লিভার ফেইলিউর: লক্ষণ, কারণ ও চিকিৎসা
কাগজ ডেস্ক
প্রকাশ: ১৭ মে ২০২৬, ০২:৩৭ পিএম
ছবি : সংগৃহীত
হঠাৎ করে লিভারের কার্যক্ষমতা মারাত্মকভাবে নষ্ট হয়ে যাওয়াকে অ্যাকিউট লিভার ফেইলিউর (এএলএফ) বা তীব্র লিভার বিকলতা বলা হয়। চিকিৎসকদের মতে, এটি একটি প্রাণঘাতী অবস্থা এবং গুরুতর রোগীদের ক্ষেত্রে অনেক সময় লিভার প্রতিস্থাপনই একমাত্র জীবনরক্ষাকারী চিকিৎসা হয়ে ওঠে। বিশ্বজুড়ে লিভার প্রতিস্থাপন পদ্ধতি চালুর পর এ রোগে আক্রান্তদের বেঁচে থাকার হার ২০ শতাংশের কম থেকে বেড়ে প্রায় ৮০ শতাংশে পৌঁছেছে।
বিশেষজ্ঞদের তথ্য অনুযায়ী, দীর্ঘমেয়াদি লিভার রোগের তুলনায় তীব্র লিভার বিকলতা তুলনামূলকভাবে বিরল হলেও এটি খুব দ্রুত জটিল অবস্থায় পৌঁছায়। এ রোগের অন্যতম প্রধান কারণ ভাইরাল সংক্রমণ, বিশেষ করে হেপাটাইটিস এ, বি ও ই ভাইরাস। লিভার ফেইলিউর মূলত দুটি কারণে হয়ে থাকে—দীর্ঘমেয়াদী এবং তীব্র। সাধারণ কারণগুলোর মধ্যে রয়েছে-
ভাইরাল হেপাটাইটিস: হেপাটাইটিস 'বি' এবং 'সি' ভাইরাস দীর্ঘদিন শরীরে থেকে লিভারের কোষ নষ্ট করে দেয়। হেপাটাইটিস 'এ' ও 'ই' থেকেও তীব্র লিভার ফেইলিউর হতে পারে।
অ্যালকোহল ও ধূমপান: অতিরিক্ত মদ্যপান লিভারের কোষকে স্থায়ীভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করে এবং লিভার সিরোসিসের সৃষ্টি করে।
ফ্যাটি লিভার: লিভারে অতিরিক্ত চর্বি জমলে তা ধীরে ধীরে লিভারের মারাত্মক ক্ষতি ঘটাতে পারে।
ওষুধের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া: চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া অতিরিক্ত প্যারাসিটামল বা ব্যথানাশক ওষুধ খাওয়ার ফলে লিভারের তীব্র ক্ষতি হতে পারে।
অটোইমিউন রোগ: শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতাই যখন নিজের লিভারের কোষগুলোকে ভুলবশত আক্রমণ করে (অটোইমিউন হেপাটাইটিস)।
বিষাক্ত পদার্থ: বিষাক্ত মাশরুম বা ক্ষতিকারক রাসায়নিকের সংস্পর্শে এলে লিভার ফেইলিউর হতে পারে।
লিভার ব্যর্থতার লক্ষণগুলো যেভাবে প্রকাশ পায়-
প্রাথমিক লক্ষণ
বমি বমি ভাব: লিভারের কার্যক্ষমতা কমে গেলে খাবার হজমে সমস্যা হয়। এর ফলে রোগীর প্রায়ই বমি বমি ভাব বা অস্বস্তি অনুভূত হতে পারে।
ক্ষুধামন্দা: লিভার ঠিকভাবে কাজ না করলে খাবারের প্রতি আগ্রহ কমে যায়। অনেক রোগী দীর্ঘ সময় না খেয়েও ক্ষুধা অনুভব করেন না।
অতিরিক্ত অবসাদ: শরীরে শক্তির ঘাটতি তৈরি হওয়ায় রোগী সবসময় ক্লান্ত ও দুর্বল অনুভব করতে পারেন। স্বাভাবিক কাজেও সহজেই হাঁপিয়ে ওঠার প্রবণতা দেখা যায়।
ডায়রিয়া: লিভারের সমস্যার কারণে হজম প্রক্রিয়ায় ব্যাঘাত ঘটতে পারে, ফলে পাতলা পায়খানা বা ডায়রিয়ার মতো সমস্যা দেখা দেয়।
গুরুতর লক্ষণ
জন্ডিস: লিভার সঠিকভাবে বর্জ্য পদার্থ অপসারণ করতে না পারলে ত্বক ও চোখের সাদা অংশ হলুদ হয়ে যায়। এটি লিভার ব্যর্থতার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ লক্ষণ।
সহজে রক্তপাত হওয়া: লিভার রক্ত জমাট বাঁধার জন্য প্রয়োজনীয় উপাদান তৈরি করে। লিভার ক্ষতিগ্রস্ত হলে শরীরে সামান্য আঘাতেও রক্তপাত হতে পারে এবং তা বন্ধ হতে সময় লাগে।
