×

সাহিত্য

আমি আনন্দ ছাড়া আঁকতে পারি না

Icon

কাগজ প্রতিবেদক

প্রকাশ: ০৬ এপ্রিল ২০২০, ০৯:৩১ পিএম

আমি আনন্দ ছাড়া আঁকতে পারি না

শিল্পী মুর্তজা বশীর

বরেণ্যে শিল্পী মুর্তজা বশীর। আমাদের ভাষা আন্দোলনের অন্যতম সারথি। জীবনের নানা উত্থান-পতন আর বাংলাদেশের শিল্প ইতিহাসে তার নামটি চিরঅম্লান থাকবে। অবিরত চর্চা, সৃজনশীল গবেষণা, কবিতা চর্চা, উদ্ভাবন, অনুভূতির বিশ্লেষণ আর রাজনীতি সচেতন থেকে সমাজ-রাষ্ট্রের সম্পৃক্ততায় শিল্প ভাষার ক্ষেত্রে নিজস্বতা প্রকাশে যিনি অনেক বেশি উদগ্রীব ও প্রাণবন্ত। করোনাকালে বহুমাত্রিক এই শিল্পীর সময় কেমন কাটছে ভোরের কাগজের এমন এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বললেন, আমি আনন্দ ছাড়া আঁকতে পারি না, দুঃখ ছাড়া লিখতে পারি না। আমার হৃদয়ে যখন রক্তক্ষরণ হয় তখনই আমি লিখি। পৃথিবীজুড়ে এখন চলছে ভয়ংকর করোনাঘাত। এর কারণে কার্যতই বন্দিজীবন যাপন করছি। অবশ্য আমি তো ২৪ ঘণ্টা অক্সিজেন নিয়েই বেঁচে আছি। গত ডিসেম্বরে ২ বার হাসপাতালে যেকে হয়েছে ফুসফুসের সমস্যা নিয়ে। এরপর থেকে ডাক্তাররা আমার জীবন রেস্টিকটেড করে দিয়েছেন। সিঁড়ি বেয়ে উঠতে পারবো না। জোরে কথা বলতে পারবো না। ছবি আঁকতে পারবো, কিন্তু একঘণ্টা আঁকার পরে বিশ্রাম নিতে হবে। তারপরও আমি বসে নেই। এর মধ্যে প্রস্তুতি নিচ্ছিলাম। ১৩ মে আমার স্ত্রীর মৃত্যুবার্ষিকী এবং ৩০ মার্চ জন্মদিন। তো তার মৃত্যু দিবসে ট্রিবিউট টু তুলু’ শিরোনামে ছবি এঁকে শ্রদ্ধাঞ্জলি জানাবো। বিশেষকরে সে বেঁচে থাকাকালীন যে ধরণের ছবি এঁকেছি মূলত সে ধরনের ছবি এঁকেই শ্রদ্ধা আঁকবো।

তিনি বলেন, ১৯৫৪ সালে আমি বিয়ে করি। বিয়ের আগে আমার জীবন ছিল ছন্নছাড়া, আর বিয়ের পর অর্গানাইজ হয়ে গেছি পুরোপুরিই। এমনকি বিয়ের পরপরই জিওম্যাট্রিক ফর্মেই আঁকা শুরু করি। সব ওয়েল অর্গানাইজ। আর এসবের পেছনে তারই অনুপ্রেরণা ছিলো বেশ। আমি ছবি আঁকার পর আমার স্ত্রীকে দেখতাম, ভালো মন্দ কমেন্ট করতো। আমি আবার সেসব ছবি কারেকশান করার চেষ্টা করতাম। কিন্তু করোনার জন্য এসব কাজে ছন্দপতন হচ্ছে। তারপরও ক্যানভাস তৈরী করেছি, ধীরে ধীরে আঁকবো। তবে সত্যি বলতে কি এ মুহূর্তে নিজেকে মনে হচ্ছে ছোটবেলায় নারায়ণ গঙ্গ্যোপাধ্যায়ের শিলালিপি উপন্যাসের স্বদেশি আন্দোলনের একজন কর্মীর মতো!

তিনি বলেন, করোনার কারণে মৃত্যুভয় তো আছে। জীবিত অবস্থায় কি পেলাম, এটা বড় কথা নয়। তবে মৃত্যুকে অতিক্রম করে টিকে থাকলাম কিনা, সেটা বড় কথা। আমার সাধনা হচ্ছে আমি মৃত্যুর পঞ্চাশ বছর পরে জীবিত থাকব কিনা। এখন কেউ আমাকে বড় শিল্পী বললে কিছু যায় আসে না। জীবনের শেষ প্রান্তে এসে পৌঁছেছি। এমনও হতে পারে কালকে আমি মারা যেতে পারি। এমনও হতে পারে এক বছর পর অথবা তিন-চার বছর পর মারা যেতে পারি। তবে সবসময় আমার ইচ্ছা ছিল ৯২ বছর বাঁচব। অনেকেই আমাকে জিজ্ঞেস করত ৯২ কেন? এটা তো ৯১, ৯৩-ও হতে পারে। একেবারে ৯২ কেন? আমি বলতাম, পিকাসোকে আমি অতিক্রম করতে পারব না। অনন্ত বয়স দিয়ে পিকাসোকে অতিক্রম করতে চাই। তাই আমি প্রতিদিন ভাবি ছবিই আঁকব।

