×

মধ্যপ্রাচ্য

ইরানের যে কৌশলে চাপ বাড়ছে যুক্তরাষ্ট্রের

Icon

কাগজ ডেস্ক

প্রকাশ: ২৯ মার্চ ২০২৬, ০৯:১২ এএম

ইরানের যে কৌশলে চাপ বাড়ছে যুক্তরাষ্ট্রের

ছবি : সংগৃহীত

যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে যুদ্ধ অবসানের শর্ত হিসেবে এ সপ্তাহে এক ইরানি কর্মকর্তা একগুচ্ছ দাবি উপস্থাপন করেছেন। সেই তালিকায় প্রথমবারের মতো যুক্ত করা হয়েছে একটি নতুন বিষয় তা হলো হরমুজ প্রণালির ওপর ইরানের সার্বভৌমত্বের স্বীকৃতি।

বিশ্বের মোট তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) পরিবহনের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ যে সংকীর্ণ জলপথ দিয়ে চলাচল করে, সেই হরমুজ প্রণালি এখন ইরানের সবচেয়ে শক্তিশালী কৌশলগত অস্ত্র হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। একইসঙ্গে এটিকে বার্ষিক সম্ভাব্য বিলিয়ন ডলারের আয়ের উৎস এবং বৈশ্বিক অর্থনীতির ওপর চাপ সৃষ্টির হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করতে চাইছে তেহরান।

ইরান অতীতে বহুবার হরমুজ প্রণালি বন্ধ করে দেওয়ার হুমকি দিলেও অনেকেই মনে করতেন, তারা তা বাস্তবে কার্যকর করবে না বা করলেও এত বড় প্রভাব ফেলতে পারবে না। কিন্তু সাম্প্রতিক ঘটনাপ্রবাহে বৈশ্বিক বাণিজ্য প্রবাহে যে ব্যাপক বিঘ্ন সৃষ্টি হয়েছে, তা ইরানের কৌশলগত উচ্চাকাঙ্ক্ষাকে আরো বাড়িয়ে দিয়েছে। নতুন দাবিগুলো থেকে বোঝা যাচ্ছে, এই প্রভাবকে দীর্ঘমেয়াদি সুবিধায় রূপ দিতে চাইছে দেশটি।

ইরানের হামলার কারণে এই গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ দিয়ে জাহাজ চলাচল প্রায় স্থবির হয়ে পড়েছে। এর ফলে বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে তীব্র অস্থিরতা দেখা দিয়েছে এবং পারস্য উপসাগরের বাইরের দেশগুলোও জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করতে জরুরি পদক্ষেপ নিতে বাধ্য হয়েছে।

ব্লুমবার্গ ইকোনমিক্সের মধ্যপ্রাচ্য বিষয়ক প্রধান দিনা এসফানদিয়ারি বলেন, হরমুজ কৌশল এতটা সফল হবে এটা ইরানকেও কিছুটা বিস্মিত করেছে। খুব কম খরচে এবং তুলনামূলক সহজ উপায়ে বৈশ্বিক অর্থনীতিকে চাপে ফেলা সম্ভব হয়েছে। তিনি বলেন, এই যুদ্ধ থেকে ইরান একটি নতুন প্রভাব খুঁজে পেয়েছে এবং ভবিষ্যতেও এটি ব্যবহার করতে পারে। এই প্রভাবকে অর্থনৈতিকভাবে কাজে লাগানোও তাদের পরিকল্পনার অংশ।

এই ঝুঁকি সম্পর্কে যুক্তরাষ্ট্রও সতর্ক রয়েছে। গত শুক্রবার যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও সতর্ক করে বলেন, যুদ্ধ-পরবর্তী সময়ের বড় চ্যালেঞ্জগুলোর একটি হবে হরমুজ প্রণালিতে ইরানের সম্ভাব্য টোল বা শুল্ক আরোপের চেষ্টা। ফ্রান্সে অনুষ্ঠিত জি-৭ বৈঠক শেষে রুবিও বলেন, এটি শুধু অবৈধই নয়, বরং অগ্রহণযোগ্য এবং বিশ্ব নিরাপত্তার জন্য বিপজ্জনক। এর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য বিশ্বকে প্রস্তুত থাকতে হবে। একই বৈঠকে জি-৭ দেশগুলোর পররাষ্ট্রমন্ত্রীরা নিরাপদ ও শুল্কমুক্ত নৌচলাচল নিশ্চিত করার ওপর জোর দেন।