পেট ফুলে যাওয়া: লিভারের জটিলতার কারণে পেটে পানি জমতে পারে, যাকে অ্যাসাইটিস বলা হয়। এতে পেট অস্বাভাবিকভাবে ফুলে যায় এবং অস্বস্তি তৈরি হয়।
মানসিক বিভ্রান্তি বা আচরণগত পরিবর্তন: লিভার শরীরের বিষাক্ত পদার্থ দূর করতে না পারলে সেগুলো মস্তিষ্কে প্রভাব ফেলে। এতে রোগী বিভ্রান্তি, ভুলে যাওয়া, অস্বাভাবিক আচরণ বা মনোযোগের ঘাটতিতে ভুগতে পারেন। এই অবস্থাকে হেপাটিক এনসেফালোপ্যাথি বলা হয়।
অতিরিক্ত ঘুমভাব: লিভার ব্যর্থতার কারণে রোগীরা প্রায়ই অতিরিক্ত ঘুমঘুম ভাব অনুভব করেন এবং স্বাভাবিকভাবে সচেতন থাকতে পারেন না।
কোমা: রোগের জটিলতা চরম পর্যায়ে পৌঁছালে রোগী অচেতন হয়ে কোমায় চলে যেতে পারেন। এটি জীবনহানির ঝুঁকি বাড়ায় এবং দ্রুত নিবিড় চিকিৎসার প্রয়োজন হয়।
সম্ভাব্য জটিলতা
- মস্তিষ্কে পানি জমে সেরিব্রাল এডিমা হতে পারে, যা প্রাণঘাতী হয়ে উঠতে পারে।
- রক্ত জমাট বাঁধার ক্ষমতা কমে গেলে শরীরের বিভিন্ন স্থানে রক্তক্ষরণ দেখা দেয়।
- শ্বাসনালী, মূত্রনালী ও রক্তে সংক্রমণের ঝুঁকি বেড়ে যায়।
- কিডনি বিকল হওয়ার আশঙ্কাও থাকে, বিশেষ করে অতিরিক্ত প্যারাসিটামল সেবনের ক্ষেত্রে।
- রোগীর অবস্থা গুরুতর হলে হৃদযন্ত্র ও অন্যান্য অঙ্গের কার্যকারিতাও ব্যাহত হতে পারে।
প্রতিরোধে যা করণীয়
- চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া ওষুধ সেবন না করার পরামর্শ দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা।
- অতিরিক্ত মদ্যপান এড়িয়ে চলা জরুরি।
- নিরাপদ যৌন সম্পর্ক বজায় রাখা এবং ব্যবহৃত সূঁচ এড়িয়ে চলতে হবে।
- হেপাটাইটিস এ ও বি টিকা গ্রহণ করলে সংক্রমণের ঝুঁকি কমে।
- দূষিত রক্ত বা শরীরের তরলের সংস্পর্শ থেকে সতর্ক থাকতে হবে।
- কীটনাশক বা ক্ষতিকর রাসায়নিক ব্যবহারের সময় গ্লাভস ও মাস্ক ব্যবহার করা উচিত।
- স্বাস্থ্যকর ওজন বজায় রাখাও লিভার সুস্থ রাখতে গুরুত্বপূর্ণ।
রোগ নির্ণয়ে যেসব পরীক্ষা করা হয়
- রক্ত পরীক্ষার মাধ্যমে লিভারের কার্যকারিতা ও রক্ত জমাট বাঁধার সক্ষমতা পরীক্ষা করা হয়।
- আল্ট্রাসাউন্ডের মাধ্যমে লিভারের ক্ষতি ও গঠন দেখা হয়।
- প্রয়োজনে সিটি স্ক্যান বা এমআরআই করে বিস্তারিত অবস্থা নির্ণয় করা হয়।
- লিভারের টিস্যু পরীক্ষা করতে লিভার বায়োপসি করা হতে পারে।
চিকিৎসা পদ্ধতি
- রোগীদের দ্রুত বিশেষায়িত হাসপাতালে ভর্তি করার পরামর্শ দিয়েছেন চিকিৎসকরা।
- প্যারাসিটামল বিষক্রিয়ার ক্ষেত্রে অ্যাসিটাইলসিস্টাইন নামের ওষুধ ব্যবহার করা হয়।
- সংক্রমণ বা বিষক্রিয়ার কারণ অনুযায়ী বিশেষ ওষুধ প্রয়োগ করা হয়।
- গুরুতর অবস্থায় লিভার প্রতিস্থাপনই সবচেয়ে কার্যকর সমাধান।
- নিবিড় পরিচর্যায় মস্তিষ্কে চাপ কমানো, সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণ ও রক্তক্ষরণ প্রতিরোধে ব্যবস্থা নেওয়া হয়।
- প্রয়োজন হলে কিডনি ও হৃদযন্ত্র সচল রাখতে উন্নত যন্ত্রপাতির সহায়তা নেওয়া হয়।