করোনা নিয়ন্ত্রণে সরকারের আরো কঠোর উচিৎ উল্লেখ করে মুর্তজা বশীর আরো বলেন, সরকার কঠোর হয়নি বলেই ঢাকা মফস্বলে ছড়িয়ে গেছে। আপনি তো ভাষার লড়াইয়ে ছিলেন এ প্রসঙ্গে একটু শুনতে চাই, বললেন মুর্তজা বশীর প্রাণের তাগিদেই ভাষা আন্দোলনে যুক্ত হয়েছিলাম। বায়ান্ন সালে আমার বয়স ছিল ১৯ বছর। ২১ ফেব্রুয়ারি সকালে আমাদের তখনকার ৭৯, বেগমবাজারের ‘পেয়ারা হাউস’ থেকে বের হয়েছিলাম আব্বা-আম্মার বারণ আগ্রাহ্য করে। ২০ ফেব্রুয়ারি ছাত্ররা সিদ্ধান্ত নিয়েছিল ১৪৪ -ধারা ভাঙবে, মিছিল করে প্রতিবাদ করবে। একমাত্র দাবি- ‘রাষ্ট্রভাষা বাংলা চাই’। দুপুরের খানিক আগে দেখা হয় কবি হাসান হাফিজুর রহমানের সঙ্গে। আমরা দু’জন আলাপ করছিলাম ঢাকা মেডিকেল কলেজের ব্যারাকের পাশে আসন্ন চিত্রপ্রদর্শনী নিয়ে। পুরো এলাকা থমথমে।

একটু আগে ছোড়া হয়েছে কাঁদানে গ্যাস। বেলা ৩টার দিকে হঠাৎ গুলির শব্দ। দৌড়ে পালাতে লাগল সবাই। চারদিকে আতঙ্ক। ব্যারাকের দক্ষিণ দিকে ভিড় দেখে এগিয়ে গেলাম। গিয়ে দেখলাম বেশ লম্বা, শ্যামবর্ণ, মুখমণ্ডল পরিস্কারভাবে কামানো, পুরো চেহারা ভিজে আছে ঘামে আর প্যান্টের পেটের নিচ থেকে কলের মতো অঝোরে রক্তের ঢল। সবার সঙ্গে আমিও তাকে ধরেছি। আমার সাদা পায়জামায় কে যেন আবিরের রং পিচকিরি দিয়ে রাঙিয়ে দিল। আমি তাকে ধরেছি বুকের কাছে। আমার মাথা তার মুখের কাছে। সে চোখ তুলে তাকাল। সে জিভ বের করছে আর বলছে- ‘পানি পানি’। আমার হাতের রুমালটা ঘামে পানিতে ভেজানো ছিল।

ইতস্তত করছিলাম রুমালটা নিংড়ে দেব কিনা। সে কাটা মুরগির মতো হা করে জিভ কাঁপিয়ে ছটফট করছিল। অবশেষে নিংড়ে দিলাম। সে ফিসফিস করে বলল, ‘আমার নাম আবুল বরকত, বিষ্ণুপ্রিয়া ভবন, পল্টন লাইন, আমার বাড়িতে খবর দিয়েন।’ আর কিছু বলেনি। আমরা যখন তাকে মেডিকেলে নিয়ে গেলাম, সেখানে টিয়ার গ্যাস ও লাঠিচার্জে আহত আরও অনেকে এসেছে। প্রথম গুলিবিদ্ধ একজনকে আমরাই নিয়ে গিয়েছিলাম। নার্স, ডাক্তার সবাই দুঃখে, রাগে বিহ্বল হয়ে গেল। যখন বেরিয়ে আসব, দেখি স্ট্রেচারের মধ্যে একটা লাশ। তার মাথার খুলি নেই। মগজটা বোধ হয় শুকনো দূর্বাঘাসে পড়ে ছিল, তার মধ্যে ঘাস লেগে রয়েছে। ওটাকে তুলে ওই স্ট্রেচারের মধ্যে রাখা হয়েছে। এই ঘটনাগুলোই বিভিন্ন সময়ে আমার ক্যানভাসে উঠে এসেছে। ২১ ফেব্রুয়ারির ঘটনার আমি প্রত্যক্ষ সাক্ষী; এর জন্য আমি গৌরববোধ করি।

সাবস্ক্রাইব ও অনুসরণ করুন

তাপপ্রবাহ নিয়ে নতুন বার্তা আবহাওয়া অফিসের

তাপপ্রবাহ নিয়ে নতুন বার্তা আবহাওয়া অফিসের

মার্কিন ডলারের দাপটে দুর্বল অস্ট্রেলিয়ান ডলার

মার্কিন ডলারের দাপটে দুর্বল অস্ট্রেলিয়ান ডলার

‘ইসলামী ব্যাংক ক্ষতিগ্রস্ত হলে দেশের অর্থনীতি মাটির সঙ্গে মিশে যাবে’

বিরোধীদলীয় নেতা ‘ইসলামী ব্যাংক ক্ষতিগ্রস্ত হলে দেশের অর্থনীতি মাটির সঙ্গে মিশে যাবে’

অস্ট্রেলিয়াকে হারিয়ে ২১ বছরের অপেক্ষা ঘোচাল বাংলাদেশ

অস্ট্রেলিয়াকে হারিয়ে ২১ বছরের অপেক্ষা ঘোচাল বাংলাদেশ

সব খবর

সম্পাদক : শ্যামল দত্ত

প্রকাশক : সাবের হোসেন চৌধুরী

অনুসরণ করুন

BK Family App