক্তপীঠ বলে উল্লেখ করা হয়। এরপর বিকাল সাড়ে ৩টা থেকে সাড়ে ৪টা পর্যন্ত ‘যমুনা’য় প্রধান উপদেষ্টা সংখ্যালঘু নেতাদের সঙ্গে বৈঠক করেন। বৈঠকে বিভিন্ন সংগঠনের ৪০ জন প্রতিনিধি উপস্থিত ছিলেন। তারা প্রধান উপদেষ্টার কাছে ৮ দফা দাবি তুলে ধরেন। পাশাপাশি সাম্প্রতিক ঘটনাসহ গত ৫৩ বছরে সনাতন
ধর্মাবলম্বীদের ওপর অত্যাচার নির্যাতন ও বৈষম্যের বিচারে একটি কমিশন গঠনের দাবি জানান। সব শুনে প্রধান উপদেষ্টা সংখ্যালঘু নেতাদের আশ্বস্ত করে বলেন, আইনের দৃষ্টিতে সবাই সমান, বিভেদ সৃষ্টি করার কোনো সুযোগ নেই। গণতান্ত্রিক অধিকার ও মানবাধিকার প্রতিষ্ঠাই তার সরকারের মূল লক্ষ্য।
বৈঠক শেষে হিন্দু-বৌদ্ধ-খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদের সাধারণ সম্পাদক রানা দাশগুপ্ত বলেন, ৫ আগস্টের পর সাম্প্রদায়িক সহিংসতা চলেছে, যা এখনো পর্যন্ত বিভিন্ন জেলায় অব্যাহত আছে। এমন পরিস্থিতিতে প্রধান উপদেষ্টার সঙ্গে আজকের বৈঠক। বৈঠকে প্রধান উপদেষ্টা আশ্বাস দিয়েছেন, তবে প্রতিশ্রুতিগুলো বাস্তবায়নে তারা মাঠে থাকবেন বলে জানিয়েছেন রানা দাশগুপ্ত। তিনি বলেন, প্রতিশ্রুতিগুলো বাস্তবায়নে আমরা মাঠে থাকব। নানা সময়ে নানা প্রতিশ্রুতি দেয়া হয়েছে, কিন্তু তা পূরণ হয় না। তার পুনরাবৃত্তি যেন না হয়, সে জন্য মাঠে থাকব। রানা দাশগুপ্ত আরো বলেন, আমরা শারদীয় দুর্গাপূজা উপলক্ষে তিন দিনের সরকারি ছুটি দাবি করেছি। বৌদ্ধ সম্প্রদায়ের প্রবারণা পূর্ণিমা উপলক্ষে এক দিন সরকারি ছুটি দাবি করেছি। খ্রিস্টান সম্প্রদায়ের ইস্টার সানডে উপলক্ষে আমরা এক দিনের ছুটি দাবি করেছি।
বাংলাদেশ হিন্দু-বৌদ্ধ-খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদের প্রেসিডিয়াম সদস্য অ্যাডভোকেট সুব্র?ত চৌধুরী বলেন, অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান আমাদের আশ্বস্ত করেছেন, ওই সময়ে তো কোনো সরকার ছিল না, সেটাকে নিবৃত করার মতো কোনো ম্যাকানিজম ছিল না। তারা শান্তিশৃঙ্খলা ফেরানোর জন্য চেষ্টা করছেন। বাংলাদেশের মাটিতে সাম্প্রদায়িক সহিংসতা দেখতে চান না। অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশ তিনি রাখতে চান এবং দেখতে চান। তিনি আমাদের আশ্বস্ত করেছেন, যত ক্ষোভ আছে তা দূর করব এবং পাশে থাকব।