হরমুজ প্রণালির কৌশলগত গুরুত্ব আরো বেড়েছে এমন ইঙ্গিত দিয়ে ইরানের নতুন সর্বোচ্চ নেতা হিসেবে আলোচনায় থাকা মুজতবা খামেনি তার প্রথম ভাষণে বলেন, এই জলপথ বন্ধ করার ক্ষমতাকে ভবিষ্যতেও কাজে লাগাতে হবে।

এর আগে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আলোচনায় ইরান মূলত নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার এবং শান্তিপূর্ণ পারমাণবিক প্রযুক্তির স্বীকৃতি চেয়েছিল। কিন্তু হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণ তখন তাদের দাবির অংশ ছিল না।

আরো পড়ুন : হুথিরা সুয়েজ খাল বন্ধ করলে চূড়ান্ত সর্বনাশ হবে

বর্তমানে ইরান এই প্রভাবকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেওয়ার ইঙ্গিত দিচ্ছে। দেশটির আইনপ্রণেতারা এমন একটি বিল বিবেচনা করছেন, যেখানে প্রণালি ব্যবহারকারী জাহাজগুলোকে শুল্ক দিতে বাধ্য করা হতে পারে। একইসঙ্গে সর্বোচ্চ নেতার এক উপদেষ্টা যুদ্ধ-পরবর্তী সময়ে হরমুজ প্রণালির জন্য নতুন ব্যবস্থা চালুর কথাও বলেছেন। এতে করে তেহরান প্রতিপক্ষ দেশগুলোর ওপর সামুদ্রিক বিধিনিষেধ আরোপ করতে পারবে এবং গুরুত্বপূর্ণ এই নৌপথ ব্যবহারের বিষয়টি ভূ-রাজনৈতিক কৌশলের সঙ্গে যুক্ত করতে পারবে।

যুক্তরাষ্ট্র নৌবাহিনী যুদ্ধ কলেজের আন্তর্জাতিক সামুদ্রিক আইন বিষয়ের অধ্যাপক জেমস ক্রাসকা বলেন, আন্তর্জাতিক প্রণালিতে চলাচলের ওপর শুল্ক আরোপ করা আন্তর্জাতিক আইনের পরিপন্থী। হরমুজ প্রণালি একটি আন্তর্জাতিক নৌপথ হওয়ায় সব দেশের অবাধ যাতায়াতের অধিকার রয়েছে।

এই নিয়মগুলো জাতিসংঘের সমুদ্র আইন কনভেনশনে (ইউএনক্লোস) নির্ধারিত। যদিও ইরান ও যুক্তরাষ্ট্র এই চুক্তির অংশ নয়, তবুও এর মূল নীতিগুলো আন্তর্জাতিক প্রথাগত আইনের অংশ হিসেবে স্বীকৃত। তবে ইরান এই সদস্য না হওয়ার বিষয়টিকে নিজেদের অবস্থান জোরদার করতে ব্যবহার করতে পারে।

ইতিহাসে আন্তর্জাতিক প্রণালিতে সফলভাবে শুল্ক আরোপের নজির খুব কম। ১৯শ শতকে ডেনমার্ক ডেনিশ প্রণালিতে শুল্ক আরোপ করলেও পরবর্তীতে আন্তর্জাতিক চাপের মুখে ১৮৫৭ সালের কোপেনহেগেন কনভেনশনের মাধ্যমে তা বাতিল করতে বাধ্য হয়।

তবে এসব আইনি জটিলতা সত্ত্বেও ইরান সম্ভাব্য আয় নিয়ে হিসাব-নিকাশ শুরু করেছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, যদি এই শুল্ক ব্যবস্থা কার্যকর হয়, তাহলে এর আয় মিসরের সুয়েজ খালের আয়ের সঙ্গে পাল্লা দিতে পারে। সাধারণত প্রতিদিন প্রায় ২ কোটি ব্যারেল তেল ও তেলজাত পণ্য হরমুজ প্রণালি দিয়ে পরিবাহিত হয়, যা প্রায় ১০টি বৃহৎ তেলবাহী জাহাজের সমান। যদি প্রতিটি জাহাজ থেকে ২০ লাখ ডলার শুল্ক নেওয়া হয়, তাহলে প্রতিদিন প্রায় ২ কোটি ডলার এবং মাসে প্রায় ৬০০ মিলিয়ন ডলার আয় হতে পারে। এতে যদি এলএনজি পরিবহন যুক্ত হয়, তাহলে মাসিক আয় ৮০০ মিলিয়ন ডলার ছাড়িয়ে যেতে পারে, যা ২০২৪ সালে ইরানের মাসিক তেল রপ্তানি আয়ের ১৫-২০ শতাংশের সমান। তুলনামূলকভাবে, সুয়েজ খাল থেকে মিসর সাধারণত প্রতি মাসে ৭০০ থেকে ৮০০ মিলিয়ন ডলার আয় করে, যদিও সাম্প্রতিক লোহিত সাগর সংকটের কারণে এই আয় কমে গেছে।

