কলকাতায় ফিরে নির্বাসন নিয়ে মুখ খুললেন তসলিমা
কাগজ ডেস্ক
প্রকাশ: ০১ আগস্ট ২০২৬, ১২:১৮ পিএম
ছবি: সংগৃহীত
প্রায় দুই দশক পর কলকাতায় ফিরে নির্বাসন, বাংলাদেশ, নারীবাদ এবং মতপ্রকাশের স্বাধীনতা নিয়ে খোলামেলা কথা বলেছেন লেখক তসলিমা নাসরিন। ভারতীয় সংবাদমাধ্যম এই সময়ে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি জানান, এই ফেরা কেবল একটি শহরে ফিরে আসা নয়, বরং দীর্ঘদিনের ভাষা, স্মৃতি ও আপন মানুষের কাছে ফিরে আসার এক গভীর আবেগের প্রকাশ।
তসলিমা বলেন, কলকাতায় ফেরার অনুভূতি তাঁর কাছে প্রায় দুই দশকের অনাহার কাটানোর মতো। বাংলা ভাষা, পরিচিত রাস্তাঘাট ও ফেলে আসা মানুষদের জন্য দীর্ঘদিনের আকুলতাই তাঁকে সবচেয়ে বেশি টেনেছে। তবে এই ফেরা হারিয়ে যাওয়া সময়কে আর ফিরিয়ে আনতে পারবে না বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
নিজের কাছে ‘ঘর’-এর সংজ্ঞা ব্যাখ্যা করতে গিয়ে তসলিমা বলেন, ঘর শুধু কোনো ঠিকানা বা পাসপোর্ট নয়। ঘর হলো সেই জায়গা, যেখানে ফিরতে কারও অনুমতি নিতে হয় না এবং যেখানে ভাষা, স্মৃতি ও মানুষের ভালোবাসা একজনকে আপন করে নেয়।
বাংলাদেশের বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে তিনি বলেন, শুধু নির্বাচন হলেই পূর্ণ গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হয় না। আইনের শাসন,ধর্মনিরপেক্ষতা, নারীর সমানাধিকার এবং মতপ্রকাশের স্বাধীনতা নিশ্চিত না হলে প্রকৃত গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা সম্ভব নয় বলে মন্তব্য করেন তিনি।
শেখ হাসিনার দেশত্যাগের প্রসঙ্গে তসলিমা বলেন, অন্য কাউকে দেশ ছাড়তে দেখলে তাঁর নিজের নির্বাসনের স্মৃতি ফিরে আসে। তবে নিজের নির্বাসন ও শেখ হাসিনার দেশত্যাগের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট এক নয় বলেও স্পষ্ট করেন তিনি।
বাংলাদেশে ফেরার ইচ্ছার কথা জানিয়ে লেখক বলেন, নিজের শৈশব, পরিবার ও অসংখ্য স্মৃতি বাংলাদেশে রয়ে গেছে। কিন্তু বাংলাদেশি পাসপোর্ট নবায়ন না হওয়া এবং বিদেশি পাসপোর্টে ভিসা না পাওয়ায় দেশে ফেরার বাস্তব সুযোগ নেই।
আরো পড়ুন: পরনে লাল-সাদা শাড়ি, ১৯ বছর পর কলকাতায় তসলিমা নাসরিন
কলকাতায় ফেরার সুযোগ করে দেওয়ায় পশ্চিমবঙ্গের নতুন সরকার ও মুখ্যমন্ত্রীর প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে তসলিমা বলেন, একজন নির্যাতিত লেখকের নিরাপত্তা ও মতপ্রকাশের অধিকারের প্রতি গুরুত্ব দেওয়াকে তিনি ইতিবাচক হিসেবে দেখছেন। একই সঙ্গে তিনি আশা প্রকাশ করেন, সরকার লেখক, শিল্পী, নারী, সংখ্যালঘু ও ভিন্নমতের মানুষের অধিকার রক্ষায় ভূমিকা রাখবে।
নারীবাদ নিয়ে সমালোচনার জবাবে তসলিমা বলেন, নারীর যৌনতা নিয়ে লেখা মানে অন্য সমস্যাকে আড়াল করা নয়। বরং তিনি শিক্ষা, অর্থনৈতিক স্বাধীনতা, ধর্মীয় বিধিনিষেধ, বাল্যবিবাহ, ধর্ষণ, পারিবারিক সহিংসতা ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতাসহ বিভিন্ন বিষয়েও দীর্ঘদিন ধরে লিখে আসছেন।
নব্বইয়ের দশক থেকে বর্তমান পর্যন্ত নারীবাদী চিন্তায় মৌলিক কোনো পরিবর্তন হয়নি বলেও জানান তিনি। তবে সময়ের অভিজ্ঞতা তাঁর দৃষ্টিভঙ্গিকে আরো পরিণত করেছে বলে মন্তব্য করেন।
২০২৪ সালের বাংলাদেশ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, সরকার পরিবর্তনের চেয়ে একটি গণতান্ত্রিক, ধর্মনিরপেক্ষ ও মানবিক রাষ্ট্রব্যবস্থা গড়ে তোলা অনেক বেশি কঠিন। বিদ্রোহ কোনো গন্তব্য নয়, বরং পরিবর্তনের শুরু হতে পারে।
আত্মজীবনীর নতুন খণ্ড প্রসঙ্গে তসলিমা বলেন, কলকাতায় প্রায় দুই দশক পর ফিরে আসার অভিজ্ঞতা তাঁর জীবনের গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। তবে এটি নতুন বইয়ের রূপ নেবে কি না, সে বিষয়ে এখনই সিদ্ধান্ত নেননি।
বাংলাদেশের ইলিশের প্রসঙ্গে আবেগঘন মন্তব্য করে তিনি বলেন, বিদেশে ইলিশ খেলে মুহূর্তেই দেশের কথা মনে পড়ে। কিন্তু সেই স্বাদের সঙ্গে নির্বাসনের বেদনাও ফিরে আসে।