ইসকনের সাধারণ সম্পাদক চারুচন্দ্র দাস ব্রহ্মচারী বলেন, আমরা আশাবাদী। তিনি আশ্বাস দিয়েছেন। আমরা তার কথা বিশ্বাস করি। তিনি (ড. মুহাম্মদ ইউনূস) বলেছেন শুরু করে দেব ভালো কিছু করার জন্য। বাংলাদেশের সংখ্যালঘুরা সুখে শান্তিতে থাকবেন এই আশ্বাসও দিয়েছেন। আপাতত কোনো কর্মসূচি নেই বলে জানিয়ে তিনি বলেন, প্রধান উপদেষ্টার আশ্বাস যদি পূরণ না হয় তাহলে আমরা বিবেচনা করে দেখব পরবর্তীতে। বাংলাদেশ পূজা উদ?যাপন পরিষদের সাধারণ সম্পাদক সন্তোষ শর্মা বলেন, ড. মুহাম্মদ ইউনূস বলেছেন, তিনি এমন একটা রাষ্ট্র করতে চান যেখানে আর কোনো দিন মন্দির পাহারা দিতে হবে না। আমরা আশান্বিত আমাদের দাবি-দাওয়া যাতে বাস্তবায়িত হয়। আমরা আরেকটা কথা বলেছি- বিচারহীনতার সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। বিচার হয় না। তিনি আমাদের সঙ্গে একমত পোষণ করেছেন। সংখ্যালঘু অধিকার আন্দোলনের অন্যতম সমন্বয়ক ও শিক্ষার্থী প্রতিনিধি অর্থী দে বলেন, আমাদের সব দাবি বাস্তবায়নের জন্য আশ্বস্ত করেছেন। আমরা তাদের এই সময়টুকু দেব। আমরা খুব দ্রুত সুষ্ঠু সমাধানের জন্য পরবর্তী সময়ে কর্মসূচি বিচার-বিবেচনা করে দেব। তারাও আমাদের বলেছেন, আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে সুষ্ঠু সমাধানে আসবেন।
এর আগে গতকাল মঙ্গলবার সকালে ঢাকেশ্বরী মন্দির পরিদর্শনে গিয়ে প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূস বলেন, অধিকার সবার সমান। এ দেশের মানুষ হিসেবে অধিকার আদায়ে বিভক্ত হয়ে নয়, আমরা এক মানুষ, এক অধিকার; এর মধ্যে কোনো পার্থক্য করবেন না। আমাদের একটু সাহায্য করুন। ধৈর্য ধরেন, কিছু করতে পারলাম কী পারলাম না, সেটা পরে বিচার করবেন। যদি না পারি আমাদের দোষ দেবেন। প্রধান উপদেষ্টা বলেন, আমাদের গণতান্ত্রিক যে আকাক্সক্ষা, সেখানে আমরা মুসলমান, হিন্দু কিংবা বৌদ্ধ হিসেবে নই, মানুষ হিসেবে বিবেচিত। আমাদের সবার অধিকারগুলো নিশ্চিত হোক। সব সমস্যার গোড়া হলো, আমরা যত প্রাতিষ্ঠানিক আয়োজনগুলো করেছি; সব কিছু কিন্তু পচে গেছে। এই কারণেই গোলমাল হচ্ছে। কাজেই আমাদের প্রাতিষ্ঠানিক আয়োজনগুলো ঠিক করতে হবে। হঠাৎ এই পরিস্থিতিতে মন্দির পরিদর্শনে আসার কারণ হিসেবে প্রধান উপদেষ্টা বলেন, একটা বড় রকমের বিভেদের আওয়াজ শুনছি। বিমানবন্দরে নেমেই যেটা বলেছিলাম, এমন বাংলাদেশ আমরা করতে চাচ্ছি; যেখানে আমরা এক পরিবার। এটা হলো মূল জিনিস। পরিবারের মধ্যে কোনো পার্থক্য করা, বিভেদ করা, এটার কোনো প্রশ্নই আসে না। প্রধান উপদেষ্টা সনাতন ধর্মাবলম্বীদের প্রতি প্রশ্ন রেখে বলেন, ন্যায় বিচার হলে কে বিচার পাবে না এটা আমাকে বলেন? এটা কি দেখার সুযোগ আছে? কে কোন ধর্মের, কোন জাতের, কোন সম্প্রদায়ের। এটা কি আইনে বলা আছে- এই ধর্মের, এই সম্প্রদায়গুলো এই আদালতে যাবে, ওই সম্প্রদায়গুলো অন্য আদালতে যাবে? আইন একটা, কার সাধ্য আছে এখানে বিভেদ করে? এ সময় তিনি সনাতনীদের কাছে বলেন, আপনারা বলবেন- আমরা মানুষ, আমরা বাংলাদেশের মানুষ। আমার সাংবিধানিক অধিকার এই, এটা আমাকে দিতে হবে। সব সরকারের কাছে এটাই চাইবেন আর কিছুই চাইবেন না। আমরা এসেছি, আমরা এক মানুষ, এক অধিকার, এর মধ্যে কোনো পার্থক্য করা যাবে না। আমাদের একটু সাহায্য করুন আপনারা, ধৈর্য ধরেন। কি করতে পারলাম কি পারলাম না, সেটা পরে বিবেচনা করবেন। আমার অনুরোধ, আপনারা বিভিন্ন খোপে চলে যাবেন না। সবাইকে এক থাকতে হবে।