বিশ্লেষকদের মতে, অর্থনৈতিক চাপে থাকা ইরান এই কৌশলকে আয় বৃদ্ধির সহজ উপায় হিসেবে দেখছে। কঠোর আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞার কারণে বৈশ্বিক বাজারে প্রবেশ সীমিত হওয়ায় এই শুল্ক ব্যবস্থা তাদের জন্য একটি সহজ ও কম ব্যয়ের বিকল্প হতে পারে। বর্তমানে নিষেধাজ্ঞার দিক থেকে রাশিয়ার পরই ইরানের অবস্থান।

ইরান বারবার বলেছে, হরমুজ প্রণালি খোলা রয়েছে, তবে তা শর্তহীন নয়। দেশটির কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, “অমিত্র” নয় এমন জাহাজগুলো ইরানি কর্তৃপক্ষের সঙ্গে সমন্বয় করে চলাচল করতে পারবে। এই অবস্থান জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদ ও আন্তর্জাতিক সামুদ্রিক সংস্থাকে জানানো হয়েছে। একইসঙ্গে বাস্তবে নিয়ন্ত্রিত চলাচল কেমন হতে পারে, সেটিও পরীক্ষা করছে তেহরান। জাহাজ চলাচলের তথ্য অনুযায়ী, কিছু ট্যাংকার এখন ইরানের উপকূল ঘেঁষে বিকল্প পথে চলাচল করছে এবং ধারণা করা হচ্ছে, নিরাপদ যাত্রার জন্য কিছু অপারেটর অর্থ প্রদানও করেছে। যদিও কোনো দেশ বা জাহাজ পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠান প্রকাশ্যে শুল্ক দেওয়ার কথা স্বীকার করেনি, তবুও লয়েডস লিস্ট জানিয়েছে, অন্তত ২০টির বেশি জাহাজ নতুন একটি করিডর ব্যবহার করেছে এবং এর মধ্যে অন্তত দুটি জাহাজ প্রায় ২০ লাখ ডলার পরিশোধ করেছে।

ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস অনুমোদিত জাহাজের জন্য একটি নিবন্ধন ব্যবস্থাও চালু করেছে। পাশাপাশি কিছু দেশ সরাসরি তেহরানের সঙ্গে যোগাযোগ করে তাদের জাহাজ চলাচল নিশ্চিত করার চেষ্টা করছে।

লয়েডস লিস্টের প্রধান সম্পাদক রিচার্ড মিড বলেন, এটি ইতোমধ্যে ঘটছে এবং আলোচনা অগ্রগতি না হলে ভবিষ্যতে আরো বাড়তে পারে। বর্তমানে জাহাজ চলাচল শিল্প কার্যত স্থবির অবস্থায় রয়েছে।

টাইমলাইন: ইরান-ইসরায়েল যুদ্ধ

আরো পড়ুন

সাবস্ক্রাইব ও অনুসরণ করুন

দিনাজপুরে বাস-ট্রাক সংঘর্ষে নিহত ২

দিনাজপুরে বাস-ট্রাক সংঘর্ষে নিহত ২

ইরানে টানা স্থল হামলা পরিকল্পনা যুক্তরাষ্ট্রের

ইরানে টানা স্থল হামলা পরিকল্পনা যুক্তরাষ্ট্রের

শাকিবের জন্মদিনে বুবলীর চমকপ্রদ শুভেচ্ছা বার্তা

শাকিবের জন্মদিনে বুবলীর চমকপ্রদ শুভেচ্ছা বার্তা

‘তেল না পেয়ে’ পাম্প ম্যানেজারকে ট্রাকচাপা দিয়ে হত্যার অভিযোগ

‘তেল না পেয়ে’ পাম্প ম্যানেজারকে ট্রাকচাপা দিয়ে হত্যার অভিযোগ

সব খবর

সম্পাদক : শ্যামল দত্ত

প্রকাশক : সাবের হোসেন চৌধুরী

অনুসরণ করুন

BK Family App