এর আগে প্রধান উপদেষ্টা ঢাকেশ্বরী মন্দিরে পৌঁছালে বাংলাদেশ পূজা উদযাপন পরিষদের সভাপতি বাসুদেব ধর, সাধারণ সম্পাদক সন্তোষ শর্মা, মহানগর পূজা উদযাপন পরিষদের সভাপতি জয়ন্ত কুমার দেব ও সাধারণ সম্পাদক তাপস কুমার পাল স্বাগত জানান। এরপর সেখানে সংক্ষিপ্ত সভা হয়। সভায় মহানগর পূজা উদযাপন পরিষদের সভাপতি জয়ন্ত কুমার দেব বলেন, প্রধান উপদেষ্টা আসলেন, আমাদের ঢাকেশ্বরী মন্দির দেখলেন। ৮শ বছরের পুরনো এই মন্দির। অনেক ঘটনা এই মন্দিরে। তিনি বলেন, সময় যায়, বদলায় কিন্তু আমাদের মন্দির ভাঙা শেষ হয় না। সময় যায়, বদলায়, আমাদের মন্দিরে আগুন নিভে না। সময় যায় বদলায়, মা বোনের ওপর অত্যাচার কমে না। সময় যায় বদলায়, আমাদের ব্যবসা বাণিজ্য ধ্বংস বন্ধ হয় না। এই বাংলাদেশতো আমরা চাই না। আমরা চাই, বাংলাদেশ হবে হিন্দু-মুসলিম-বৌদ্ধ-খ্রিস্টানের, সবার। এই বাংলাদেশে যেমন আজানের ধ্বনি হবে, তেমনি শঙ্খেরও ধ্বনি হবে। আমরা বিশ্বাস করি, এই বাংলাদেশে রোজার পাশাপাশি পূজাও হয়। সুতরাং অসাম্প্রদায়িক চেতনায়, মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় এই বাংলাদেশ এগিয়ে যাক।
পূজা উদযাপন পরিষদের সাধারণ সম্পাদক সন্তোষ শর্মা বলেন, আপনি যেদিন বিমানবন্দরে আসলেন সেদিনই আমাদের কথা বলেছেন। তাতে আমরা আশ্বস্ত হয়েছি, সাহস পেয়েছি। আর শপথ নেয়ার স্বল্পতম সময়ের মধ্যে আপনি আমাদের কথা অনুভব করে এখানে, ঢাকেশ্বরী মন্দিরে উপস্থিত হয়েছেন। আমরা আস্থা পেয়েছি, সাহস পেয়েছি। তিনি বলেন, গত ৫৩ বছর ধরে আমাদের ওপর যত ঘটনা হয়েছে সেসব ঘটনার একটিরও বিচার হয়নি। এই বিচারহীনতা দূর হবে। সম্প্রতি যা ঘটেছে এগুলোসহ অতীতের ঘটনার বিচারের জন্য একটি কমিশন হবে, দ্রুত বিচার ট্রাইবুন্যাল হবে। দুবৃর্ত্তরা বিচারের আওতায় আসবে। বাংলাদেশ পূজা উদযাপন পরিষদের সভাপতি বাসুদেব ধর বলেন, বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনের মধ্য দিয়ে এক নতুন যুগের সূচনা হয়েছে। কিন্তু সমাজে বৈষম্য একটা বিরাট ক্যানভাস। এটিকে দূর করতে হবে। আমরা এত অত্যাচারিত, আমরা আর সইতে পারছি না। আপনি আপনার এই সময়ে আপনি বৈষম্যহীন সমাজ, জ্ঞানভিত্তিক সমাজ প্রতিষ্ঠার কাজটি শুরু করে যাবেন। পরবর্তীকালে আমাদের রাজনীতিকরা যাতে তাদের থেকে বিচ্যুতি হতে না না পারে এমন কাজটি করে যাবেন।
